মিয়ানমারের মাদকের ভয়াবহ প্রভাব বাংলাদেশে

মিয়ানমারভিত্তিক মাদক উৎপাদন ও পাচার ক্রমেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সামাজিক ও নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদক উৎপাদন অঞ্চলের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পৃক্ততা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সুযোগে মাদক কারবার ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী বাংলাদেশে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও নগরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায়। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতা মাদক পাচারকারীদের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করেছে। দুর্গম পাহাড়, নাফ নদী ও বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে ইয়াবা ও আইসের মতো সিনথেটিক মাদক নিয়মিত দেশে প্রবেশ করছে। কক্সবাজার ও টেকনাফ হয়ে এসব মাদক রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, যা ক্রমে একটি সুসংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে। মাদকের সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রভাব পড়ছে তরুণ সমাজে। শিক্ষার্থী ও কর্মক্ষম যুবসমাজের একটি অংশ মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ায় সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা—এসব সমস্যার সঙ্গে মাদকাসক্তির ঘনিষ্ঠ সম

মিয়ানমারের মাদকের ভয়াবহ প্রভাব বাংলাদেশে

মিয়ানমারভিত্তিক মাদক উৎপাদন ও পাচার ক্রমেই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সামাজিক ও নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদক উৎপাদন অঞ্চলের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পৃক্ততা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সুযোগে মাদক কারবার ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে প্রতিবেশী বাংলাদেশে, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও নগরকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থায়।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতা মাদক পাচারকারীদের জন্য বড় সুবিধা তৈরি করেছে। দুর্গম পাহাড়, নাফ নদী ও বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে ইয়াবা ও আইসের মতো সিনথেটিক মাদক নিয়মিত দেশে প্রবেশ করছে। কক্সবাজার ও টেকনাফ হয়ে এসব মাদক রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, যা ক্রমে একটি সুসংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্কে রূপ নিচ্ছে।

মাদকের সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রভাব পড়ছে তরুণ সমাজে। শিক্ষার্থী ও কর্মক্ষম যুবসমাজের একটি অংশ মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ায় সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়া, পারিবারিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা—এসব সমস্যার সঙ্গে মাদকাসক্তির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি জাতির ভবিষ্যৎ যখন বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, তখন তা শুধু সামাজিক নয়, রাষ্ট্রীয় সংকটেও পরিণত হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও মাদক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। মাদক পাচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে সশস্ত্র চক্র, বাড়ছে সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মাদক কারবারিদের সংঘর্ষের ঘটনাও নতুন নয়। মাদক অর্থনীতির অবৈধ অর্থ সমাজের অন্যান্য অপরাধকে উৎসাহিত করছে, যা সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, আইন প্রয়োগ ও বিচার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রকে উল্লেখযোগ্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ উৎপাদনশীলতা হারালে জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ ধরনের অপচয় দীর্ঘমেয়াদে বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে মিয়ানমারের মাদক সমস্যার একটি জটিল সংযোগও স্পষ্ট হচ্ছে। কিছু অপরাধচক্র রোহিঙ্গা সংকটকে কাজে লাগিয়ে মাদক পাচারের চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠে এসেছে। যদিও অধিকাংশ রোহিঙ্গা এসব অপরাধে জড়িত নয়, তবুও এই বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন তৈরি করেছে।

সরকার ইতোমধ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, মাদকবিরোধী অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও বাস্তবতা হলো, কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদক উৎপাদনের মূল উৎস মিয়ানমারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না এলে পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

এ কারণে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। মিয়ানমারের মাদক উৎপাদন ও পাচারের বিষয়টি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে এবং মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, মিয়ানমারের মাদকের ভয়াবহ প্রভাব বাংলাদেশে একটি গভীর সংকট তৈরি করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণ সমাজকে সুস্থ বিকল্প পথে সম্পৃক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ। নচেৎ এই সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow