বাবা-মায়ের মুখে শোনে, কিন্তু বলতে পারে না নিজের মাতৃভাষা

পাবনার ঈশ্বরদীর মারমী পল্লীর মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের সবাই একসময় মালতো ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু সম্প্রদায়টির নতুন প্রজন্ম এ ভাষায় কথা বলে না। তাদের মালতো ভাষার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। তাদের অনেকে জানেই না তাদের নিজস্ব একটি ভাষা রয়েছে। বর্তমানে শিশুরা বাবা-মায়ের মুখে মালতো ভাষা শুনলেও এ ভাষায় তারা কথা বলতে পারে না। অথচ এক সময়ে মারমী পল্লিতে ঘরে-বাইরে সবখানেই চলতো মালতো ভাষা। বাংলা ভাষাভাষীদের সঙ্গে তারা বাংলায় কথা বললেও নিজেদের গোত্র ও সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজস্ব ভাষাতেই কথা হতো। উপজেলার দাশুড়িয়ার মারমী পল্লিতে মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ৫০০-৫৫০ জন বসবাস করেন। তাদের মাতৃভাষা মালতো। কিন্তু ধীরে ধীরে এ ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। মারমী সম্প্রদায়ের শিক্ষিকা আগনেশ মাধবী বলেন, আমাদের নিজস্ব ভাষা, শিক্ষা, কৃষ্টি-কালচার রয়েছে, কিন্তু এগুলো সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের নিজস্ব বর্ণমালা, ভাষায় লিখিত বই নেই। তিনি আরও বলেন, কেবল মৌখিকভাবেই এ ভাষাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রেখেছি। কিন্তু নতুন প্রজন্ম আর এ ভাষার প্রতি আগ্রহী নয়। তারা মালতো ভাষায় আর কথা বলতে চায় না। অনেকেই ভাষা বোঝেও না।

বাবা-মায়ের মুখে শোনে, কিন্তু বলতে পারে না নিজের মাতৃভাষা

পাবনার ঈশ্বরদীর মারমী পল্লীর মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের সবাই একসময় মালতো ভাষায় কথা বলতেন। কিন্তু সম্প্রদায়টির নতুন প্রজন্ম এ ভাষায় কথা বলে না। তাদের মালতো ভাষার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। তাদের অনেকে জানেই না তাদের নিজস্ব একটি ভাষা রয়েছে।

বর্তমানে শিশুরা বাবা-মায়ের মুখে মালতো ভাষা শুনলেও এ ভাষায় তারা কথা বলতে পারে না। অথচ এক সময়ে মারমী পল্লিতে ঘরে-বাইরে সবখানেই চলতো মালতো ভাষা। বাংলা ভাষাভাষীদের সঙ্গে তারা বাংলায় কথা বললেও নিজেদের গোত্র ও সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজস্ব ভাষাতেই কথা হতো।

উপজেলার দাশুড়িয়ার মারমী পল্লিতে মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের প্রায় ৫০০-৫৫০ জন বসবাস করেন। তাদের মাতৃভাষা মালতো। কিন্তু ধীরে ধীরে এ ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে।

মারমী সম্প্রদায়ের শিক্ষিকা আগনেশ মাধবী বলেন, আমাদের নিজস্ব ভাষা, শিক্ষা, কৃষ্টি-কালচার রয়েছে, কিন্তু এগুলো সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের নিজস্ব বর্ণমালা, ভাষায় লিখিত বই নেই।

তিনি আরও বলেন, কেবল মৌখিকভাবেই এ ভাষাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রেখেছি। কিন্তু নতুন প্রজন্ম আর এ ভাষার প্রতি আগ্রহী নয়। তারা মালতো ভাষায় আর কথা বলতে চায় না। অনেকেই ভাষা বোঝেও না। তাই ধীরে ধীরে আমাদের মায়ের ভাষা হারিয়ে ফেলছি।

