বেঁচে যাওয়া সেই রুবার কোলজুড়ে জন্ম নিল পুত্র সন্তান  

গত ঈদুল ফিতরে লঞ্চযোগে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা সদরঘাটে লঞ্চ চাপায় নিহত সোহেলের স্ত্রীর কোলজুড়ে জন্ম নিয়েছে ফুটফুটে পুত্র সন্তান। মঙ্গলবার (৯ জুন) ভোরে বরিশালের কাশিপুর এলাকায় বাবার বাড়িতে পুত্র সন্তান প্রসব করেন নূর আফরিন রুবা। ফুটফুটে সন্তানের মুখ দেখেও হাসি নেই দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়া রুবার মুখে। তার চোখে-মুখে ফুটে উঠছে অসহায়ত্বের শঙ্কা। দিনমজুর বাবার সংসারে সন্তানকে কীভাবে মানুষ করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তা যেন চেপে ধরেছে রুবাকে। দুর্ঘটনায় স্বামী-শ্বশুর হারা রুবার পাশে দাঁড়ায়নি স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধিও। দুর্ঘটনার তিন মাস কেটে গেলেও ক্ষতিপূরণের টাকাই পাননি তিনি। তার ওপর ঢাকায় মেয়েকে চিকিৎসার জন্য দিনমজুর বাবার করা দেনা পরিশোধ করবেন কী দিয়ে, সে নিয়েও হতাশ সদ্য মা হওয়া রুবা। এর আগে চলতি বছরের ১৮ মার্চ (২৮ রমজান) স্বজনদের সঙ্গে ঈদুল ফিতরের ঈদ উদযাপনে গর্ভবতী স্ত্রী নূর আফরিন রুবা এবং বাবা মিরাজ ফকিরকে নিয়ে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ান হয়েছিলেন সোহেল ফকির (২২)। ঢাকা সদরঘাটে ট্রলার যোগে এমভি আসা-যাওয়া-৫ লঞ্চের ওঠার সময় অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দেয়। তখন স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে করুণ মৃত্যু হয় স

বেঁচে যাওয়া সেই রুবার কোলজুড়ে জন্ম নিল পুত্র সন্তান   

গত ঈদুল ফিতরে লঞ্চযোগে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা সদরঘাটে লঞ্চ চাপায় নিহত সোহেলের স্ত্রীর কোলজুড়ে জন্ম নিয়েছে ফুটফুটে পুত্র সন্তান। মঙ্গলবার (৯ জুন) ভোরে বরিশালের কাশিপুর এলাকায় বাবার বাড়িতে পুত্র সন্তান প্রসব করেন নূর আফরিন রুবা।

ফুটফুটে সন্তানের মুখ দেখেও হাসি নেই দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়া রুবার মুখে। তার চোখে-মুখে ফুটে উঠছে অসহায়ত্বের শঙ্কা। দিনমজুর বাবার সংসারে সন্তানকে কীভাবে মানুষ করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তা যেন চেপে ধরেছে রুবাকে।

দুর্ঘটনায় স্বামী-শ্বশুর হারা রুবার পাশে দাঁড়ায়নি স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধিও। দুর্ঘটনার তিন মাস কেটে গেলেও ক্ষতিপূরণের টাকাই পাননি তিনি। তার ওপর ঢাকায় মেয়েকে চিকিৎসার জন্য দিনমজুর বাবার করা দেনা পরিশোধ করবেন কী দিয়ে, সে নিয়েও হতাশ সদ্য মা হওয়া রুবা।

এর আগে চলতি বছরের ১৮ মার্চ (২৮ রমজান) স্বজনদের সঙ্গে ঈদুল ফিতরের ঈদ উদযাপনে গর্ভবতী স্ত্রী নূর আফরিন রুবা এবং বাবা মিরাজ ফকিরকে নিয়ে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের উদ্দেশে রওয়ান হয়েছিলেন সোহেল ফকির (২২)। ঢাকা সদরঘাটে ট্রলার যোগে এমভি আসা-যাওয়া-৫ লঞ্চের ওঠার সময় অপর একটি লঞ্চ ধাক্কা দেয়। তখন স্ত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে করুণ মৃত্যু হয় সোহেল ও তার বাবা মিরাজ ফকিরের।

এসময় ট্রলার থেকে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙে যায় সোহেল গর্ভবতী স্ত্রী নূর আফরিন রুবার। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে। দীর্ঘ প্রায় দুই মাস ঢাকায় চিকিৎসা শেষে এক মাস আগে বরিশাল নগরীর কাশিপুরে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন রুবা। সেখানে গত ৯ জুন ভোরে পুত্র সন্তান প্রসব করেন তিনি। বর্তমানে মা-সন্তান দুজনেই সুস্থ আছেন।

কান্না জড়িত কণ্ঠে রুবা জানান, অনাগত সন্তান নিয়ে সোহেলের অনেক স্বপ্ন ছিল। আজ সোহেল বেঁচে থাকলে সন্তান জন্মের খবরে সব চেয়ে বেশি খুশি হতেন। সে মৃত্যুর আগেই ছেলে বা মেয়ে হলে তাদের নামও ঠিক করে রেখেছিল। বলেছিল পুত্র সন্তান হলে তার নাম রাখবেন ‘রাইয়ান ইসলাম’। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার নাম রাইয়ান ইসলাম রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, এখন তো সোহেল নেই। তার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার ওপর। কিন্তু আমি নিজেই যে পা হারিয়ে পঙ্গু। আমার পায়ের মধ্যে এখনো রড ঢোকানো। বিছানা থেকে নামা একেবারেই নিষেধ। তার ওপর বুকের দুধ হয় না, বাচ্চাকে কৌটার দুধ কিনে খাওয়াতে হচ্ছে। সোহেলের স্বপ্ন ছিল ছেলেকে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করাবে। কষ্ট হলেও আমি তার সেই ইচ্ছা পূরণ করব। এজন্য সরকারের কাছে একটি চাকরির দাবিও জানান রুবা।

রুবার মা সালমা আক্তার সাথি বলেন, ঢাকায় মেয়ের পায়ের অপারেশন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য যে খরচ সেটা নৌ প্রতিমন্ত্রী দিয়েছেন শুনেছি। কিন্তু এর পরও আমাদের প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমি একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চাকরি করি। আমার স্বামী দিনমজুর। দেনা করে সন্তানের চিকিৎসা চালিয়েছি। এর মধ্যে কেউ একবারের জন্য খবরও নেয়নি। এমনকি দুর্ঘটনার পর লঞ্চ মালিকদের পক্ষ থেকে যে টাকা দেওয়ার কথা সে টাকাও পাইনি। বিআইডব্লিউটিএতে যোগাযোগ করা হলে তারা আজ না-কাল দেবে বলে ঘুরাচ্ছে।

রুবার নানি নাজমা বেগম বলেন, ‘রুবার বাবা দিনমজুর এবং মা একটি ক্লিনিকে নিম্ন বেতনে চাকরি করে। তাও মেয়ের চিকিৎসার জন্য প্রায় দুই মাস ধরে মা চাকরিতে যেতে পারেনি। বাবা-মায়ের যে আয় তা দিয়ে তাদের সংসারই চলে না। তার ওপর মেয়ের চিকিৎসা খরচ এবং ভূমিষ্ঠ হওয়া নবজাতকের ভরন পোষণ কিভাবে! জন্ম নেওয়া শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সবাই উদ্বেগে রয়েছি।

রুবার দিনমজুর বাবা রিয়াজ উদ্দিন মীর বলেন, আমি দিনমজুর। কাজ পেলে বাজার হয়, না হলে ঘরের চুলা জ্বলে না। তার ওপর মেয়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে দেড় লাখ টাকা ঋণ হয়েছি। এগুলো পরিশোধ কিভাবে করব তা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু মেয়ে নাতি-তাদেরও ফেলে দেওয়া যাবে না। এজন্য সরকারি সাহায্য-সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান কিংবা দানশীল সংগঠকদের কাছে সাহায্যের আবেদনও জানিয়েছেন তিনি।

একদিকে নবজাতকের কান্না, অন্যদিকে দুই প্রিয়জনের কবর-এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজ নতুন করে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করেছে সোহেল ফকিরের স্ত্রী নূর আফরিন রুবা। শিশুটি পৃথিবীতে এসেছে নতুন আশার আলো হয়ে, কিন্তু সেই আলোকে টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের সহমর্মিতার হাত।
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow