মাছ চাষের গুরুত্ব, যে কারণে কমছে উৎপাদন
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। আমাদের কৃষকেরা কৃষিকাজ বলতে মূলত খাদ্যশস্য উৎপাদনকে বুঝে থাকেন। খাদ্যশস্য উৎপাদনে মানুষ সম্প্রতি অধিক মনোযোগী হয়। ফলে দেশ এখন খাদ্যশস্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছে। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আদিকাল থেকেই দেহের আমিষ জাতীয় খাদ্য জোগানের উৎস্য হিসেবে মাছ অর্ন্তভুক্ত। পূর্বে মুক্ত জলাশয় থেকে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যেত। যার ফলে কৃষকরা মাছ চাষের প্রয়োজনীয়তা তেমনভাবে অনুভব করেননি। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ফলে মাছের চাহিদাও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট কতিপয় কারণে মাছ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে: পলি পড়ে জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া। অপরিকল্পিতভাবে কৃষিকাজে পানি সেচ ব্যবহার। অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় কৃষিজমিতে ও মাছের ঘেরে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ। অতিমাত্রায় ছোট ও ডিমওয়ালা মাছ আহরণ। তবে আশার কথা, চাষের মাছে বিশ্বসেরা পাঁচে বাংলাদেশ। নদী-হাওরের আহরণে শুধু ভারতের পেছনে। বিশ্বে মিঠাপানির মাছ উৎপাদনের কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে সরছে। আর তাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উ
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। আমাদের কৃষকেরা কৃষিকাজ বলতে মূলত খাদ্যশস্য উৎপাদনকে বুঝে থাকেন। খাদ্যশস্য উৎপাদনে মানুষ সম্প্রতি অধিক মনোযোগী হয়। ফলে দেশ এখন খাদ্যশস্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগোচ্ছে। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় আদিকাল থেকেই দেহের আমিষ জাতীয় খাদ্য জোগানের উৎস্য হিসেবে মাছ অর্ন্তভুক্ত। পূর্বে মুক্ত জলাশয় থেকে প্রচুর পরিমাণে মাছ পাওয়া যেত। যার ফলে কৃষকরা মাছ চাষের প্রয়োজনীয়তা তেমনভাবে অনুভব করেননি। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ফলে মাছের চাহিদাও দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট কতিপয় কারণে মাছ উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হচ্ছে:
- পলি পড়ে জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া।
- অপরিকল্পিতভাবে কৃষিকাজে পানি সেচ ব্যবহার।
- অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় কৃষিজমিতে ও মাছের ঘেরে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশকের ব্যবহার।
- বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ।
- অতিমাত্রায় ছোট ও ডিমওয়ালা মাছ আহরণ।
তবে আশার কথা, চাষের মাছে বিশ্বসেরা পাঁচে বাংলাদেশ। নদী-হাওরের আহরণে শুধু ভারতের পেছনে। বিশ্বে মিঠাপানির মাছ উৎপাদনের কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে সরছে। আর তাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য দেখাচ্ছে, মাছসহ জলজ প্রাণী উৎপাদন বা চাষে বিশ্বে পঞ্চম স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। আর অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের ওপরে ভারত ছাড়া আর কেউ নেই। এফএওর প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ২০২৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে বিশ্বে মাছসহ জলজ খাতের মোট উৎপাদন রেকর্ড ২৩ কোটি ৫০ লাখ টনে পৌঁছায়। এর মধ্যে ১৯ কোটি ৫০ লাখ টন ছিল জলজ প্রাণী এবং ৪ কোটি টন ছিল শৈবাল। এ খাতের বিক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৫৬ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। বিভিন্ন দেশে জলজ চাষের মধ্যে মাছের পাশাপাশি আরও নানা কিছু থাকলেও বাংলাদেশে জলজ চাষ বলতে মূলত মাছই বোঝায়। জলজ প্রাণী চাষে চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ভিয়েতনামের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।
অন্যদিকে চাষের বাইরে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে জলজ প্রাণী আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আহরণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে মূলত মাছই ধরা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে মাছ চাষে বড় ধরনের অগ্রগতি এসেছে, যা অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশের জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মৎস্য খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৮১ শতাংশ। এএফওর আগের প্রতিবেদনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ আগে যে অবস্থানে ছিল, তা-ই ধরে রেখেছে। তবে সর্বশেষ প্রতিবেদনে একটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখা গেছে চিংড়ি উৎপাদনে। এ ক্ষেত্রে আগেরবার বাংলাদেশ চতুর্দশ স্থানে থাকলেও এবার একধাপ এগিয়েছে। কারণ আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণে পুকুর-দিঘি ও উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি প্রকল্প আছে। তাতে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে চিংড়ি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে। দেশে বর্তমান ১.৪৭ লাখ হেক্টর আয়তনের ১৩ লাখ চাষ উপযোগী পুকুর-দিঘি আছে।
এ ছাড়া ১.১০ লাখ হেক্টর আয়তনের উপকূলীয় চিংড়ি খামার আছে। কৃষিকাজের চেয়ে মাছ ও চিংড়ি চাষ বেশি লাভজনক বিবেচিত হওয়ায় বর্তমানে কৃষকেরা বিপুল উৎসাহ নিয়ে চিংড়ি ও মাছ চাষে এগিয়ে আসছেন। সঠিক ব্যবস্থাপনায় মাছ ও চিংড়ি চাষ সম্ভব হলে এসব পুকুর-দিঘি ও চিংড়ি খামার থেকে বছরে প্রায় ৩ লাখ টনেরও বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। যা কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষ সম্প্রসারণের এ বিপুল সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে ময়মনসিংহে ডানিডার আর্থিক সহায়তায় মাছ চাষ সম্প্রাসরণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। চাষিদের ঋণ দেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি চাষিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত পদ্ধতিতে মাছ চাষ চলছে। আত্মকর্মসংস্থান ও চাষিদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি পরিচালনাধীন আছে। বর্তমানে প্রকল্পাধীন পুকুরে মাছ উৎপাদনের পরিমাণ হেক্টর প্রতি গড়ে ৩.৩৮ মেট্রিক টন। কৃষি ক্ষেত্রে শস্যজাত পণ্য উৎপাদনের চেয়ে উন্নত পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদন যে বেশি লাভজনক, তা ময়মনসিংহের এ প্রকল্পের তথ্য থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পূর্বে এবং বাস্তবায়নের পরে উন্নত পদ্ধতিতে মাছ চাষ সম্প্রসারণ কর্মকাণ্ডে কৃষকদের আয়ের উৎস বৃদ্ধি পেয়েছে। আধা-নিবিড় চাষের পূর্বে ও আধা-নিবিড় চাষের ফলে কৃষকদের আয়ের উৎস তুলনা করলে দেখা যায়, আধা-নিবিড় চাষের পূর্বে যেখানে মাছ চাষ থেকে আয়ের উৎস ছিল ৬%। বর্তমানে সেখানে আধা-নিবিড় চাষের ফলে আয়ের উৎস মাছ চাষ থেকে ৩৮% এ উন্নীত হয়েছে। কৃষিখাতে আয়ের উৎস ৭০% থেকে হ্রাস পেয়ে ৪৬% দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে অর্থ উপার্জনের উৎস হিসেবে জনগণ মাছ চাষ কার্যক্রমে অধিক হারে আগ্রহী হয়ে পারিবারিক আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে মাছ চাষ ও কৃষিকাজ থেকে অর্জিত আয়ের তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শুধু কৃষিকাজ থেকে যেখানে মোট মুনাফা পাওয়া যায় শতকরা ৫৮.৯৮ ভাগ। সেখানে কেবল মাছ চাষ করে লাভ হয় শতকরা ১২৮ ভাগ। আর মাছ ও মুরগির সমন্বিত চাষ থেকে পাওয়া যায় শতকরা ৯০.৫০ ভাগ। এতে সহজেই বোঝা যায়, মাছ চাষ কার্যক্রম কৃষিকাজের চেয়ে বেশি লাভজনক ও কৃষকের আয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। সারাদেশের পুকুর-দিঘি ও চিংড়ি খামারে সম্প্রাসরণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে উন্নত পদ্ধতিতে মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন করা হলে কৃষকদের আর্থ-সামাজিক আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি সাধিত হবে। মাছ চাষ স্বল্প পুঁজি ও স্বল্প শ্রম নির্ভর একটি কর্মকাণ্ড। যা থেকে অর্জিত আয়ের পরিমাণ যে কোনো কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি। তার ওপরে এ থেকে জনগণের পুষ্টিসাধন, শ্রমের জোগান ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধিত হয়। এসব কারণেই কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মাছ চাষের গুরুত্ব অপরিসীম।
এসইউ
What's Your Reaction?

