ভাই-বোনের মুখে হাসি ফোটানো দিপালী ফিরবেন লাশ হয়ে

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামের আকাশ আজ যেন আরও ভারি। যে মেয়েটি নিজের জীবন-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বছরের পর বছর প্রবাসে শ্রম দিয়েছেন, সেই দিপালী খাতুন ফিরবেন লাশ হয়ে। এখনও দেশে পৌঁছায়নি তার মরদেহ। বাড়িজুড়ে চলছে কান্না, আহাজারি আর অপেক্ষা। গত বুধবার (৮ এপ্রিল) লেবাননের রাজধানী বৈরুতের হামরা এলাকায় ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন দিপালী খাতুন। খবরটি পৌঁছানোর পর থেকেই চরভদ্রাসনের দরিদ্র পরিবারটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, দিপালী উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের চর হাজিগঞ্জ গ্রামের চর শালেপুর ওয়ার্ডের শেখ মোফাজ্জলের মেয়ে। বাবা দিনমজুর। মা রোজিনা খাতুন আট বছর আগে আকস্মিক বজ্রপাতে মারা যান। মাথাগোঁজার একমাত্র আশ্রয় সরকারি খাস জমির ঘর। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের সংসারে দিপালী ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান, কিন্তু দায়িত্বে ছিলেন সবার আগে। পরিবারের অভাব-অনটন তাকে বই-খাতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ২০১১ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান লেবাননে। সেখানে গৃহপরিচারিকার কাজ করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতেন বাড়িতে। সেই অর্থে ভাঙা দুটি কুঁড়েঘরের জা

ভাই-বোনের মুখে হাসি ফোটানো দিপালী ফিরবেন লাশ হয়ে
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামের আকাশ আজ যেন আরও ভারি। যে মেয়েটি নিজের জীবন-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বছরের পর বছর প্রবাসে শ্রম দিয়েছেন, সেই দিপালী খাতুন ফিরবেন লাশ হয়ে। এখনও দেশে পৌঁছায়নি তার মরদেহ। বাড়িজুড়ে চলছে কান্না, আহাজারি আর অপেক্ষা। গত বুধবার (৮ এপ্রিল) লেবাননের রাজধানী বৈরুতের হামরা এলাকায় ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন দিপালী খাতুন। খবরটি পৌঁছানোর পর থেকেই চরভদ্রাসনের দরিদ্র পরিবারটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া। নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, দিপালী উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের চর হাজিগঞ্জ গ্রামের চর শালেপুর ওয়ার্ডের শেখ মোফাজ্জলের মেয়ে। বাবা দিনমজুর। মা রোজিনা খাতুন আট বছর আগে আকস্মিক বজ্রপাতে মারা যান। মাথাগোঁজার একমাত্র আশ্রয় সরকারি খাস জমির ঘর। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের সংসারে দিপালী ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান, কিন্তু দায়িত্বে ছিলেন সবার আগে। পরিবারের অভাব-অনটন তাকে বই-খাতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ২০১১ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান লেবাননে। সেখানে গৃহপরিচারিকার কাজ করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতেন বাড়িতে। সেই অর্থে ভাঙা দুটি কুঁড়েঘরের জায়গায় ওঠে দুটি চারচালা টিনের ঘর। ভাইবোনদের বিয়ের খরচও বহন করেন তিনিই। নিজের জীবনের কথা কখনো ভাবেননি দিপালী। পরিবারের সদস্যরা জানান, বিয়ের জন্য অনেক চেষ্টা হলেও তিনি রাজি হননি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দেশে এলে পরিবার তাকে বিয়ে দিতে চাইলে আপত্তি জানান। পরে অভিমান নিয়েই ২০২৪ সালের এপ্রিলে আবার লেবাননে ফিরে যান। ছোট বোন লাইজু বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার বোন শুধু আমাদের জন্য বেঁচেছে। নিজের সুখ-স্বপ্ন কিছুই দেখেনি। প্রতি মাসে টাকা পাঠিয়ে সংসার চালিয়েছে। এখন আমরা শুধু তার মরদেহটা চাই। বড় বোন শেফালি বেগম বলেন, দেশে এলে সবার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসত। নিজের জন্য কিছু কিনত না। সারাজীবন শুধু পরিবারের কথাই ভেবেছে। নিহত দিপালীর বৃদ্ধ পিতা শেখ মোফাজ্জল (৭০) কান্নারত অবস্থায় বলে ওঠেন, ‘আল্লাহ দিপালীর মাইরে নিলে ঠাডার তলে, আর দিপালীরে নিলে বোমার তলে। এখন আমারে রাখছো ক্যান? আমারেও নিয়ে যাও, আমি আর বাঁচতে চাই না।’ চর হরিরামপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, দিপালী ছিলেন পরিবারের ভরসার নাম। তার পাঠানো অর্থেই বদলাতে শুরু করেছিল সংসারের চেহারা। কিন্তু যুদ্ধের আগুন কেড়ে নিল সেই স্বপ্নবাজ মেয়েটিকে। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, তার মরদেহ দ্রুত দেশে আনার ব্যবস্থা করা হোক। ফরিদপুর জেলা প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক আশিক সিদ্দিকী বলেন, পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। সেগুলো হাতে পেলেই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুত মরদেহ দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এদিকে শনিবার (১১ এপ্রিল) সকাল ১২টায় চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া মমতাজ নিহতের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এ সময় তিনি নগদ ১০ হাজার টাকা ও শুকনো খাবার সহায়তা দেন এবং ভবিষ্যতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। মরদেহ দেশে পৌঁছালে বিমানবন্দর থেকে বাড়ি আনা এবং দাফন-কাফনের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow