মা দিবস চালু করে সেটি নিয়েই কেন আক্ষেপ

মাকে ভালোবাসার জন্য কি আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন আছে? হয়ত নেই। তবুও পৃথিবীর কোটি মানুষ প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালন করে ‘মা দিবস’।  ফুল, কার্ড, উপহার আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে ভালোবাসার নানা প্রকাশে ভরে ওঠে দিনটি। অথচ এই মা দিবসের প্রবর্তক আনা জারভিস জীবনের শেষভাগে এসে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন এই দিনটির বাণিজ্যিক রূপ দেখে। মা দিবসের পেছনের গল্পটা শুধু ভালোবাসার নয়, বরং এক নারীর আবেগ, সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত গভীর হতাশার গল্পও। ১৯০৫ সালে মারা যান আনা জারভিসের মা অ্যান রিভস জারভিস। মায়ের মৃত্যু আনার জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রকাশের জন্য ১৯০৭ সালে তিনি একটি স্মরণসভার আয়োজন করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় মা দিবসের যাত্রা। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। ১৯১০ সালে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আর ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র জুড়েই আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। আনার স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ—সন্তান যেন অন্তত একটি দিন মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গ

মা দিবস চালু করে সেটি নিয়েই কেন আক্ষেপ
মাকে ভালোবাসার জন্য কি আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন আছে? হয়ত নেই। তবুও পৃথিবীর কোটি মানুষ প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালন করে ‘মা দিবস’।  ফুল, কার্ড, উপহার আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে ভালোবাসার নানা প্রকাশে ভরে ওঠে দিনটি। অথচ এই মা দিবসের প্রবর্তক আনা জারভিস জীবনের শেষভাগে এসে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন এই দিনটির বাণিজ্যিক রূপ দেখে। মা দিবসের পেছনের গল্পটা শুধু ভালোবাসার নয়, বরং এক নারীর আবেগ, সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত গভীর হতাশার গল্পও। ১৯০৫ সালে মারা যান আনা জারভিসের মা অ্যান রিভস জারভিস। মায়ের মৃত্যু আনার জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা প্রকাশের জন্য ১৯০৭ সালে তিনি একটি স্মরণসভার আয়োজন করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় মা দিবসের যাত্রা। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। ১৯১০ সালে ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আর ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র জুড়েই আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। আনার স্বপ্ন ছিল খুব সাধারণ—সন্তান যেন অন্তত একটি দিন মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আবেগের জায়গা দখল করে নেয় ব্যবসা। মা দিবস জনপ্রিয় হওয়ার পরপরই ফুল, গ্রিটিংস কার্ড, চকলেট ও উপহারের ব্যবসায়ীরা দিনটিকে বড় বাণিজ্যিক সুযোগ হিসেবে দেখতে শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ অফার আর প্রচারণা নিয়ে বাজারে নামে। দিনটি দ্রুত পরিণত হয় বিশাল ব্যবসায়িক আয়োজনে। ইতিহাসবিদ ক্যাথেরিন আন্তোলিনির ভাষায়, ‘আনা কখনোই মা দিবসের বাণিজ্যিকরণ চাননি। কিন্তু শুরু থেকেই এটি ব্যবসার অংশ হয়ে ওঠে।’ এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারেননি আনা জারভিস। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে প্রকাশ্যে ফুল ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেন। এক পর্যায়ে তিনি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘লোভী ব্যবসায়ীরা একটি সুন্দর ও আন্তরিক উদযাপনকে নষ্ট করে দিচ্ছে।’ ফুলের দাম বেড়ে গেলে তিনি মানুষকে মা দিবসে ফুল না কেনারও আহ্বান জানান। এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই দিবস ব্যবহার করে তহবিল সংগ্রহ করুক, সেটিও পছন্দ করতেন না তিনি। ১৯২০ সালের দিকে তিনি মানুষকে আহ্বান জানান যাকে কেউ আর ফুল না কেনে।  ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া কলেজের অধ্যাপক আন্তোলিনি জানান, আনা তার এই আবেগপূর্ণ দিনটি কোন সংস্থার ব্যবহার করা নিয়েও হতাশ ছিলেন। সেটা যদি কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান এই দিনকে কাজে লাগিয়ে তহবিল সংগ্রহ করে সেটা নিয়েও আপত্তি ছিল তার। তার মতে, ‘মা দিবস মায়েদের সম্মান জানানোর দিন, করুণা দেখানোর নয়।’ একসময় মা দিবসের বাণিজ্যকরণের বিরুদ্ধে রীতিমতো আন্দোলনে নেমে পড়েন আনা জারভিস। নিজের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করে তিনি আইনি লড়াই পর্যন্ত চালিয়ে যান। ফুল ও কার্ড ব্যবসায়ীরা তাকে অর্থ সাহায্য দিতে চাইলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। বেদনাদায়ক বিষয় হলো— যে নারী দিনটি চালু করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই এই দিনটির সবচেয়ে বড় সমালোচকে পরিণত হন। জীবনের শেষভাগে তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন। অথচ তার তৈরি মা দিবস তখন বিশাল বাণিজ্যিক শিল্পে রূপ নিয়েছে। তবে আজ মা দিবসকে ঘিরে যতই ব্যবসা হোক, এর ভেতরে এখনও রয়ে গেছে এক গভীর মানবিক অনুভূতি। সন্তানের কাছে মা শুধু একটি সম্পর্ক নয়, আশ্রয়, ভালোবাসা আর নিরাপত্তার প্রতীক। হয়ত একটি ফুল, একটি কার্ড কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট— সবকিছুর বাইরেও মা দিবসের আসল অর্থ লুকিয়ে আছে সেই অনুভূতিতে, যেখানে একজন সন্তান নিঃশব্দে বলে—‘মা, তোমাকে ভালোবাসি।’

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow