ঈদের বাজার ঘিরে চট্টগ্রামে শুরু হয়েছে নতুন পোশাকের ক্রেতাদের ঢল। পরিবারের জন্য জামা, পাঞ্জাবি, বোরকা কিংবা শাড়ি কেনার আনন্দের মধ্যেই ব্যবসায়ীরা পুঁজি করছে ভুয়া ট্যাগ, বিদেশি ব্র্যান্ডের ছদ্মবেশ এবং দামের ফাঁদ।
ভিসা জটিলতার কারণে এবার ঈদের মার্কেটে ভারতীয় পোশাক আমদানি হয়নি। তবে পাকিস্তানি পোশাক রয়েছে প্রচুর এবং দুই দেশের পোশাকের চাহিদাও অনেক। কিন্তু ভারতীয় পোশাক না থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশীয় তৈরি পোশাকে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগিয়ে চড়া দামে বিক্রি করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এতে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন ক্রেতারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদের বাজারে ভোক্তাদের বাড়তি চাহিদা এবং বিদেশি ব্র্যান্ডের প্রতি আগ্রহকে পুঁজি করে চট্টগ্রামের বড় বড় শপিংমল ও বিপণি বিতানগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চললেও তা অনেকটাই আড়ালে ছিল। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একাধিক অভিযানে নগরের পরিচিত শপিংমল সানমার ওশান সিটি, ফিনলে সাউথ সিটি, আগ্রাবাদের সিঙ্গাপুর মার্কেট এবং টেরিবাজারের রাজস্থানসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম ও প্রতারণার চিত্র ধরা পড়ে।
অভিযান চলাকালে দেখা গেছে, অনেক দোকানে একই পোশাকে একাধিক ট্যাগ লাগিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। আবার কোথাও বাংলাদেশে তৈরি পণ্যের গায়ে ভারতীয় বা পাকিস্তানি ব্র্যান্ডের ট্যাগ লাগিয়ে বিদেশি পণ্য হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে পোশাকের গায়ে বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম স্পষ্টভাবে লেখা থাকলেও বিক্রেতারা ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করতে মুখে ভিন্ন তথ্য দিচ্ছেন। কোথাও পাকিস্তানি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করা হলেও সেটিকে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড বলে দাবি করা হচ্ছে। আবার কোথাও বিদেশি বলে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে, অথচ পণ্যের উৎপাদনস্থলের কোনো প্রমাণই দেখাতে পারছেন না দোকান কর্তৃপক্ষ।
এই প্রতারণার বাস্তব চিত্র সামনে আসে গত ৭ মার্চ নগরের কোতোয়ালি থানাধীন টেরিবাজার এলাকায় পরিচালিত এক অভিযানে। সেদিন দুপুরে ‘রাজস্থান’ নামে পরিচিত একটি পাঞ্জাবির দোকানে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অভিযানের সময় দেখা যায়, একই পাঞ্জাবির গায়ে দুটি ভিন্ন ট্যাগ লাগানো রয়েছে—একটিতে ভারতীয় ব্র্যান্ডের পরিচয় দেওয়া হয়েছে, অন্যটিতে বাংলাদেশি উৎপাদনের তথ্য রয়েছে। একই পণ্যকে বিদেশি বলে বেশি দামে বিক্রির প্রমাণ পাওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানের মালিককে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
ওইদিন অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ। তিনি জানান, দোকানে থাকা পণ্যের ট্যাগ ও বিক্রয় পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখা গেছে বাংলাদেশে তৈরি পণ্যকে ভারতীয় বলে দাবি করে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছিল। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণামূলক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
একই অভিযানে দেখা যায়, অনেক পণ্যের গায়ে বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম থাকলেও উৎপাদনস্থল বা আমদানির কোনো বৈধ নথি নেই। কিছু পোশাকে পাকিস্তানি ব্র্যান্ডের নাম যেমন আগানূর কিংবা সাদাবাহার লেখা থাকলেও দোকান কর্তৃপক্ষ ক্রেতাদের কাছে সেটিকে বাংলাদেশি ব্র্যান্ড হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন। আবার কিছু পোশাক বিদেশি বলে দাবি করা হলেও তাতে কোনো দেশ বা ব্র্যান্ডের নাম উল্লেখ ছিল না। পণ্যের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকা সত্ত্বেও বিদেশি বলে দাম বাড়িয়ে বিক্রির বিষয়টি ভোক্তা অধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
রাজস্থানে অভিযানের পর ৯ মার্চ নগরের আগ্রাবাদ এলাকার সিঙ্গাপুর ব্যাংকক মার্কেটেও একই ধরনের অনিয়ম ধরা পড়ে। ওই দিন পরিচালিত অভিযানে কয়েকটি পোশাক বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে মূল্য কারসাজি ও পণ্যের উৎস সম্পর্কে ভুয়া তথ্য দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ। অভিযানে অংশ নেন সহকারী পরিচালক মো. আনিছুর রহমান, মাহমুদা আক্তার ও রানা দেবনাথ এবং আলোকচিত্রী মো. আফতাবুজ্জামান।
অভিযানকালে জেন্টেল পার্ক নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পোশাকের গায়ে ডাবল স্টিকার ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। একই পোশাকে একাধিক দামের স্টিকার লাগিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছিল। এই অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই মার্কেটের আরেকটি প্রতিষ্ঠান শৈল্পিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে অন্যের তৈরি পোশাক নিজেদের উৎপাদিত বলে বিক্রি করার। এই অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
একই অভিযানে নিষিদ্ধ ও অননুমোদিত প্রসাধনী বিক্রির অভিযোগে ইন্টার লিঙ্ক কসমেটিকসকে পাঁচ হাজার টাকা এবং আরবি কালেকশনকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
চট্টগ্রামের আরেকটি বড় শপিংমল ফিনলে সাউথ সিটিতেও ১০ মার্চ পরিচালিত অভিযানে একই ধরনের প্রতারণার চিত্র ধরা পড়ে। ঈদের বাজারকে সামনে রেখে পরিচালিত ওই অভিযানে চারটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ জানান, অভিযানে দেখা গেছে কিছু প্রতিষ্ঠানে বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে পণ্য বিক্রি করা হলেও সেই দাবির পক্ষে কোনো বৈধ নথি নেই। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি বোরকার গায়ে ‘মেড ইন ইউএই’ লেখা থাকলেও দোকান কর্তৃপক্ষ উৎপাদন বা আমদানির কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে সেই পণ্যকে ‘মেড ইন সৌদি আরব’ বা ‘মেড ইন ইরান’ বলে বিক্রি করে দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ফিনলে সাউথ সিটিতে পরিচালিত অভিযানে ‘ফর ইউ আবায়’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ হাজার টাকা, গুজালকে ৩০ হাজার টাকা, ইরানি বোরকা হাউসকে ১৫ হাজার টাকা এবং খাদিঘরকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। খাদিঘরের ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে, তারা খোলা বাজার থেকে সাধারণ লুঙ্গি কিনে এনে নিজেদের ব্র্যান্ডের পণ্য হিসেবে বিক্রি করছে। অভিযানের সময় বিষয়টি ধরা পড়লে প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করা হয় এবং জরিমানা আরোপ করা হয়।
১১ মার্চ চট্টগ্রামের জিইসি এলাকায় সানমার ওশান সিটিতে পরিচালিত অভিযানে রেড আর্থ কসমেটিকসকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযোগ ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ চোখের লেন্স বিক্রি করা এবং আমদানিকারকের স্টিকারবিহীন বিভিন্ন প্রসাধনী বিক্রি করা। একই দিনে অ্যাঞ্জেলিক নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তৈরি কাপড় বিদেশি বলে বিক্রি করছিল, অথচ সেই পণ্যের জন্য যথাযথ ভাউচার দেখাতে পারেনি।
শুধু পোশাক নয়, নগরের বিভিন্ন শপিংমলে পরিচালিত অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির ঘটনাও সামনে এসেছে। শপিংমলের বিভিন্ন দোকানে এমন অনিয়ম পাওয়া যাওয়ায় পুরো বিপণিবিতানগুলোর তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা জানান, বড় বড় শপিংমলগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে দোকানগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেই তদারকি যথাযথভাবে করা হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম নগরে বর্তমানে একের পর এক নতুন শপিংমল, মার্কেট ও বিপণিবিতান গড়ে উঠছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সানমার, ফিনলে, সিঙ্গাপুর মার্কেট, রাজস্থানসহ আরও অনেক শপিং সেন্টার ক্রেতাদের আকর্ষণ করার জন্য নিজেদেরকে নামি ব্র্যান্ডের কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু বাস্তবে এসব মার্কেটের অনেক দোকানে বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে দেশি পণ্য বিক্রি কিংবা মূল্য কারসাজির মতো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সীমিত জনবল ও বিশাল শহরের কারণে সব মার্কেটে একসঙ্গে অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। তবে যেখানে অভিযান চালানো হচ্ছে, সেখানেই কোনো না কোনো অনিয়ম ধরা পড়ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, যেসব জায়গায় এখনো অভিযান হয়নি সেখানে কী ধরনের অনিয়ম চলছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ কালবেলাকে বলেন, ঈদের বাজারকে সামনে রেখে তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নানা কৌশলে প্রতারণার পথ বেছে নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে প্রতারণা, ভুয়া তথ্য প্রদান, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি বা মূল্য কারসাজির মতো অপরাধের জন্য জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তির বিধান রয়েছে। অভিযানে ধরা পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
একাধিক ক্রেতা জানান, ঈদের বাজার ঘিরে অসাধু ব্যবসায়ীদের দাপট বাড়ছে। মার্কেট ও শপিংমলগুলোতে নতুন পণ্যের পাশাপাশি পুরোনো পণ্যকেও নতুন বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন ট্যাগ লাগিয়ে। কিন্তু ক্রেতারা বুঝতে পারছেন না কোনটা নতুন আর কোনটা পুরোনো। বিশেষ করে ডিসকাউন্টের দোকানগুলোতে পুরোনো পণ্য বিক্রি বেশি দেখা যাচ্ছে। ‘ঈদ কালেকশন’ ব্যানার টানিয়ে এসব প্রতারণা করা হচ্ছে।