মারমী মাল পাহাড়িয়া সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তি বার্নাট বিশ্বাস (৭৫) বলেন, আমরা যারা প্রবীণ বা বয়স্ক রয়েছি তারা এখনো নিজ সম্প্রদায় ও পরিবারের লোকজনের সঙ্গে মালতো ভাষায় কথা বলি। কিন্তু নতুন প্রজন্মের তরুণ ও শিশুরা মালতো ভাষা খুব একটা বলে না। তারা বাংলা ভাষাতেই বেশি কথা বলে। এমনকি অনেক শিশু মালতো ভাষা বলতেই পারে না। মালতো ভাষা লিখিতভাবে সংরক্ষিত নেই। আমরা ভাষা বলতে পারলেও লিখতে পারি না। লিখিত সব কাজকর্ম হয় বাংলায়।

বাবা-মায়ের মুখে শোনে, কিন্তু বলতে পারে না নিজের মাতৃভাষামাল পাহাড়ি সম্প্রদায়ের কয়েকজন শিশু/ ছবি: জাগো নিউজ

ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে অনার্সে অধ্যয়নরত মালতো সম্প্রদায়ের সঞ্জিত দাস বলেন, বাঙালি শিশুদের সঙ্গে একই স্কুলে পড়াশোনা ও খেলাধুলা করার কারণে ছোটোবেলা থেকেই বাংলা ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেছি। মালতো ভাষা নতুন প্রজন্মের শিশুরা বলতে পারে না। অনেক শিশু মালতো ভাষা শেখার আগ্রহ দেখায় না। এ ভাষা শেখার জন্য আমাদের পল্লিতে কোনো লাইব্রেরি বা ভাষাশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তা ছাড়া এ ভাষায় রচিত কোনো বই-এ পল্লিতে সংরক্ষিত নেই। তাই যত দিন যাচ্ছে ততই এ ভাষা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মালতো ভাষা ধরে রাখতে মালতো ভাষায় রচিত বই সংগ্রহ করে পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি এ এলাকায় একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করে এ ভাষার চর্চা করতে হবে।

পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সুবণী বিশ্বাস বললো, আমি বাংলা ভাষাতেই কথা বলি। মালতো ভাষা-এ পল্লীর শিশুরা কিছুটা বুঝলেও কথা বলতে পারে না। আমি মালতো ভাষা বলতে পারি না। এ ভাষার উচ্চারণ আমার হয় না।

মারমী পল্লীর বাসিন্দা সমর বিশ্বাস বলেন, একসময় আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষজন অশিক্ষিত ছিল। এখন অনেকেই পড়াশোনা শিখেছেন এবং নতুন প্রজন্মের সব শিশু পড়াশোনা করছে। তাই এখন তারা নিজের ভাষার চেয়ে প্রচলিত বাংলা ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা পারিবারিকভাবে চেষ্টা করছি নিজেদের ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে হয়ত একসময় সেটিও পারবে না।

তিনি বলেন, সরকারের কাছে দাবি, মালতো ভাষার নিজস্ব যে বর্ণ রয়েছে সেটির মাধ্যমে বই রচনা করা এবং সে বই আমাদের শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা। তাহলে হয়ত আমাদের মাতৃভাষা বাঁচিয়ে রাখা যাবে। তা না হলে হাজার বছরের পুরোনো এ ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আমাদের অনাগত প্রজন্ম জানতেই পারবে না আমাদের নিজস্ব কোনো ভাষা ছিল।

ইতিহাস ও ভাষা নিয়ে গবেষণাকারী ঈশ্বরদীর অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাংলা ভাষাতেই নতুন প্রজন্মের মারমী পল্লীর শিশু-তরুণরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাল পাহাড়িদের ভাষা হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। পাশের দেশ ভারতে মালতো ভাষায় লিখিত বই ও তাদের ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের দেশে তা নেই। পরিবার থেকে বংশপরম্পরায় এ ভাষা শিখে থাকে। কিন্তু নতুন প্রজন্ম সেই ভাষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এভাবে চলতে থাকলে একটা সময় হয়ত নৃ-গোষ্ঠীদের এসব ভাষার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।

শেখ মহসীন/এসজেডএইচ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow