১৯৭২ সালের সংবিধান, যা এখনো বাংলাদেশকে পরিচালনা করছে, স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে দ্রুত সংগঠিত করার প্রয়োজনে প্রণীত হয়েছিল। বহু বিশ্লেষকের মতে, এটি ভারতের সাংবিধানিক কাঠামোর প্রভাব গ্রহণ করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর, যখন একটি জাতি তার রাষ্ট্রকাঠামো নতুনভাবে গঠনের কথা ভাবছে, তখনই প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি সত্যিই স্বাধীনভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছি?
এই প্রশ্ন নতুন মাত্রা পায় ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর। সেই প্রেক্ষাপটে “জুলাই সনদ” সামনে আসে, যার মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নেয়। একই সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় বিতর্কের মূল জায়গা। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে বিজয় অর্জিত হওয়ার পরও কেন সেই ফলাফলের ভিত্তিতে শপথ গ্রহণ করা হয়নি, এই প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। বরং ১৯৭২ সালের সংবিধানের ভিত্তিতেই সরকার গঠন করা হয়েছে, যা অনেকের কাছে গণরায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্টের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন আরও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘ সময় ভারতে অবস্থান করা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পুনরাগমন, তাদের দ্রুত উত্থান এবং ক্ষমতার কেন্দ্র দখল, এসব ঘটনাকে কেউ দেখছেন স্বাভাবিক রাজনৈতিক পুনর্গঠন হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন বহিরাগত প্রভাবের অংশ হিসেবে।
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর ভারতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং পরবর্তীতে দেশে ফিরে ক্ষমতায় আসেন। এই ইতিহাস বর্তমান রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে তুলনা টানার একটি ভিত্তি তৈরি করেছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ।
ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
দ্য স্টেটসম্যানসহ কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে যে তারেক রহমান দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে ফিরে উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পেয়েছেন, যা একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এই প্রত্যাবর্তনকে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখিয়েছে।
কিছু প্রতিবেদনে এমনও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে, যা নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ফ্যাক্টচেক বিশ্লেষণগুলো বলছে, বিভিন্ন বক্তব্য আংশিক বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে।
এই বৈপরীত্যই দেখাচ্ছে, ভারতীয় মিডিয়া নিজেও একমুখী নয়, বরং তারা কখনো বাস্তবতা তুলে ধরছে, কখনো ব্যাখ্যা তৈরি করছে, আবার কখনো রাজনৈতিক বার্তা নির্মাণ করছে।
রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তারা কি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করছে, নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে কাজ করছে?
একইভাবে বিরোধী শক্তির ভূমিকা নিয়েও সংশয় রয়েছে। তারা কি জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে পারছে, নাকি ক্ষমতার বাইরে থেকে শুধুই পর্যবেক্ষক হয়ে গেছে?
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে ঘিরেও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ভারতে অবস্থান এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি জাতীয় স্বার্থের পক্ষে কাজ করছেন, নাকি ভিন্ন কোনো প্রভাবের অধীনে?
ভারতের ভূমিকা: বাস্তবতা না ধারণা?
ভারতীয় গণমাধ্যম সরাসরি কখনো বলে না যে ভারত কাউকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। কিন্তু তাদের রিপোর্টে সীমান্ত, নিরাপত্তা, কূটনীতি ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ঘিরে একটি সক্রিয় উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ফলে দুটি ব্যাখ্যা সামনে আসে:
একটি, ভারত একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে স্বাভাবিক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করছে।
অন্যটি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথে তাদের প্রভাব বাস্তব এবং তা অস্বীকার করা কঠিন।
সংকটের কেন্দ্রে বাংলাদেশ
সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক জটিল অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। সংবিধান, গণভোট, নির্বাচন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বহিরাগত প্রভাব, সবকিছু একসাথে প্রশ্নবিদ্ধ।
রাষ্ট্র কি জনগণের?
নাকি ক্ষমতার কাঠামোই রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে?
এই বাস্তবতায় নীরব থাকা মানেই দায় এড়িয়ে যাওয়া।
সমাপ্তি: প্রশ্নের মুখে একটি জাতি
এখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করলে দেশে নতুনভাবে অস্থিরতা তৈরি হবে, বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে রক্ত ঝরার আশঙ্কা অস্বীকার করা যায় না, মানুষের জীবন আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে, দায় এড়িয়ে নয়, দায় স্বীকার করে।
এই মুহূর্তে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। জামায়াতকে তার রাজনীতির কৌশলগত দিক গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। একটি রাষ্ট্র যেখানে ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি মিলেমিশে এক বহুমাত্রিক পরিচয় তৈরি করেছে, সেখানে একমাত্রিক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান সময়ের সাথে খাপ খায় না। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সেটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হলে সমাজ বিভক্ত হয়, রাষ্ট্র দুর্বল হয়।
একইভাবে নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্যও এটি একটি পরীক্ষার সময়। এনসিপিকে নতুনভাবে শপথ নিতে হবে, ঐক্যের, সততার, সাহসিকতার, এবং সুশিক্ষার রাজনীতি গড়ে তোলার শপথ। তাদের প্রতিদিন উদাহরণ তৈরি করতে হবে, কথায় নয়, কাজে। দুর্নীতির সঙ্গে আপস না করে, নতুন প্রজন্মের আস্থা অর্জন করতে হবে। হাসনাত, পাটোয়ারি, নাহিদের মতো নেতৃত্বকে সামনে এনে একটি স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
নারীদের জাগরণ এখন আর শুধু শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাজনীতিতেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যদি তারা নিজেরা এগিয়ে আসতে চায়। একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে নারী নেতৃত্বের বিকাশ অপরিহার্য।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাষ্ট্রযন্ত্রকে ঘিরে। প্রশাসনের পুরোনো মানসিকতা ভেঙে ফেলতে হবে। এই দেশ কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ আমাদের সকলের। এই দেশ চলবে বাংলাদেশের মানুষের ইচ্ছায়, বাইরের প্রভাব বা গোষ্ঠীগত আধিপত্যে নয়।
কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, যদি শত্রু আমাদের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে, তাহলে বাহিরের দোষ দিয়ে কী লাভ? দেশের কমপক্ষে ৭০ শতাংশ মানুষের মনে আজ প্রশ্ন, সালাউদ্দিন কার পক্ষে কাজ করছেন? তারেক রহমান কি ভারতের কাছে শপথবদ্ধ? সশস্ত্র বাহিনীর কমিটমেন্ট কোথায়, তাদের নিজ মাতৃভূমির প্রতি? শেখ হাসিনা এবং তার জোট কীভাবে এই বাস্তবতা মেনে নেবে?
সবশেষে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আমরা কী ভাবছি? আমরা কী চাই?
এ যেন শুধু প্রশ্নের পর প্রশ্ন।
তবুও উত্তর খুঁজতে হবে।
কারণ মুক্তির পথ অন্য কেউ তৈরি করে দেবে না।
বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদেরই, আমার, আপনার, আমাদের সবার।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন