ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারের আসর এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন রেকর্ডের জন্ম দিয়েছে। প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—যৌথভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ। একই সঙ্গে ৪৮ দলের অংশগ্রহণে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপও। হলুদ ও লাল কার্ডের সংখ্যার পাশাপাশি কোয়ার্টার ফাইনাল শুরুর আগে পর্যন্ত টুর্নামেন্টে বেড়েছে গোলের বন্যা।
তবে বিশ্বকাপ যত নকআউট পর্বের দিকে এগোচ্ছে, ততই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে ব্যক্তিগত রেকর্ডের লড়াই। শেষ ষোলো পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে অবস্থান করছেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল এবং জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে একটি করে গোল করেছেন তিনি। যদিও অস্ট্রিয়া ও মিশরের বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি মিস করায় তার গোলসংখ্যা আরও বাড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
মেসির সবচেয়ে কাছের প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও নরওয়ের আর্লিং হলান্ড। দুজনেরই গোল ৭টি। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেনের গোল ৬টি। চারজনই এখনো কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইয়ে টিকে আছেন।
তবে মেসির সামনে এখন আরও বড় এক চ্যালেঞ্জ। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইন মাত্র ছয় ম্যাচে করেছিলেন ১৩ গোল। প্রায় সাত দশক ধরে অক্ষত থাকা সেই রেকর্ড ভাঙতে মেসির প্রয়োজন আরও পাঁচ গোল। আর্জেন্টিনা যদি কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ওঠে, তাহলে তার সামনে থাকবে আরও তিনটি ম্যাচ। সেই তিন ম্যাচেই ইতিহাস নতুন করে লেখার সুযোগ থাকবে আর্জেন্টাইন মহাতারকার।
জাস্ট ফন্টেইনের সেই কীর্তি এখনো বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়। ১৯৫৮ সালে তিনি প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল, স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে একটি গোল, কোয়ার্টার ফাইনালে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি, সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে চার গোল করেছিলেন। মাত্র ছয় ম্যাচে ১৩ গোল করে তিনি গড়ে প্রতি ৪২ মিনিটে একটি করে গোল করেছিলেন, যা আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম দুর্লভ কীর্তি।
১৯৩৩ সালের ১৮ আগস্ট মরক্কোর মারাকেশে জন্ম নেওয়া ফন্টেইন ফ্রান্সের হয়ে মাত্র ২১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেই করেছিলেন ৩০ গোল। ক্লাব ফুটবলে নিস ও স্টাডে দ্য রেঁইমসের হয়ে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছিলেন তিনি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে চোটের কারণে অবসর নিতে বাধ্য হলেও ২০০৪ সালে পেলের নির্বাচিত ফিফা ১০০ তালিকায় জায়গা পান। ২০২৩ সালের ১ মার্চ ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই কিংবদন্তি।
অন্যদিকে বিশ্বকাপের সর্বকালের পরিসংখ্যানে নিজের আধিপত্য আরও শক্ত করেছেন মেসি। ছয়টি বিশ্বকাপে তিনি খেলেছেন ৩১টি ম্যাচ, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক।
শুধু গোল নয়, মিশরের বিপক্ষে গোল করে আরেকটি অনন্য রেকর্ডও গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা নয় ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়েছেন তিনি। ২০২২ বিশ্বকাপের অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করার ধারাবাহিকতা তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষেও ধরে রেখেছেন।
এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় এখনো সবার ওপরে জাস্ট ফন্টেইনের ১৩ গোল। এরপর রয়েছেন হাঙ্গেরির স্যান্ডর কোকসিস (১১), পশ্চিম জার্মানির গার্ড মুলার (১০), ব্রাজিলের আদেমির (৯) এবং পর্তুগালের ইউসেবিও (৯)। ৮ গোল করে পরের সারিতে রয়েছেন আর্জেন্টিনার গিয়ের্মো স্তাবিলে, ব্রাজিলের রোনালদো, ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে (২০২২) এবং এখন সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন মেসিও।
ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়ে দলীয় সাফল্যকেই সবসময় প্রাধান্য দেন বলে বহুবার জানিয়েছেন লিওনেল মেসি। কিন্তু মাঠের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিটি ম্যাচেই তিনি ইতিহাসকে নতুনভাবে লিখে চলেছেন। এখন দেখার বিষয়, কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে শুরু হওয়া বাকি পথ পেরিয়ে ১৯৫৮ সালের সেই অমর রেকর্ড স্পর্শ কিংবা ভাঙতে পারেন কি না আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তার সামনে সুযোগ রয়েছে, আর ফুটবলবিশ্ব অপেক্ষা করছে নতুন এক ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার।