মাইলস্টোন স্কুলের বুকের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড : গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে, এটি তার নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল। ১০ মার্চ, ২০২৬ খ্রি. তারিখ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিএন্ডটি মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত, এই প্রকল্পটি সরকারের একটি ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলা ও ৩টি সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ৩৭,৮১৪টি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচির আওতায় চার কোটি পরিবারকে আনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। আশা করা হচ্ছে, এটি দারিদ্র্য বিমোচন (SDG-1), খাদ্য নিরাপত্তা (SDG-2) এবং লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসসহ (SDG-5) অন্যান্য বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের সহায়তা করবে।  প্রায় সময় যেটা হয়, আমরা সাধারণত : সরকারের গৃহীত এ ধরণের কোনো উদ্যোগকে নিছক একটি ভাতা প্রকল্প হিসেবে দেখতে শুরু করি। কিন্তু আমি জোর দিয়ে লেখার শুরুতে বলতে চাই এটি তেমন কোনো কিছু নয়। ফ্যামিলি কার্ডের ঘোষিত বক্তব্য, এর অন্তর্নিহিত দর্শন ও ডিজিটাল অবকাঠামোগত যে পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, এটা মূলত: গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশ

মাইলস্টোন স্কুলের বুকের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড : গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন
বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে, এটি তার নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল। ১০ মার্চ, ২০২৬ খ্রি. তারিখ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিএন্ডটি মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করেন। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত, এই প্রকল্পটি সরকারের একটি ডিজিটাল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলা ও ৩টি সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ৩৭,৮১৪টি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচির আওতায় চার কোটি পরিবারকে আনার পরিকল্পনা করেছে সরকার। আশা করা হচ্ছে, এটি দারিদ্র্য বিমোচন (SDG-1), খাদ্য নিরাপত্তা (SDG-2) এবং লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসসহ (SDG-5) অন্যান্য বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের সহায়তা করবে।  প্রায় সময় যেটা হয়, আমরা সাধারণত : সরকারের গৃহীত এ ধরণের কোনো উদ্যোগকে নিছক একটি ভাতা প্রকল্প হিসেবে দেখতে শুরু করি। কিন্তু আমি জোর দিয়ে লেখার শুরুতে বলতে চাই এটি তেমন কোনো কিছু নয়। ফ্যামিলি কার্ডের ঘোষিত বক্তব্য, এর অন্তর্নিহিত দর্শন ও ডিজিটাল অবকাঠামোগত যে পরিকল্পনা দেখা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়, এটা মূলত: গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনায়ন, সুরক্ষা-জালকে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা থেকে পরিবার-কেন্দ্রিকতায় রূপান্তরের একটি বৃহৎ, যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পাশাপাশি, তৃণমূলের অর্থনীতিতে বহুগুণক প্রভাব বা multiplier effect সৃষ্টিও এর অন্যতম লক্ষ্য,  যা আমি একটু পরেই ব্যাখ্যা করবো। তবে এখানে কয়েকটি টেকনিক্যাল বিষয় আছে, যেমন, PMT স্কোরিং, Dynamic Social Registry এবং ডিজিটাল নগদ সহায়তা।  মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি সংক্ষেপে Proxy Means Test (PMT) বলতে কি বোঝায় তার একটা বর্ণনা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি। সহজ কথায় PMT দারিদ্র পরিমাপের একটি পদ্ধতি। কোনো পরিবারের আসল আয় সরাসরি না পরিমাপ করে, পরিবারের দৃশ্যমান কোনো কিছু বা যাচাইযোগ্য বৈশিষ্ট্য দেখে ধারণা করা হয় পরিবারটি কতখানি দরিদ্র, বা কতখানি তারা দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে আছে। যেমন, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, পরিবার প্রধানের অবস্থা, জমিজমা আছে কিনা- থাকলে কতটুকু। জমি বাদে অন্যকোনো সম্পদ আছে কিনা, থাকলে সেটার প্রকৃতি ও পরিমাণ। বাড়ি আছে কিনা, থাকলে ঘরের মান, সুযোগ সুবিধা। শিক্ষার হাল, পরিবারের শিক্ষাগত অবস্থা কোন পর্যায়ের।  কখনো কখনো এক্ষেত্রে অবস্থানভিত্তিক তথ্য ও সূচক ব্যবহার করা হয়, যা পরিবারটির আর্থসামাজিক অবস্থাকে তুলে ধরে। এসব বিষয়কে একটি মান ‍দিয়ে পরে ক্যালকুলেশন করে বের করা হয় পরিবারটির Proxy Means Test স্কোর। তবে, এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যা বর্তমান সরকার উপলব্ধি করে এর সাথে আর একটি বিষয় যোগ করেছে। সেটি হলো, Dynamic Social Registry। এটা হলো দরিদ্র পরিবারের ডিজিটাল ডেটাবেইজ, যেখানে পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা সম্পর্কিত সকল তথ্য জমা থাকবে। ডিএসআর এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি ডায়নামিক, অর্থাৎ স্টাটিক হবে না। বাস্তব অবস্থার সাথে মিলিয়ে এটি নিরচ্ছিন্নভাবে আপডেট হতে থাকবে। এর ফলে, সহায়তা প্রদানের সময় ভুলভাল কম হবে। পাশাপাশি, নতুন করে যারা দরিদ্র হলো তারা এই সুরক্ষা জালে দ্রুত অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন। সুতরাং, ফ্যামিলি কার্ড শুধু যে নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম, তা নয়, বরং বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় এটি অধিকতর তথ্যনির্ভর, সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিতামূলক মানবিক একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, যে বিষয়ে আমি এখন আলোচনা করবো।   প্রথমেই বলে রাখি, এই কর্মসূচিটিকে চারটি বিশেষ বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখতে হবে। প্রথমত, এটি দারিদ্র শনাক্তকরণের কাজকে মনগড়া তালিকা তৈরির বেড়াজাল, তৃণমূলের অযাচিত প্রভাব ও দুর্বল প্রকৃতির অফিসনির্ভরতা থেকে সরিয়ে এনেছে এবং একটি সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার অধীনে নিয়েছে। সরকারের তথ্য হতে জানা যায় যে, দেশে বর্তমানে ২৫ টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে ৯৯টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী রয়েছে। ফলে এধরণের কাঠামোতে পৌনপুনিকতা, বাদপড়া এবং সমন্বয়হীনতা তৈরি হওয়া খুব স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, পরিবারে নারীর নামে কার্ড ইস্যুকরণ। এটিকে কোনো সিম্বোলিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। সরসরি নারীর হাতে সম্পদ পৌঁছানোর মানে হলো তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ সক্ষমতাবৃদ্ধি ও সামাজিক মর্যাদাবৃদ্ধি। তৃতীয়ত:, এটি তৃণমূলের অর্থনীতিতে বহুগুণক প্রভাব বা multiplier effect সৃষ্টি করবে মর্মে যে কথাটা আমি আগে উল্লেখ করেছি, এবার তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়া যাক। বিষয়টা সহজ কথায় বলা যায় এভাবে : একটি পরিবারের হাতে যখন টাকা যায়, পরিবার কর্তা তখন কিছু একটা কিনতে দোকানে যান। এতে করে দোকানদারের বিক্রি বাড়ে। দোকানদারও তার সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে একটি কেনাকাটার মধ্যে ঢূকে পড়েন। ধীরে ধীরে প্রক্রিয়াগতভাবে এভাবে আয় বৃদ্ধির একটি কার্যকর চক্র তৈরি হয়। যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল ও শক্তিশালী করবে। চতুর্থ বিষয়টি হলো, এর ভিশন। ২০৩০ সালকে টার্গেট করা হয়েছে যার মধ্যে এটিকে ‘সার্বজনীন সোশ্যাল আইডি’ ধরনের প্লাটফর্মে রূপান্তর করা হবে। আমার বিশ্বাস, এটি সফল হলে বাংলাদেশে সমাজসেবার প্যারাডাইম চেইঞ্জ হওয়ার মত বিষয় হবে। তখন আর ‘দয়া’ নয়, এটি পরিণত হবে ‘অধিকারে’।    এখানেই ফ্যামিলি কার্ড অনন্য ও এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল দৃশ্যমান। Dynamic Social Registry একটি কার্যকর পরিবারকেন্দ্রীক ভাতা প্রদান ব্যবস্থাপনা নয় শুধু; আখেরে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, প্রতিবন্ধিতা, কৃষি-সুযোগ-সুবিধা বিতরণ, পোস্ট-ডিজাস্টার রিহ্যাবিলিয়েশন, সবকিছুতে এটি সহায়ক হবে। পাশাপাশি, শহর ও গ্রাম পর্যায়ে প্রতিমুহূর্তে দারিদ্র্যের যে পরিবর্তীত অবস্থা, সেটা বোঝার ক্ষেত্রেও এই সামাজিক রেজিস্ট্রেশন এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে পরিগণিত হবে। নেপালের অভিজ্ঞতা হতে বলতে পারি, যখন নাগরিক রেজিস্ট্রেশন ও সামাজিক সুরক্ষা ভাতা ডিজিটালাইজ করা হয় ও প্রাপ্য অর্থ ব্যাংক হিসাবে সরাসরি পাঠানো হয়, তখন সেবা প্রদানের কাজে গতিবৃদ্ধি চলে আসে। তাছাড়া, এতে শুদ্ধতা ও নাগরিক সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাংকের একটি তথ্য হতে জানা যায়, নেপালে অনলাইন নিবন্ধন কার্যক্রম ৯৭ শতাংশের বেশি ওয়ার্ডে পৌছে গেছে। ৩.৫ মিলিয়ন মানুষের সবাই সামাজিক ভাতা তাদের ব্যাংক হিসেবে পেয়ে যাচ্ছেন। এই যে ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা, এটি স্থানিক পর্যায়ে গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমকে অধিকতর শক্তিশালী করেছে। আমাদের জন্য যে শিক্ষা এখানে, সেটি এই, একটি মানসম্মত সোশ্যাল রেজিস্ট্রেশন ভবিষ্যতের অকস্মাৎ আবির্ভুত সামাজিক বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার শক্তিশালী ভিত্তি হবে আশা করা যায়।  আমরা যদি সার্কের পরিপ্রেক্ষিত হতে গভীরে গিয়ে বিষয়টিকে দেখি, তাহলে দেখা যাবে যে, পাকিস্তানে ‘বেনজির ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম (BISP)’ এবং National Socio-Economic Registry (NSER) একটি জোরালো ভূমিকা পালন করেছে তাদের দারিদ্র ব্যবস্থাপনায়। পিএমটি, দরজায় দরজায় তথ্য সংগ্রহ, নারীর ক্ষমতায়ন-কেন্দ্রীক নগদ সহায়তা, বায়োমেট্রিক যাচাই পদ্ধতি এবং অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা যেটি সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে, তার সুফল পেয়েছে সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন তথ্য সূত্র হতে জানা যায়, NSER যখন আপডেট করা হয় তখন ৩৫ মিলিয়ন পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যা এখন একটি ডায়নামিক রেজিস্ট্রিতে রুপান্তরিত হচ্ছে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো BISP নিয়ে গবেষণা। দেখা যায় যে, যদি নারীর হাতে সরাসরি অর্থ দেওয়া হয় তাহলে তার সিদ্ধান্তগ্রহণে অংশগ্রহণ ও ভোটদানে অংশগ্রহণের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তার চলাফেরা সাবলিল ও ছন্দপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি ঘরগৃহস্থালী কাজে ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়। বাংলাদেশে সরকার কর্তৃক গৃহিত ফ্যামিলি কার্ড যদি কেবল হাতে টাকা পৌঁছানোর মধ্যে গন্ডিবদ্ধ না থাকে, এটা যদি প্রকৃত অর্থে নারীকে একটি দৃশ্যমান ক্ষমতাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তাহলে, এর আর্থসামাজিক প্রভাব সুদূর প্রসারি হবে।   তবে একটা বিষয় আমি সবাইকে স্মরণ রাখতে বলি। আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা আমাদেরকে শুধু আশাব্যঞ্জক করে না, সতর্কও করে। ভারতের ডিবিটি ও আধারকার্ড কেন্দ্রিক সমাজ সেবা ব্যবস্থাপনায় একদিকে যেমন বিস্তৃত পরিসরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছে, মধ্যস্বত্বভোগী কমানোর ক্ষেত্রে সাফল্য এনে দিয়েছে; অপরদিকে, বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে, অন্তর্ভুক্তি ও নাগরিক সন্তুষ্টি বিবেচনায় সার্বিক চিত্রটি সমানভাবে প্রশংসনীয় নয়। আধারকার্ড ভিত্তিক সামাজিক কর্মসূচী বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা হতে দেখা যায় যে, সেখানে অথেনটিকেশন ফেইলিওর রয়েছে। রয়েছে দেরিতে পেমেন্ট হওয়া, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয় ও প্রান্তিক মানুষের কাছে সাহায্য না পৌছানোর মত জটিল প্রশ্ন। ভারতীয় ব্যবস্থাপনায়, খন্ডিত কর্মসূচী, সুবিধা সহনের সমস্যা ও তথ্য নিরাপত্তার বিষয়সমূহ সেখানে চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। ফলে আমি যেটা বলতে চাই, তাহলো, আমাদের জন্য শিক্ষাটি খুব পরিস্কার। ডিজিটাল  হলেই হবে না, আমাদেরকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি উদাহরণ দেই। আমি একদিন বিদ্যুত অফিসে লোড ও রেট সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করতে যাই। সমস্ত কাগজপত্র অনলাইনে দেওয়ার পরও, কেন আমাকে একসেট ফটোকপি দিতে হবে, এর উত্তরে, দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা আমাকে বললেন, স্যার, হাফডিজিটাল সব চেয়ে খারাপ’। তার দেওয়া উত্তরের তাৎপর্য আমাদেরকে অনুধাবন করতে হবে। সুতরাং, অতিতের ব্যর্থতা থেকে আমাদেরকে শিখতে হবে। ব্যবস্থাকে গতিশীল ও মানবিক করতে হবে।     শ্রীলংকার aswesuma কর্মসূচি একটি অত্যন্ত বাস্তব শিক্ষা আমাদের সামনে হাজির করে। সেখানে পরিবার পর্যায়ের তথ্য, জিপিএস চালিত সমাজসেবামুলক তথ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, মানসম্মত উপযুক্ততা যাচাই, তালিকা প্রকাশনা, আপিল প্রক্রিয়া, সবই ছিল। কিন্তু তারপরও, আপিল ও অভিযোগ নিস্পত্তিতে দেরির কারণে কর্মসূচি সম্পাদন পিছিয়ে যায়। বিশ্বব্যাংক সূত্র হতে জানা যায়, আবেদন ও আপত্তি নিস্পত্তিতে দেরি হওয়ার কারনে ২০২৩ সালের প্রত্যাশিত অর্থপ্রদান কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দেয়। প্রক্রিয়াগত সময় বৃদ্ধি পায়। অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত হয়। শ্রীলংকার সংসদ সদস্যৃবৃন্দ বার বার তাদের পার্লামেন্টারি ডিবেইটে উল্লেখ করেছেন সুবিধাভোগি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সঠিক ও হালনাগাদ ডেটাবেইজ অপরিহার্য। তাছাড়া, স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর অর্থ খুব পরিস্কারভাবে এই, সঠিক তথ্য-কাঠামো থাকলেই হবে না, বৈধতার সংকট মোকাবেলায় আপিল, স্থানীয়ভাবে বৈধকরণ ও জনবিশ্বাস থাকা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।    এবার আমি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাই। প্রথম বৃহৎ চ্যালেঞ্জটি হলো, ভুল মানুষ নির্বাচন করে ফেলা বা যাদের পাওয়ার কথা সাহায্য তাদেরকে বাদ ফেলে দেওয়া। পিএমটি একটি প্রয়োজনীয় পদ্ধতি। কিন্তু এটিকে যাদুকরি সমাধান হিসেবে ভেবে বসলে, ভুল হবে। বিশ্বব্যাংকের আগের গবেষণা এক্ষেত্রে আমাদেরকে এই মর্মে সতর্ক করে যে, পিএমটি দিয়ে , সবচেয়ে দরিদ্র অর্থাৎ ১০ থেকে ২০ শতাংশ মানুষকে টারগেট করতে গেলে ‘এক্সক্লুশন এরর’ উল্লেখযোগ্য হতে পারে। অর্থাৎ, যাদের সাহায্য পাওয়ার কথা তারা বাদ পড়ে যেতে পারেন। সুতরাং, পিএমটির সাথে কমিউটি ভ্যালিডেশন, ভৌগোলিকভাবে রিমোট এলাকায় পৌঁছানো, পর্যবেক্ষণ, ও শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন হবে। গতিশীল সামাজিক নিবন্ধন সম্পর্কিত সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ব্যবধান কমাতে সাহায্য করে, এটা যেমন সত্য, তেমনি সঠিক অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি নতুন ব্যবধান তৈরিও করতে পারে। অতএব, আমি দৃঢ়ভাবে একটা কথা বলতে চাই, বাস্তবায়নকারীদের নীতি হতে হবে এখানে কম্প্রিহেনসিভা। মনে রাখতে হবে, গণিত ও পরিসংখ্যান আমাদেরকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সেটাকেই ধ্রুব ভাবা উচিত হবে না। একটি উপায়কে অন্য একটি পদ্ধতি দ্বারা সমর্থিত করে নিতে হবে।  দ্বিতীয় বাধাটি হলো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা। দীর্ঘ অপশাসনের জাঁতাকলে পড়ে এটা সত্য যে, বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়নি, সর্বস্তরে বিরাজ করছে ঘুষ দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা। ফলে আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা শুন্যের কোটায়। একবার একটি পরিবারকে তালিকাভুক্ত করে ফেলা, সহজ একটি কাজ। কিন্তু জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, কর্মহানি, প্রতিবন্ধিতা, দুর্যোগ, বাসস্থান বদল, আয় পতন – এসব পরিবর্তনকে মাথায় রেখে সাথে সাথে তথ্যের আপডেট করে যাওয়া, অনেক কঠিন ও জটিল। বিশেষত: আমাদের মত দুর্বল অবকাঠামোর দেশে। ডায়নামিক রেজিস্ট্রিতে যেতে পাকিস্তান রেজিস্ট্রেশন সেন্টার ও অন-ডিমান্ড আপডেট ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছে। নেপাল ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল সিভিল রেজিস্ট্রেশন ও ই-পেমেন্ট-এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে সিস্টেমকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে, শ্রীলংকায় দেখা যায়, মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদেরকে যদি পর্যাপ্ত তথ্য দেওয়া না হয় ও তাদেরকে ভূমিকাকে খাটো করা হয়, তাহলে অনেক ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ইউনিয়ন, পৌরসভা, ওয়ার্ড, উপজেলা ও জেলা লেভেলে প্রশিক্ষণ এসওপি, অডিট ও হাতেকলমের সহায়তা ছাড়া এই কর্মসূচী থেকে ভাল ফল পাওয়া সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে, এটা কাগজে কলমে খুব ভাল দেখাবে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ফলাফল হবে শূন্য।  তৃতীয় যে চ্যালেঞ্জটি সামনে আসবে সেটা হলো, অর্থায়ন, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বাস্তব প্রেক্ষিত ও নারীর ক্ষমতায়নের বাস্তব অর্থ নিয়ে। বিভিন্ন সরকারি ও সংবাদসূত্রে জানা যায় যে, কর্মসূচী বৃহৎ পরিসরে বিস্তৃত হওয়ার সাথে সাথে ব্যয়ও বড় অংকের হবে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গিকার ও আর্থিক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হতে শুরু করবে। তাছাড়া, এটাও সত্য যে, নারীর নামে কার্ড বরাদ্দ দিলেই সয়ংক্রীয়ভাবে তার যথার্থ ক্ষমতায়ন হয়ে যায় না। আন্তর্জাতিক পরিসর হতে পাওয়া প্রমাণ হতে দেখা যায় যে, সঠিকভাবে অর্থ স্থানান্তর হলে নারীর দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এটা সত্য। তাছাড়া, ঘনিষ্ট পার্টনারের দিক থেকে সহিংসতা কমারও সমর্থন পাওয়া যায়। কিন্তু নারিবাদি লেখালেখি এই মর্মেও আমাদের সতর্ক যে, ভুলভাবে কৃত নকশা নারীর উপর সামাজিক নজরদারিও চাপিয়ে দিতে পারে। সুতরাং, আমার মতে, বাংলাদেশের বাস্তবায়নকারীদের খেয়াল রাখতে হবে এটা যে, নারীর নামে প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ করলেই হবে না, প্রাপ্যের উপর তার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হচ্ছে কী না সেটাও দেখতে হবে।  চতুর্থ যে চ্যালেঞ্জটিকে আমি ‍গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতে চাই, তাহলো : তৃণমূলের দলীয় নেতৃত্ব ও কর্মীবৃন্দের সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ওঠার নৈতিক দায়। আমরা সবসময় সবকিছুকে দলীয় ফ্রেমে আবদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়ে উঠি। এটা সচেতন ও শক্তভাবে আমাদের আটকাতে হবে। যিনি প্রকৃত হকদার, যিনি সত্যিকার অর্থে কার্ডটি ডিজার্ভ করেন, আমরা যেন তাকেই সেটা দেই। যেভাবেই হোক, এটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।  অতএব বিস্তারিত আলোচনা শেষে, আমি বাস্তবায়নকারীদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা বলতে চাই। প্রথমত, সুবিধাভোগী নির্বাচনে পিএমটি স্কোরের সাথে সাথে টেকনিক্যালি, স্থানীয়ভাবে যাচাইবাছাইয়ে অপশন রাখা। পাশাপাশি, তালিকা প্রকাশ্যকরণ, মতামত শ্রবণ, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল নিস্পত্তিকরণ ও স্বাধীন নীরিক্ষা পদ্ধতির প্রবর্তন করা। দ্বিতীয়ত, অর্থপরিশোধের ক্ষেত্রে দ্বৈতসুবিধা রাখা। অর্থাৎ, বিকাশ, নগদ ও ব্যাংক পদ্ধতির পাশাপাশি, সহায়তামুলক সেবা-পয়েন্ট খুলতে হবে। যাতে করে সুবিধাভোগীদেরকে অফলাইনে সেবা প্রদান করা যায় ও ‘ফেইলড অথিনটিকেশনের’ ক্ষেত্রে মানুষ একটা বিকল্প পান। তৃতীয়ত, রেজিস্ট্রি আপডেটকরণকে এককালীন জরিপের মাধ্যমে শেষ করে দিলে হবে না, তাকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। জন্মমৃত্যু নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, স্থানীয় সরকার ও সামাজিক নিরাপত্তা ডেটাবেইজের মধ্যেকার আন্তঃসংযোগকে ধাপে ধাপে চুড়ান্ত অবস্থায় নিতে হবে, যাতে টোটাল বিষয়গুলি যুথবদ্ধ ও সমন্বিত থাকে। চতুর্থত, কার্ডটি নারীর নামে ইস্যুর সাথে সাথে তার আর্থিক হিসাবসক্ষমতা বৃদ্ধি, অভিযোগ-বিষয়ক গোপনীয়তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নারী, পুরুষ, ছেলে-মেয়ে, সবার প্রয়োজন যেমন আলাদা, চরিত্রও তেমনি ভিন্ন; এটা বিবেচনায় রেখে ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজন, ঝুঁকি ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, কর্মসূচির সাফল্য একটু ভিন্নভাবে পরিমাপ করতে হবে। সেক্ষেত্রে, প্রশ্নটি ‘কত পরিবার অর্থ পেল’ এমন না হয়ে, হবে এমন : ‘কত শতাংশ প্রকৃত দারিদ্র বাদ পড়লো’ ‘কত সংখ্যক অভিযোগ টাইমলি সুরাহা হলো’ ‘কত সংখ্যক প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাদ পড়লো না’ ও ‘কত সংখ্যক নারী নিজে নিজে নিজের অর্থ খরচের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন’ ইত্যাদি।  এভাবে আগানো গেলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সাফল্য বয়ে আনবে নিশ্চিত। এটি হয়ে উঠবে শহীদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত সামাজিক ন্যায়বিচারের চুড়ান্ত আখ্যান। তা না হলে, এটি জাস্ট একটি বৃহদাকৃতির প্রশাসনিক প্রকল্প হয়ে থেকে যাবে। অতএব, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচীর প্রকৃত বিষয়টি ভাতার অংক দিয়ে বিচার করা যাবে না। এটি বিচার করতে হবে রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র দিয়ে। একটি রাষ্ট্র যখন শ্লোগান দিচ্ছে এই মর্মে যে, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’, তখন তাকে প্রমাণও করতে হবে যে, রাষ্ট্র পরিবারকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে নয়, দেখছে তথ্যভিত্তিক সুবিচারের পরিপ্রেক্ষিতে; নারীকে সে শুধু একটি কার্ড দিয়ে প্রতীকী গল্প বলতে চাইছে না, সে তাকে বাস্তব ক্ষমতাও দিচ্ছে। দরিদ্র মানুষকে প্রশাসনিক ফাইলে আবদ্ধ করছে না, সে তাকে এই মর্মে স্বীকৃতিও দিচ্ছে যে, সে একজন অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।   আমি দক্ষিণ এশিয়ার আলোকে বলতে পারি যে, হ্যা, সফল হওয়া সম্ভব। সেটি হবে বিশ্বাসের, শুধু প্রযুক্তির নয়। ডেটার নয়, ডেটার ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের। বক্তব্যের নয়, করে দেখানোর। বাংলাদেশে গৃহীত সরকারী কর্মসূচী তাই বাস্তবায়নকারীদের সামনে একটি সুযোগ এনেছে, এনেছে চ্যালেঞ্জও। এটি যুগান্তকারী যেমন হতে পারে, তেমনি হতে পারে আর একটি জটিল তালিকাভিত্তিক কর্মসূচীও। বাস্তবায়নকারীদের উদ্দেশ্যে শুধু বলতে চাই, আসুন কথা নয় কাজে মনোনিবেশ করা যাক। কারণ, Actions speak louder than words.  লেখক : প্রফেসর, লোক প্রশাসন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া  

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow