বিদায়ের ঘোষণা থেকে ইতিহাসের শিখরে, ১০ বছরে মেসির অবিশ্বাস্য রূপকথা

আর্জেন্টাইন ভক্তদের কাছে ২৬ জুন যেন বিভীষিকাময় দিনের প্রতিচ্ছবি। ২০১৬ সালের এই দিনে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে স্বপ্ন ভঙ্গ হয় আর্জেন্টিনার। দশ বছর আগে পুরো আর্জেন্টিনা ছিল স্তব্ধ। আরেকটি হতাশাজনক পরাজয়ের পর লিওনেল মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। টানা তিনটি ফাইনালে হারার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে মেসি অবসর নেন। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকার ফাইনালে পেনাল্টি মিস করে রানার্সআপ হওয়ার পর মনে হয়েছিল, এটাই বুঝি তার আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের শেষ। কিন্তু সৌভাগ্যবশত দেশটির জন্য, আর মেসির নিজের জন্যও, সেটি শেষ হয়নি। তখন আবেগঘন কণ্ঠে মেসি বলেছিলেন, \'ড্রেসিংরুমে আমার মনে হয়েছিল জাতীয় দলের সঙ্গে আমার পথচলা শেষ। এটা আমার জন্য নয়। এখন আমি এভাবেই অনুভব করছি। আবারও গভীর দুঃখ আমাকে গ্রাস করেছে। চারটি ফাইনাল খেলেছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একটিও জিততে পারিনি। এটিই ছিল আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। সবার ভালোর জন্যই আমি সরে দাঁড়াচ্ছি—আমার জন্যও, সবার জন্যও।\' এই বিস্ময়কর ঘোষণার পরই বদলে যায় মেসির জাতীয় দলের গল্প। যুক্তরাষ্ট্রের সেই বেদনা থেকেই আলবিসেলেস্তের জার্সিতে নিজের ইতিহাস নত

বিদায়ের ঘোষণা থেকে ইতিহাসের শিখরে, ১০ বছরে মেসির অবিশ্বাস্য রূপকথা

আর্জেন্টাইন ভক্তদের কাছে ২৬ জুন যেন বিভীষিকাময় দিনের প্রতিচ্ছবি। ২০১৬ সালের এই দিনে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে স্বপ্ন ভঙ্গ হয় আর্জেন্টিনার। দশ বছর আগে পুরো আর্জেন্টিনা ছিল স্তব্ধ।

আরেকটি হতাশাজনক পরাজয়ের পর লিওনেল মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। টানা তিনটি ফাইনালে হারার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে মেসি অবসর নেন।

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকার ফাইনালে পেনাল্টি মিস করে রানার্সআপ হওয়ার পর মনে হয়েছিল, এটাই বুঝি তার আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের শেষ। কিন্তু সৌভাগ্যবশত দেশটির জন্য, আর মেসির নিজের জন্যও, সেটি শেষ হয়নি।

তখন আবেগঘন কণ্ঠে মেসি বলেছিলেন, 'ড্রেসিংরুমে আমার মনে হয়েছিল জাতীয় দলের সঙ্গে আমার পথচলা শেষ। এটা আমার জন্য নয়। এখন আমি এভাবেই অনুভব করছি। আবারও গভীর দুঃখ আমাকে গ্রাস করেছে। চারটি ফাইনাল খেলেছি, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একটিও জিততে পারিনি। এটিই ছিল আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। সবার ভালোর জন্যই আমি সরে দাঁড়াচ্ছি—আমার জন্যও, সবার জন্যও।'

এই বিস্ময়কর ঘোষণার পরই বদলে যায় মেসির জাতীয় দলের গল্প। যুক্তরাষ্ট্রের সেই বেদনা থেকেই আলবিসেলেস্তের জার্সিতে নিজের ইতিহাস নতুন করে লিখতে শুরু করেন তিনি।

নিউ জার্সির সেই স্টেডিয়ামে বিদায়ের ঘোষণা দেওয়ার মাত্র দুই মাস পরই মেসি সিদ্ধান্ত বদলান এবং আবারও আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার ঘোষণা দেন। তারপরেও সহসাই বদলায়নি আর্জেন্টিনার ভাগ্য। ২০১৮ বিশ্বকাপ কিংবা ২০১৯ কোপা আমেরিকা দুই জায়গাতেই ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি।

এরপর দলের ভার আসে লিওনেল স্কালোনির উপর। এরপর একে একে আসে শিরোপা, আসে অসংখ্য রেকর্ড; যার সঙ্গে যুক্ত হয় ক্লাব পর্যায়ে আগে থেকেই অর্জিত অসাধারণ সাফল্য।

২০২৬ বিশ্বকাপে এসে মেসি পৌঁছেছেন ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত পর্যায়ে। যে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে একদিন চোখের জল ফেলেছিলেন, সেই দেশেই তিনি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা।

গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিন গোল এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুই গোল করে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮। এর মাধ্যমে তিনি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন।

২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসির শেষ আসর। এক দশক আগে অবসর না নেওয়ার যে সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ২০১ ম্যাচে তার গোল ১২২টি।

আর্জেন্টিনা দলের ইতিহাসের মোড় ঘুরে গিয়েছিল ২০২১ সালে মারাকানায়। লিওনেল স্কালোনির অধীনে নতুন প্রজন্মের একটি দল গড়ে ওঠে, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন মেসি।

সেই বছর ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা জিতে নেয় ২০২১ কোপা আমেরিকা। এটি ছিল ১৯৯৩ সালের পর দেশটির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা।

কোপা আমেরিকার সেই সাফল্য যেন মেসি ও তার সতীর্থদের কাঁধ থেকে বিশাল চাপ সরিয়ে দেয়। এরপর ২০২২ সালে ওয়েম্বলিতে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে জিতে নেয় ফিনালিসিমা।

ইতালির বিপক্ষে সেই জয় ছিল আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের প্রতীক। দলটি টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে যায়।

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হারলেও তাদের ভাগ্য বদলায়নি। মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতে নেয়। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে তিনি করেন দুটি গোল এবং বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।

২০২২ বিশ্বকাপে মেসি করেছিলেন সাতটি গোল, যা তাকে ক্লোসার রেকর্ড স্পর্শ করতে সাহায্য করে। এরপর তিনি ২০২৪ কোপা আমেরিকা জয়ের দলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সেই শিরোপা আর্জেন্টিনাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত করে।

বিদায়ের অশ্রু আর হতাশার এক দশক পর আজ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই হাসছেন মেসি। সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে তিনি এমন সব রেকর্ড গড়েছেন এবং এমন সব ট্রফি জিতেছেন, যা একসময় শুধুই অধরা স্বপ্ন বলে মনে হয়েছিল।

এদিকে মাঠেও দারুণ ছন্দে আছে আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে শনিবার ডালাসে জর্ডানের মুখোমুখি হবে আলবিসেলেস্তেরা। লক্ষ্য, জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপার লড়াইয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।

আরআর/এসকেডি/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow