ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি, তবুও থামছে না লিবিয়া-ইতালি মরণযাত্রা

উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন প্রতি বছরই বহু অভিবাসনপ্রত্যাশীর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যানুযায়ী, ভূমধ্যসাগরে প্রতি বছর গড়ে ২ হাজারের বেশি অভিবাসী ডুবে মারা যান বা নিখোঁজ হন। এদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই বাংলাদেশি। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনইচসিআর) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ২২ মার্চ পর্যন্ত ৫ হাজার ৯০১ জন সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৫৮ জন বাংলাদেশি। দালালচক্রের প্রলোভন এবং ইতালিতে থাকা কিছু প্রবাসীর প্ররোচনায় জীবন বাজি রেখে বিপজ্জনক এই পথে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। ইতালি যাওয়ার আশায় ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন তারা। কিন্তু অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার কেউ লিবিয়ায় বন্দিদশায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। আরও পড়ুন ভূমধ্যসাগরে ৮ মরদেহসহ ৩২ বাংলাদেশি অভিবাসী উদ্ধার  সমুদ্রপথে ইতালিতে আসা অভিবাসীদের শীর্ষে বাংলাদেশিরা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব নাগরিক লিবিয়া থেকে ইতালি রওয়ানা দেন (ভূমধ্যসাগর রুটে) তার ৩৯ শতাংশই বাংলাদেশি। বাংলাদ

ভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি, তবুও থামছে না লিবিয়া-ইতালি মরণযাত্রা

উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন প্রতি বছরই বহু অভিবাসনপ্রত্যাশীর প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যানুযায়ী, ভূমধ্যসাগরে প্রতি বছর গড়ে ২ হাজারের বেশি অভিবাসী ডুবে মারা যান বা নিখোঁজ হন। এদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই বাংলাদেশি।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনইচসিআর) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ২২ মার্চ পর্যন্ত ৫ হাজার ৯০১ জন সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৫৮ জন বাংলাদেশি।

দালালচক্রের প্রলোভন এবং ইতালিতে থাকা কিছু প্রবাসীর প্ররোচনায় জীবন বাজি রেখে বিপজ্জনক এই পথে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। ইতালি যাওয়ার আশায় ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন তারা। কিন্তু অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সাগরে প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার কেউ লিবিয়ায় বন্দিদশায় নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব নাগরিক লিবিয়া থেকে ইতালি রওয়ানা দেন (ভূমধ্যসাগর রুটে) তার ৩৯ শতাংশই বাংলাদেশি। বাংলাদেশিরা ইউরোপে পৌঁছাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন ভূমধ্যসাগর, যা সেন্ট্রাল মেডিটেরানিয়ান রুট হিসেবে পরিচিত। সেখানে যাওয়ার জন্য যাত্রা শুরু হয় মূলত লিবিয়া থেকে।

লিবিয়াফেরত বাংলাদেশি কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশটিতে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মানবপাচার চক্র সক্রিয়। বাংলাদেশিরা তাদের মাফিয়া বলেও ডাকেন। লিবিয়ার মাফিয়ারা ‘গেম ঘর’ বা অবৈধ আটক কেন্দ্রে কয়েক হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশীকে আটকে রাখেন। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে পরিবার থেকে অর্থ আদায় করছেন। ভয়াবহ নির্যাতন আর ক্ষুধার্ত অবস্থায় বহু বাংলাদেশি মারাও গেছেন।

সাতক্ষীরার বাসিন্দা আবু শহিদ গাজী দেড় বছর ধরে বন্দি লিবিয়ায়। গত বৃহস্পতিবার আবু শহীদ গাজীর বড় ভাই শহিদুল ইসলাম মুঠোফোনে জাগো নিউজকে বলেন, ‘টাকার জন্য আমার ভাইকে নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। ভাইকে আজ বোটে উঠাবে কাল উঠাবে বলে প্রথম কয়েক মাস অনেক টাকা নিয়েছিল। প্রতিনিয়ত আমার ভাইকে নির্যাতন করে, ভিডিও পাঠায়। খাবারের অভাব তো রয়েছে। আমাদের বাংলাদেশি দালাল সেখানে মাফিয়ার কাছে ভাইকে বিক্রি করে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস পরপর এখন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে দেয়, আর মারধরের ভিডিও পাঠায়। দালালের বিরুদ্ধে মামলা করছি, সে বিদেশে, দেশে আসে না। আমার ভাইকে ছাড়াতে পারছি না। প্রতিনিয়ত নির্যাতন করা হচ্ছে তাকে।’

২ বছরে ক্লিয়ারেন্স নিয়ে লিবিয়া গেছেন প্রায় ৬০০ কর্মী

এত ভয়াবহ পরিস্থিতির পরও লিবিয়ায় বৈধপথে কর্মী পাঠানো বন্ধ হয়নি। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির ভাষ্য, ইতালি যাওয়ার জন্য যেসব কর্মীকে লিবিয়া নেওয়া হচ্ছে, তারা জেনে বুঝেই যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট ভিসায় দুবাই কিংবা মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে তাদের লিবিয়া নেওয়া হচ্ছে।

লিবিয়ার গেম ঘরে বন্দি অবস্থায় নির্যাতন আর সাগরে মৃত্যুর মতো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ থেকেও সরাসরি ফ্লাইটে বহু কর্মী লিবিয়া যাচ্ছেন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ক্লিয়ারেন্স নিয়ে গত দুই বছরে প্রায় ৬০০ শ্রমিক লিবিয়ায় যান।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে লিবিয়া গেছেন ৫০ জন। ২০২৫ সালে গেছেন ১০০ জন বাংলাদেশি কর্মী। এর আগে ২০২৪ সালে দেশটিতে গিয়েছিলেন ৪৩৪ জন।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের তালিকায় শীর্ষে বাংলাদেশের নাগরিকরা। ২০২৫ সালে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ জন সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেন। এছাড়া সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ অথবা নিখোঁজ হয়েছেন ২ হাজার ৯৫০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি নাগরিক যান ইতালি।

গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেন। এ সময়ে কতজন মারা গেছেন বা নিখোঁজ আছেন, তার কোনো হিসাব নেই। তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম মনে করে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেন, তাদের ১২ শতাংশ বাংলাদেশি।

ইউএনএইচসিআরের তথ্যানুযায়ী, সাগর পথে ইতালি প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতি বছরই শীর্ষ অবস্থানে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে ১৪ হাজার ২৮৪ জন, ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৭৭৪ জন, ২০২২ সালে ১৫ হাজার ২২৮ জন, ২০২১ সালে ৭ হাজার ৮৩৮ জন এবং ২০২০ সালে ৪ হাজার ১৪১ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে ঢুকেছেন।

লিবিয়ায় গিয়ে সর্বস্বান্ত

২০২৫ সালের আগস্ট মাসে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরেন ঝিনাইদহের বাসিন্দা নজরুল। নজরুল মুঠোফোনে জাগো নিউজকে বলেন, মাফিয়ারা তার হাত-পায়ে শিকল পরিয়ে মারধর করত এবং সেই ভিডিও তার পরিবারের কাছে পাঠাতো। তার ওপর চলা ভয়ংকর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পরিবার জমিজমা বিক্রি করে এবং কিস্তি নিয়ে মোট ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ হিসেবে দেয়। দালাল ও মাফিয়াদের দিতে গিয়ে মোট ৩০ লাখ টাকা খরচ করে তিনি আজ সর্বস্বান্ত। স্ত্রী ও সন্তান তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। এখন তিনি ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশাহীন।

তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে ১২০ জন ফিরেছি। এর মধ্যে গেম ঘরে থাকা লোক খুবই কম। ওখানে যারা দীর্ঘদিন ধরে থাকে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে কাজ করে টিকে আছে। ১০ থেকে ৩০-৪০ হাজার টাকা কামায়। ওখানে থাকা অবস্থায় যে কোনো সময় বোটে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সুযোগ থাকে। মূলত এই লোভেই অনেকে কাজের উদ্দেশ্যে লিবিয়া যায়।’

লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো উচিত না, দাবি বায়রার

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘লিবিয়ায় কেন কর্মী নিয়োগের অনুমতি দিচ্ছে? এটা উচিত নয়। লিবিয়াকে ব্যবহার করে ইতালি পাঠানোর উদ্দেশ্য। অনেক শ্রমিক শুধু লিবিয়ায় কাজের উদ্দেশ্যে গেলেও গেম ঘরে তাদের বন্দি করে রাখে।’

তিনি বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই শ্রমবাজারেও সিন্ডিকেট রয়েছে। ১৫টা এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারে। লিবিয়া আর বিএমইটির কোনো ক্লিয়ারেন্স দেওয়া অনুচিত।’

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক গবেষণা বলছে, লিবিয়াফেরত ৫৫৭ বাংলাদেশির তথ্য অনুযায়ী, তাদের ৬০ শতাংশের পরিবারকে স্থানীয় দালালরা ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়েছিল। কিন্তু ৮৯ শতাংশই চাকরি বা কোনো কাজ পাননি। উল্টো নানা ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছেন।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিবিয়ায় চলমান অস্থিতিশীলতা, মানবপাচার চক্রের সক্রিয়তার কারণে দেশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সচেতনতার অভাব ও দ্রুত উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়াচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে কর্মী পাঠানো বন্ধ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘কয়েক বছর ধরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার শীর্ষে বাংলাদেশিরা। এভাবে ইতালি যাওয়ার পথে অনেক প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া লিবিয়ায় অনেক মানুষ ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার। ক্যাম্পে বন্দি রেখে তাদের নির্যাতন করা হয়। এরপর পরিবারকে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। এই যে বিদেশে কাজ বা শ্রম অভিবাসনের নামে মানবপাচার এটি ভয়াবহ সমস্যা। সেই তুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পিছিয়ে, পাচারের মামলাগুলোরও বিচার হচ্ছে না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।’

তিনি বলেন, যে দালালরা অভিভাবক ও তরুণদের ভালো চাকরি আর ইউরোপের প্রলোভন দেখাচ্ছে যেটি বাস্তব নয়। কাজেই সাধারণ মানুষ ও বিদেশগামীদের সবার আগে সচেতন হতে হবে। এলাকার স্থানীয় দালাল ও মানবপাচার চক্রকে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে গ্রেফতার করতে হবে।

আরএএস/এমআরএম/এমএমএআর/এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow