‘মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি’
১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়নি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে ৮ হাজার হেক্টর জমির ধান বন্যার পূর্বাভাস আছে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হেল্পলাইন খোলা হয়েছে ‘জমির সব ধান শেষ। পরিবার নিয়ে বছরজুড়ে খাবারের ভরসা নেই। জমির যতটুক ধান কেটেছি তাও খলায় (ধান শুকানোর মাঠ) পড়ে পচন ধরেছে। ভেজা ধান কেউ কিনতেও চাচ্ছে না। সংসার চলবে কী দিয়ে, আর মানুষের টাকা দেবো কীভাবে- তা ভাবলেই আর সহ্য করতে পারছি না। এখন মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি’। চোখের সামনে ধান নষ্ট হতে দেখে এভাবেই আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার আতুকুড়া গ্রামের কৃষক ফজর আলী। আরও পড়ুন:বৃষ্টি-কৃষকের চোখের জলে একাকার হাওরের ধানের জমিধান হারিয়ে হাওরজুড়ে কৃষকের বোবাকান্নাএক সময়ের খরস্রোতা নদী এখন সরু নালাএবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?কালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদ জানা গেছে, জেলায় এক তৃতীয়াংশেরও কম জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি দুই তৃতীয়াংশ জমির ধান এখনো জমিতেই পড়ে আছে। বৃষ্টি, বজ্রপাত আর জোঁকের ভয়ে ধান কাটতে পারছেন না শ্রমিকর
- ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে
- ৩৮ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়নি
- বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে ৮ হাজার হেক্টর জমির ধান
- বন্যার পূর্বাভাস আছে
- বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হেল্পলাইন খোলা হয়েছে
‘জমির সব ধান শেষ। পরিবার নিয়ে বছরজুড়ে খাবারের ভরসা নেই। জমির যতটুক ধান কেটেছি তাও খলায় (ধান শুকানোর মাঠ) পড়ে পচন ধরেছে। ভেজা ধান কেউ কিনতেও চাচ্ছে না। সংসার চলবে কী দিয়ে, আর মানুষের টাকা দেবো কীভাবে- তা ভাবলেই আর সহ্য করতে পারছি না। এখন মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি’।
চোখের সামনে ধান নষ্ট হতে দেখে এভাবেই আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার আতুকুড়া গ্রামের কৃষক ফজর আলী।
আরও পড়ুন:
বৃষ্টি-কৃষকের চোখের জলে একাকার হাওরের ধানের জমি
ধান হারিয়ে হাওরজুড়ে কৃষকের বোবাকান্না
এক সময়ের খরস্রোতা নদী এখন সরু নালা
এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?
কালনী-কুশিয়ারার পেটে যাচ্ছে শত বছরের জনপদ
জানা গেছে, জেলায় এক তৃতীয়াংশেরও কম জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি দুই তৃতীয়াংশ জমির ধান এখনো জমিতেই পড়ে আছে। বৃষ্টি, বজ্রপাত আর জোঁকের ভয়ে ধান কাটতে পারছেন না শ্রমিকরা। রোদ না থাকায় কাটা ধান শুকানো নিয়েও দুশ্চিন্তায় গেরস্তরা। ফলে জমির বাকি ধান কাটতে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা।

হাওরে খোলায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে ধান/ ছবি: জাগো নিউজ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার হবিগঞ্জে ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছিল। ফলনও বাম্পার হয়েছে। কিন্তু অবিরাম বৃষ্টি এবং নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকার আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় বোরো ধান। পরে হাওরে পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে ধান। এখনো অধিকাংশ জমির ধানই কাটা সম্ভব হয়নি। এখন পর্যন্ত মাঠে রয়েছে ৮৪ হাজার ৮৫৭ হেক্টর জমির ধান। ৩৮ হাজার ২৯৪ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়নি। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ২৭ হাজার ৪৬৫ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ১০ হাজার ৮২৯ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে ৮ হাজার হেক্টর জমির ধান।
‘ভেজা ধান বিক্রি করার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। কেউ কিনতে চায় না। খলায় রাখা ধান বৃষ্টিতে ভিজে পচন ধরেছে। অনেক ধানে চারাও গজাতে শুরু করেছে। এখন আমাদের বাঁচার লড়াই করতে হবে’
সূত্র আরও জানায়, বৃষ্টিপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বানিয়াচং উপজেলায়। এ উপজেলায় প্রায় ২ হাজার ৬৯০ হেক্টর এবং আজমিরীগঞ্জে ১৭২০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। লাখাইয়ে নিমজ্জিত হয়েছে এক হাজার ৩৫০ হেক্টর জমির ধান।
তবে স্থানীয় কৃষকরা জানান, বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। বাস্তবে ১০ থেকে ১১ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকার ধান তলিয়ে যাচ্ছে। আরও কয়েক হাজার হেক্টর জমির ধান এখনো পুরোপুরি তলিয়ে যায়নি, তবে এসব জমিতেও পানি এসেছে।

শুকাতে না পেরে খোলায় পচন ধরেছে ধানে/ ছবি: জাগো নিউজ
কৃষক ফজর আলী বলেন, মোট ২২ কেদার (প্রায় সাড়ে ৬ একর) জমিতে বোরো আবাদ করেছি। জমিতে পানি আসতে দেখে আধাপাকা অবস্থায়ই কাটা শুরু করি। বৃষ্টিতে ভিজেই ১০ কেদার ধান কাটা হয়েছে। কিন্তু সে ধান আর শুকানো সম্ভব হয়নি। কোন রকম মাড়াই দিয়ে খলায় এনে রেখা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
তাঁত শিল্পে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বিদ্যুৎ বিভ্রাট
বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছেই, আলোর মুখ দেখে না প্রতিরোধে নেওয়া উদ্যোগ
ধানের বাম্পার ফলনেও হাওরজুড়ে হতাশা, খরচের টাকা উঠছে না কৃষকের
পশু বেচাকেনায় শত বছরের পুরোনো প্রথা বদলে দিচ্ছে ‘লাইভ ওয়েট’
বন্ধ চিনিকলে বাড়ছে দেনা-দুর্ভোগ
তিনি আরও বলেন, ভেজা ধান বিক্রির চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। কেউ কিনতে চায় না। খলায় ধান থেকে বৃষ্টিতে ভিজে পচন ধরেছে। অনেক ধানে আবার চারাও গজাতে শুরু করেছে। এখন আমাদের বাঁচার লড়াই করতে হবে।
কৃষক মোতাব্বির মিয়া বলেন, এ বছর ধারদেনা করে ২৫ কেদার (প্রায় সাড়ে ৭ একর) জমিতে বোরো করেছি। কিন্তু আগাম বৃষ্টির কারণে আধাপাকা, কাঁচা ধান কাটা শুরু করি। মাত্র ৭ কেদার জমির ধান কেটে খলায় রাখতে পেরেছি। বাকি ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কাটা ধানও এখন পচতে শুরু করেছে। ফলে ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, পরিবারের খাবার জোগানোই এবার কঠিন হবে।
‘এ বছর তিনি ২৫ কেদার (প্রায় সাড়ে ৭ একর) জমিতে বোরো আবাদ করেছি। ধারদেনা করে এসব জমি আবাদ করেছি। কিন্তু আগাম বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আধাপাকা, কাঁচা ধান কাটা শুরু করি। মাত্র ৭ কেদার জমির ধান কেটে এনে খলায় রাখতে পেরেছি। বাকি সব জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে’
সুবিদপুর গ্রামের কৃষক হরেন্দ্র সরকার বলেন, ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ৪ বিঘা জমিতে ধান করেছি। বৃষ্টিতে সব জমি তলিয়ে গেছে। পানির নিচে আমার স্বপ্ন তলিয়ে গেছে। আগামী দিনগুলো কীভাবে চলবে তা ভেবে পাচ্ছি না।

বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে ধানের জমি/ ছবি: জাগো নিউজ
বানিয়াচংয়ের ধান কাটা শ্রমিক সাহাব উদ্দিন জানান, প্রতিদিন দেড় হাজার টাকা মজুরিতে ধান কাটতে এসেছি। কিন্তু জোঁক আর বজ্রপাত আতঙ্কে জমিতে নামতে ভয় হচ্ছে।
‘জমির সব ধান শেষ। পরিবার নিয়ে বছরজুড়ে খাবারের ভরসা নেই। যতটুক ধান কেটেছি তাও খলায় পড়ে পচন ধরেছে। ভেজা ধান কেউ কিনতেও চাচ্ছে না। এখন মনকে সান্ত্বনা দেই ফসল দিয়েছেন আল্লাহ, নিয়েছেনও তিনি’
আতুকুড়া বাজারের ধান ব্যবসায়ী রইছ আলী বলেন, সরকারিভাবে কোনো মূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে কিছু ধান কিনেছি। কিন্তু সেগুলো আর বিক্রি করতে পারছি না। এসব ধান কিনেই বিপদে পড়েছি। মিলাররা ধান নিতে চায় না। গুদামেও দীর্ঘদিন ধান রাখার মতো না। কিছুদিন গেলেই ধান নষ্ট হতে থাকবে। বিক্রি করতে না পারলে ধান কিনে কি হবে।
হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ দ্বীপক কুমার পাল বলেন, মাত্র একদিন বিরতি দিয়ে শুক্রবার রাত থেকেই আবার পুরোদমে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে বন্যা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে। একদিনের ব্যবধানেই প্রায় ৫ হাজার হেক্টর নতুন জমি তলিয়ে গেছে। প্রতিনিতই নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি.এম. সরফরাজ বলেন, যদি বৃষ্টিপাত বাড়ে তবে আগাম বন্যা হবে না- সেটি বলা যাবে না। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যেই হেল্পলাইন খোলা হয়েছে। যেকোন প্রয়োজনে সেখানে যোগাযোগ করা যাবে।
এনএইচআর/এএইচ/জেআইএম
What's Your Reaction?