মধ্যবিত্তের সমন্বয় তত্ত্ব সমাচার

একটি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সমাজের এই শ্রেণি একদিকে যেমন উৎপাদন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও অন্যতম প্রধান অংশীদার। অথচ বাস্তবতা হলো, সমাজের অন্য যেকোনো শ্রেণির তুলনায় বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হয় মধ্যবিত্তকেই।‎সাধারণভাবে যারা নির্দিষ্ট মাসিক আয়ের উপর নির্ভরশীল, যাদের আয়ের প্রধান বা একমাত্র উৎস চাকরি কিংবা নির্ধারিত পেশাগত পারিশ্রমিক, তাদেরকেই মধ্যবিত্ত বলা হয়। তারা দারিদ্র্যসীমার উপরে অবস্থান করলেও উচ্চবিত্তের মতো আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সঞ্চয় সক্ষমতা তাদের থাকে না। ফলে ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। ‎মধ্যবিত্ত শ্রেণির কিছু বৈশিষ্ট্য সমাজে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারা সাধারণত শিক্ষিত, রুচিশীল ও সচেতন। আত্মসম্মানবোধ তাদের অন্যতম বড় সম্পদ। অর্থনৈতিক কষ্ট কিংবা অভাব-অনটন থাকলেও তারা সহজে কারো কাছে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারেন না। সমাজে নিজেদের অবস্থান ও মর্যাদা

মধ্যবিত্তের সমন্বয় তত্ত্ব সমাচার

একটি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণি। সমাজের এই শ্রেণি একদিকে যেমন উৎপাদন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও অন্যতম প্রধান অংশীদার। অথচ বাস্তবতা হলো, সমাজের অন্য যেকোনো শ্রেণির তুলনায় বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করতে হয় মধ্যবিত্তকেই।

সাধারণভাবে যারা নির্দিষ্ট মাসিক আয়ের উপর নির্ভরশীল, যাদের আয়ের প্রধান বা একমাত্র উৎস চাকরি কিংবা নির্ধারিত পেশাগত পারিশ্রমিক, তাদেরকেই মধ্যবিত্ত বলা হয়। তারা দারিদ্র্যসীমার উপরে অবস্থান করলেও উচ্চবিত্তের মতো আর্থিক নিরাপত্তা কিংবা সঞ্চয় সক্ষমতা তাদের থাকে না। ফলে ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।

‎মধ্যবিত্ত শ্রেণির কিছু বৈশিষ্ট্য সমাজে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তারা সাধারণত শিক্ষিত, রুচিশীল ও সচেতন। আত্মসম্মানবোধ তাদের অন্যতম বড় সম্পদ। অর্থনৈতিক কষ্ট কিংবা অভাব-অনটন থাকলেও তারা সহজে কারো কাছে সাহায্যের হাত বাড়াতে পারেন না। সমাজে নিজেদের অবস্থান ও মর্যাদা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। "মানুষ কী বলবে"—এই চিন্তাও তাদের জীবন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে সমাজের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গবেষণা, প্রশাসন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে মধ্যবিত্তের অবদান সবচেয়ে বেশি।

‎তবে মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো "সমন্বয় তত্ত্ব"। সীমিত আয়ের মধ্যে অসংখ্য খাতের ব্যয় মিটিয়ে চলতে হয় তাদের। মাসের শুরুতেই নির্ধারিত হয়ে যায় বাড়িভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের শিক্ষা ব্যয়, চিকিৎসা খরচ, পরিবহন ব্যয়, ডিপিএস কিংবা ঋণের কিস্তি। এসব ব্যয় মেটানোর পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়েই চালাতে হয় পরিবারের খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়।

‎এই অবস্থায় বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে মধ্যবিত্ত পরিবার। কারণ তাদের অতিরিক্ত ব্যয় বহনের সুযোগ সীমিত। উচ্চবিত্তের মতো তারা বাড়তি খরচ সহজে সামাল দিতে পারে না, আবার নিম্নবিত্তের মতো বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায়ও তারা আসতে পারেনা। ফলে মূল্যস্ফীতির পুরো অভিঘাত এসে পড়ে তাদের কাঁধে।

‎বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় প্রায়ই দেখা যায়, কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়লেই তার মূল্য বৃদ্ধি পায়। কখনো কখনো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেও মূল্য বাড়ানোর অভিযোগ ওঠে। একদিনে ৭০ টাকার চাল ৮০ টাকা হয়ে যায়; ভোজ্যতেল, ডাল, মাছ, মাংস কিংবা সবজির দামও হঠাৎ বেড়ে যায়। কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবার চাইলেই বড় পরিমাণে পণ্য কিনে মজুত রাখতে পারে না। কারণ তাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকে না। মাসিক আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই চলতে হয়।

‎ফলে যখন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ে, তখন তারা বাধ্য হয়ে খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনে। আগে যেখানে সপ্তাহে চার দিন মাছ খাওয়া হতো, সেখানে তা নেমে আসে দুই দিনে। ভালো মানের ভোজ্যতেলের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের বিকল্প ব্যবহার করা হয়। পুষ্টিকর খাদ্যের পরিবর্তে সস্তা খাদ্যের দিকে ঝুঁকতে হয়। কিন্তু সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করা যায় না, বাড়িভাড়া এড়ানো যায় না, অসুস্থ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনা বন্ধ করা যায় না, কিংবা গ্রামের পরিবারের কাছে টাকা পাঠানোও থামানো যায় না।

‎মধ্যবিত্তের জীবন মূলত সমন্বয়ের জীবন। তারা বিলাসিতা করতে পারে না, আবার সবকিছু ছেড়েও দিতে পারে না। তারা কারো কাছে ছোট হতে চায় না, আবার বাস্তবতার কাছেও হার মানতে চায় না। তাই প্রতিদিন নতুন করে হিসাব কষে, নতুন করে সমন্বয় করে, নতুন করে আশা নিয়ে পথ চলাই যেন মধ্যবিত্তের চিরন্তন নিয়তি।

‎মধ্যবিত্তের ট্র্যাজেডি এখানেই। তারা প্রতিবাদ কম করে, দাবি কম তোলে, আবার সাহায্য চাইতেও পারে না। তারা নীরবে হিসাব কষে, ব্যয় কমায়, চাহিদা সংকুচিত করে এবং জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করে। অন্যের কাছে হাত পাতার চেয়ে তারা নিজেদের জীবনধারাকে সমন্বয় করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাদের সংগ্রাম অধিকাংশ সময় দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু বাস্তবে সেই সংগ্রাম অত্যন্ত কঠিন।

‎রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে তাই মধ্যবিত্তের বাস্তবতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাজার তদারকি জোরদার করা, কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা জরুরি। কারণ মধ্যবিত্ত শুধু একটি অর্থনৈতিক শ্রেণি নয়; তারা একটি দেশের স্থিতিশীলতা, সৃজনশীলতা ও উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

‎মধ্যবিত্তের জীবন মূলত সমন্বয়ের জীবন। তারা বিলাসিতা করতে পারে না, আবার সবকিছু ছেড়েও দিতে পারে না। তারা কারো কাছে ছোট হতে চায় না, আবার বাস্তবতার কাছেও হার মানতে চায় না। তাই প্রতিদিন নতুন করে হিসাব কষে, নতুন করে সমন্বয় করে, নতুন করে আশা নিয়ে পথ চলাই যেন মধ্যবিত্তের চিরন্তন নিয়তি।

‎লেখক : অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow