ভারতের কাঁটাতার আর ভিসার দেয়াল, বাংলাদেশের বিদ্বেষ

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির মিল, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ। কিন্তু এত কিছুর পরও সম্পর্কের ভেতরে সব সময় এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করেছে। কখনো সহযোগিতা বেড়েছে, আবার কখনো সন্দেহ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্ত হত্যা এবং ভিসা সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশেও ভারতবিরোধী বক্তব্য বেড়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক অবস্থানেরও অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এবং মানুষ হত্যা করে বন্ধুত্ব হয় না। মানুষ একদিন ওই বেড়া উপড়ে ফেলবে।” এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। কারণ এতে একদিকে সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণের সমালোচনা আছে, অন্যদিকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ ও

ভারতের কাঁটাতার আর ভিসার দেয়াল, বাংলাদেশের বিদ্বেষ

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতির মিল, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ। কিন্তু এত কিছুর পরও সম্পর্কের ভেতরে সব সময় এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করেছে।

কখনো সহযোগিতা বেড়েছে, আবার কখনো সন্দেহ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, সীমান্ত হত্যা এবং ভিসা সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশেও ভারতবিরোধী বক্তব্য বেড়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি মানুষের আবেগ ও রাজনৈতিক অবস্থানেরও অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এবং মানুষ হত্যা করে বন্ধুত্ব হয় না। মানুষ একদিন ওই বেড়া উপড়ে ফেলবে।” এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হয়েছে। কারণ এতে একদিকে সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণের সমালোচনা আছে, অন্যদিকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিফলনও আছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষ মনে করেন, ভারত একদিকে বন্ধুত্বের কথা বলে, অন্যদিকে সীমান্তে কাঁটাতার তোলে, গুলি চালায় এবং ভিসা প্রক্রিয়া কঠিন করে তোলে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়—এটি কি সত্যিই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক?

ভারত বহু বছর ধরেই বাংলাদেশ সীমান্তকে নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখে। ভারতের দাবি, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার, চোরাচালান ও জঙ্গিবাদ ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। এসব কারণ দেখিয়ে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। ভারতের রাজনীতিতে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন বিজেপি সীমান্ত নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের পর “অনুপ্রবেশ” ও “সীমান্ত সুরক্ষা” বড় রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। বিজেপি বারবার বলেছে, সীমান্ত শক্তিশালী করতে হবে এবং অবৈধ প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। এর ফলে সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণও রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এই কাঁটাতার শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটি অনেকের কাছে অবিশ্বাসের প্রতীক। কারণ দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে শুধু রাজনীতি নেই, মানুষের আবেগও জড়িত। সীমান্তের দুই পাশে একই ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। অনেক পরিবারের আত্মীয়-স্বজন দুই দেশেই বাস করেন। তাই কাঁটাতারকে অনেকে মানসিক দূরত্বের প্রতীক হিসেবেও দেখেন। সীমান্তে যখন গুলি চলে বা কোনো বাংলাদেশি নিহত হন, তখন সেই ক্ষোভ আরও বাড়ে।

শুধু কাঁটাতার নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা নিয়েও দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তি বেড়েছে। বহু বাংলাদেশি চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও ভ্রমণের জন্য ভারতে যান। কিন্তু ভিসা সীমিত বা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেননি। শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়েছেন। ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি হয়েছে যে ভারত ধীরে ধীরে এক ধরনের “ভিসার দেয়াল” তৈরি করছে। কাঁটাতারের পাশাপাশি এই ভিসা জটিলতাও এখন দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব বাড়াচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেরই উচিত উত্তেজনার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা। কাঁটাতারের দেয়াল বা ভিসার দেয়াল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয় না। আবার বিদ্বেষ ছড়িয়েও কোনো দেশের লাভ হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য দুই দেশকেই বুঝতে হবে, তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং বাস্তবতার কারণে একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

তবে এখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় বৈপরীত্য সামনে আসে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারতবিরোধী বক্তব্যের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মঞ্চে “চোখে চোখ রেখে কথা বলা”, “সেভেন সিস্টার খেয়ে দেওয়া” কিংবা ভারতকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা ব্যবহৃত হতে থাকে। এসব বক্তব্যের মাধ্যমে একধরনের আবেগনির্ভর জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সামনে আনা হয়, যেখানে ভারতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরা রাজনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করা হয়।

নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক পরিসর থেকেও এমন বক্তব্য বহুবার শোনা গেছে—এমন অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও কখনো কখনো কঠোর সুর শোনা যাওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচিত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই একই রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো কিংবা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কথা বলা হচ্ছে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে—রাজনীতি কি কেবল পরিস্থিতিনির্ভর অবস্থান বদলের নাম, নাকি এটি কৌশলগত বাস্তবতার কাছে আত্মসমর্পণ?

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। দুই দেশের মধ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতাও রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাজনৈতিক বক্তব্যে যতই উত্তেজনা থাকুক, বাস্তবে দুই দেশ একে অপরকে এড়িয়ে চলতে পারে না।

ভারতের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা কাজ করে। বাংলাদেশ এখন ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও চীনের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে দিল্লি। তাই ভারতও বাংলাদেশকে পুরোপুরি দূরে ঠেলে দিতে চায় না। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের রাজনীতিতে সীমান্ত ও নিরাপত্তা প্রশ্ন এখন ভোটের বড় ইস্যু। ফলে দিল্লির নীতিতে একধরনের দ্বৈততা দেখা যায়। একদিকে বন্ধুত্বের কথা বলা হয়, অন্যদিকে সীমান্তে কাঁটাতার বাড়ানো হয় এবং ভিসা কঠোর করা হয়।

বাংলাদেশেও একই ধরনের দ্বৈততা আছে। যারা সবচেয়ে বেশি ভারতবিরোধী বক্তব্য দেন, তারাই পরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার কথা বলেন। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা তাদের সেই জায়গায় নিয়ে আসে। শুধু আবেগ দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা যায় না। রাজনৈতিক বক্তব্যে ভারতকে শত্রু বানানো সহজ, কিন্তু বাস্তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া কঠিন।

এই অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সীমান্তে উত্তেজনা বাড়লে সীমান্ত এলাকার মানুষের জীবন কঠিন হয়ে যায়। ভিসা জটিলতা বাড়লে রোগী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েন। আবার রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘৃণা ছড়ায়। দুই দেশের মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। এটি দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য বিপজ্জনক।

ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশকেই বুঝতে হবে, প্রতিবেশী বদলানো যায় না। তাই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত বাস্তবতা, পারস্পরিক সম্মান ও আস্থা। সীমান্তে কাঁটাতার হয়তো নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেটি যদি বন্ধুত্বের জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে সমস্যা আরও বাড়বে। একইভাবে বাংলাদেশেও শুধু ভারতবিরোধী আবেগ ছড়িয়ে রাজনৈতিক লাভ খোঁজা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ভালো হবে না।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তাই শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি দুই দেশের সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা এক ধরনের অস্বস্তির প্রতিফলন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কাঁটাতার উপড়ে ফেলার কথা বলা যত সহজ, আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা তত কঠিন। কারণ আস্থা গড়ে ওঠে দায়িত্বশীল রাজনীতি, সম্মানজনক আচরণ ও বাস্তব সহযোগিতার মাধ্যমে।

শেষ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেরই উচিত উত্তেজনার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা। কাঁটাতারের দেয়াল বা ভিসার দেয়াল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ভালো সম্পর্ক তৈরি হয় না। আবার বিদ্বেষ ছড়িয়েও কোনো দেশের লাভ হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য দুই দেশকেই বুঝতে হবে, তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং বাস্তবতার কারণে একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow