মেটা মামলায় হারলে বদলে যাবে ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুক!

তরুণ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরির অভিযোগে একের পর এক মামলায় আইনি চাপে পড়েছে মেটা। তবে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) থেকে শুরু হতে যাওয়া একটি জুরি ট্রায়াল প্রতিষ্ঠানটির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। মামলায় হেরে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের ব্যবহার-পদ্ধতিতেই মৌলিক পরিবর্তন আনতে হতে পারে মেটাকে। ২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে এ মামলা করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, শিশু ও কিশোরদের গোপনীয়তা রক্ষায় ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের একাধিক আইন লঙ্ঘন করেছে মেটা। মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলো মেটার কাছ থেকে ‘১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ’ দাবি করছে। একই সঙ্গে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের বেশ কিছু মৌলিক ফিচার পরিবর্তনেরও দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘লাইক’ সংখ্যার প্রদর্শন বন্ধ করা এবং ব্যবহারকারীদের জন্য অনন্ত স্ক্রল বা ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ ব্যবস্থা বন্ধ করা। ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য আরও বেশ কিছু পরিবর্তন চেয়েছে মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলো। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ক

মেটা মামলায় হারলে বদলে যাবে ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুক!
তরুণ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন কনটেন্টের মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রভাব তৈরির অভিযোগে একের পর এক মামলায় আইনি চাপে পড়েছে মেটা। তবে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) থেকে শুরু হতে যাওয়া একটি জুরি ট্রায়াল প্রতিষ্ঠানটির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। মামলায় হেরে গেলে যুক্তরাষ্ট্রে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের ব্যবহার-পদ্ধতিতেই মৌলিক পরিবর্তন আনতে হতে পারে মেটাকে। ২০২৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে এ মামলা করে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, শিশু ও কিশোরদের গোপনীয়তা রক্ষায় ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের একাধিক আইন লঙ্ঘন করেছে মেটা। মামলায় অঙ্গরাজ্যগুলো মেটার কাছ থেকে ‘১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ’ দাবি করছে। একই সঙ্গে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের বেশ কিছু মৌলিক ফিচার পরিবর্তনেরও দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘লাইক’ সংখ্যার প্রদর্শন বন্ধ করা এবং ব্যবহারকারীদের জন্য অনন্ত স্ক্রল বা ‘ইনফিনিট স্ক্রল’ ব্যবস্থা বন্ধ করা। ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য আরও বেশ কিছু পরিবর্তন চেয়েছে মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলো। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য অভিভাবক যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করা; মেটার ‘ডোপামিন-নিয়ন্ত্রিত’ বা ব্যবহারকারীকে দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি সুপারিশ অ্যালগরিদমে পরিবর্তন আনা; ছবিতে ব্যক্তির চেহারা পরিবর্তন করে এমন অনেক ইমেজ ফিল্টার সরিয়ে দেওয়া; ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হওয়ার বা ‘অটোপ্লে’ ব্যবস্থা বন্ধ করা; একজন ব্যবহারকারীর একাধিক অ্যাকাউন্ট তৈরির সুযোগ নিষিদ্ধ করা ও ইনস্টাগ্রাম স্টোরিজের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায় বা নির্দিষ্ট সময় পর অদৃশ্য হয়ে যায় এমন ‘এফেমেরাল’ পোস্ট বন্ধ করা। ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের বর্তমান ব্যবহার-অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসব ফিচার। অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, এগুলোর অনেকগুলোই এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে শিশু-কিশোরসহ ব্যবহারকারীরা প্ল্যাটফর্মে যত বেশি সময় সম্ভব অবস্থান করেন এবং বারবার ফিরে আসেন। মামলায় আরও বলা হয়েছে, তরুণদের অ্যাপ থেকে দূরে থাকা কঠিন করে তুলতে ঘন ঘন নোটিফিকেশন পাঠানোর মতো বিভিন্ন ব্যবস্থাও ব্যবহার করে মেটা। অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, শিশুদের লক্ষ্য করে মেটা তাদের প্ল্যাটফর্মের প্রতি আসক্ত করে তুলতে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে শোষণ’ করেছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানো এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে মেটার মূল্য প্রায় ‘১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার’। সংশ্লিষ্ট এ মামলায় মেটা হেরে গেলে তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও মেটা বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, আমরা এসব অভিযোগের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে দ্বিমত পোষণ করি। তরুণদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে এবং প্রমাণে সেটিই উঠে আসবে বলে আমরা আত্মবিশ্বাসী। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলাটির শুনানি হবে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান ফেডারেল বিচারক ইভন গনজালেজ রজার্সের আদালতে। বহুল আলোচিত ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের মামলাটিও তার আদালতেই হয়েছিল। প্রায় ২০ বছর ধরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করা গনজালেজ রজার্স বেঞ্চে তার সরাসরি ও তীক্ষ্ণ অবস্থানের জন্য পরিচিত। এরই মধ্যে নিউ মেক্সিকোয় মেটার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলায় প্রতিষ্ঠানটিকে বেশ বড় বিপেদে ফেলতে পারে। সেখানে বিচারক ব্রায়ান বিডশেইড মেটাকে মোট ‘৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার’ জরিমানা করেছেন এবং প্ল্যাটফর্মে বেশ কিছু পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছেন। তার নির্দেশের মধ্যে রয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে ‘লাইক’ সংখ্যা প্রদর্শন বন্ধ করা, কিশোরদের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মে নগ্ন ছবি পাঠানো বা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা এবং দিনের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুশ নোটিফিকেশন সীমিত করা। বিচারক বিডশেইড মেটার প্ল্যাটফর্মগুলোকে একটি ‘জনদুর্ভোগ’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। তিনি বিষয়টিকে এমন একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করেন, যা বাতাসে দূষণ ছড়িয়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে এবং যার প্রভাব পড়ছে পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর। মেটা অবশ্য ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে। বিবিসি বলছে, নিউ মেক্সিকোর রায়ে শুধু ওই অঙ্গরাজ্যেই পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এবার ৩০টি অঙ্গরাজ্য তাদের পৃথক মামলায় জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্ল্যাটফর্মে পরিবর্তন আনতে হতে পারে মেটাকে। মামলায় থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোর মোট জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফলে রায় মেটার বিরুদ্ধে গেলে এর প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। মেটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে পরিচিত ফিচারগুলোর একটি হলো ‘লাইক’। ফেসবুকের শুরুর সময় থেকেই এই ফিচারটি রয়েছে। বর্তমানে প্রায় সব বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই কোনো না কোনো ধরনের এনগেজমেন্ট মেট্রিক ব্যবহার করা হয়। অনলাইনে দেখা লেখা, ছবি ও ভিডিওর সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা বোঝার অন্যতম প্রধান মাধ্যমও এটি। তবে বিশেষ করে তরুণদের ক্ষেত্রে ‘লাইক’ সংখ্যা নেতিবাচক অনুভূতি বাড়াতে পারে বলে ক্রমেই উদ্বেগ বাড়ছে। গত কয়েক বছরের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ‘লাইক’ সংখ্যার মতো এনগেজমেন্ট মেট্রিক কিশোরদের মধ্যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি ও বিষণ্নতা বাড়াতে পারে। ৩০ অঙ্গরাজ্যের করা মামলায় মেটা জানিয়েছে, তারা এরই মধ্যে ‘২০ লাখের বেশি নথি’ আদালতের কাছে দিয়েছে। মামলার আইনজীবীরা এসব নথির মধ্যে মেটার নিজস্ব গবেষণার কথাও তুলে ধরেছেন। মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণায় দেখা গেছে, লাইক সংখ্যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে ‘সামাজিক তুলনা’ বাড়াতে পারে। অর্থাৎ অন্যের ছবি বা জীবনযাপনের সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলনা করে নিজের মূল্য নির্ধারণের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ইনস্টাগ্রাম থেকে তৈরি এই সামাজিক তুলনার সঙ্গে ‘একাকিত্ব বৃদ্ধি, নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এবং খারাপ মেজাজ বা নেতিবাচক আবেগের’ সম্পর্ক রয়েছে। নিউ মেক্সিকোর মামলার রায়ে বিচারক বিডশেইডও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তার মতে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নিউ মেক্সিকোসহ বিভিন্ন জায়গায় বেড়ে চলা ‘তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের’ একটি অংশ হয়ে উঠেছে। এবার আরও ৩০টি অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা বিচারক ইভন গনজালেজ রজার্সের সামনে একই ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়ার দাবি জানাবেন। মামলায় মেটা হেরে গেলে শুধু বিপুল অঙ্কের জরিমানাই গুনতে হবে এমনটিই নয়, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের দীর্ঘদিনের বেশ কিছু ফিচার ও অ্যালগরিদমেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ও ধরনই আমূল বদলে যেতে পারে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow