ভোটের অপেক্ষায় চা শ্রমিকরা, আট বছর ধরে বহাল পুরোনো নেতৃত্ব
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের মেয়াদ শেষ হয়েছে পাঁচ বছর আগেই। তবু এখনও তফসিল নেই, নেই ভোটের প্রস্তুতিও। ফলে ২০১৮ সালে নির্বাচিত কমিটিই টানা আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর ভোট হওয়ার কথা ছিল। সে হিসাবে ২০২১ সালেই নতুন কমিটি নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতায় এখনও নির্বাচন হয়নি। এতে চা শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ, আর দুর্বল হচ্ছে তাদের অধিকার আদায়ের সাংগঠনিক ভিত্তি। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬৮টি চা বাগান রয়েছে। এসব চা বাগানে নিবন্ধিত ভোটার প্রায় এক লাখ। এসব ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে পঞ্চায়েত, ভ্যালি ও কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিক ইউনিয়নে নির্বাচন না হওয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা, অধিকার আদায় এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যক
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের মেয়াদ শেষ হয়েছে পাঁচ বছর আগেই। তবু এখনও তফসিল নেই, নেই ভোটের প্রস্তুতিও। ফলে ২০১৮ সালে নির্বাচিত কমিটিই টানা আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছে।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর ভোট হওয়ার কথা ছিল। সে হিসাবে ২০২১ সালেই নতুন কমিটি নির্বাচিত হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন জটিলতায় এখনও নির্বাচন হয়নি। এতে চা শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ, আর দুর্বল হচ্ছে তাদের অধিকার আদায়ের সাংগঠনিক ভিত্তি।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬৮টি চা বাগান রয়েছে। এসব চা বাগানে নিবন্ধিত ভোটার প্রায় এক লাখ। এসব ভোটারের প্রত্যক্ষ ভোটে পঞ্চায়েত, ভ্যালি ও কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় অনেক বাগানে নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিক ইউনিয়নে নির্বাচন না হওয়ায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরা, অধিকার আদায় এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকরা।
বিভিন্ন চা বাগানে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠনের ভেতরে বিভাজন ও অসন্তোষ বাড়ছে। নির্বাচিত প্রতিনিধির অভাবে মজুরি, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন শ্রমিক কল্যাণমূলক বিষয় যথাযথভাবে মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।
শমশেরনগর চা বাগানের শ্রমিক পূর্ণিমা র্যালি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন হয়নি। যারা নির্বাচিত হন তারা আর এই পদ ছাড়তে চান না। চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা শ্রমিকদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করেনা। দ্রুত সময়ে নির্বাচন দেওয়া হোক।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুড়ভুড়িয়া চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি সুধীর রিকিয়াশন বলেন, ‘প্রায় আট বছর আগে নির্বাচন হয়েছিল। এরপর বহুবার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। নির্বাচনের মাধ্যমেই শ্রমিকদের মতামত প্রতিফলিত ও নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।’
চা শ্রমিক নেতা আকাশ দোষাদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় সংগঠন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের কথা বলার মতো কার্যকর প্ল্যাটফর্ম নেই। বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর একই নেতৃত্ব বহাল রয়েছে। অনেক বাগানে ২০১৮ সালের নির্বাচিত পঞ্চায়েত কমিটি বিলুপ্ত করে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরীর বলেন, নির্বাচন বিলম্বের অন্যতম কারণ গঠনতন্ত্র সংশোধন। বর্তমান কমিটি গঠনতন্ত্র সংশোধন করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে তুলেছে। আট বছর ধরে কেন্দ্রীয় নির্বাচন না হওয়ায় চা শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে সরকারের তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই এবারও সরকারের তত্ত্বাবধানেই নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়ায় চা বাগানগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা জরুরি।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পংকজ কন্দ বলেন, নির্বাচন বিলম্বের পেছনে শুধু অর্থসংকট নয়, প্রশাসনিক জটিলতাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে সরকারের অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে। এবারও সরকারকে একইভাবে নির্বাচন আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিষয়টি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শ্রমকল্যাণ মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, দ্রুত তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। আশা করছি, সব জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত তফসিল ঘোষণা হবে।’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল বলেন, ‘২০২৩ সালে তখনকার সরকার বলেছিল আমরা অর্থ দিবোনা, আপনারা অর্থ দিয়ে চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন করতে হবে। তখন আমরা ২৫ লাখ টাকা নির্বাচনের জন্য সরকারকে দিয়েছি। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শ্রম উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছি, তিনি আশ্বস্ত করেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচনের আয়োজন করে দেবেন। পরে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার আর কথা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবশেষ শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, জুলাই ২০২৬ এ নির্বাচনের আয়োজন করে দিবেন। তবে সন্ধা রাণী ভৌমিক নামে একজন হাইকোর্টে মামলা করেন। হাইকোর্ট বিষয়টি শ্রম অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দিলো। শ্রম অধিদপ্তর বিষয়টির জবাব দিয়েছেন। এখন চা শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মামলার শুনানি করা হবে কয়েকদিনের মধ্যে। আশাকরি মামলা নিষ্পত্তি হলে সরকারের সহযোগিতারয় নির্বাচন করতে পারবো। প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এতবড় নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ৯ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন কমিশনের মধ্যে ৩ জন সরকারের প্রতিনিধি আর ৬ জন শ্রমিক প্রতিনিধি থাকেন।’
বিভাগীয় শ্রম দপ্তর শ্রীমঙ্গল এর উপপরিচালক মহব্বত হোসাইন বলেন, ‘বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন আয়োজনের জন্য সম্প্রতি মন্ত্রণায়লে বৈঠক হয়েছে, মন্ত্রী নিজেও ওয়াকিবহাল আছেন। এর আগের সরকার চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের জন্য একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিল। সেসময় চা শ্রমিকদের একটি পক্ষ নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেছিলেন। এখানে আমাদেরকে বিবাদী করা হয়েছিল। ডিডি ওটার জবাব দিয়েছেন। এছাড়া নির্বাচন করার জন্য বাকি প্রক্রিয়া প্রস্তুত করা হচ্ছে। হাইকোর্টের ঝামেলাটা মিটলেই নির্বাচন হবে।’
মাহিদুল ইসলাম/এসজেডএইচ/এএসএম
What's Your Reaction?

