যন্ত্র নয়, এক তরুণের সাহসের প্রতীক এটি

বিকেলের নরম আলো তখন গুলশানের রাস্তায় ধীরে ধীরে নেমে আসছে। চারপাশে শহুরে ব্যস্ততা, গাড়ির শব্দ, মানুষের তাড়াহুড়া সবকিছু যেন এক অদৃশ্য ছন্দে এগিয়ে চলেছে। সেই ভিড়ের মাঝেই এক তরুণ প্রথমবারের মতো হাতে ধরেছিল একটি স্টিয়ারিং। কয়েক মিনিটের জন্য হলেও, সে যেন নিজের এক অন্য জগতে পৌঁছে গিয়েছিল। ছোট্ট একটি গো-কার্ট, তবু তার গায়ে লেগে থাকা অনুভূতিটা ছিল বিশাল। এই তরুণের নাম রিজওয়ান রশিদ রিওন। এইচএসসি-২৫ ব্যাচের কমার্স বিভাগের একজন ছাত্র। সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নতুন পথ, নতুন স্বপ্ন, নতুন সংগ্রাম। কিন্তু তার জীবনের গল্পের এক বিশেষ অধ্যায় শুরু হয়েছিল সেই গুলশানের বিকেলেই; যখন সে প্রথম বুঝতে পেরেছিল, কোনো কিছু শুধু ব্যবহার করে আনন্দ পাওয়ার চেয়ে নিজের হাতে তৈরি করে পাওয়া আনন্দ অনেক বড়। মাত্র পাঁচ-ছয় মিনিটের জন্য চালানো সেই গো-কার্টের অভিজ্ঞতা তার মনে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, ‘এত টাকা খরচ করে অল্প সময়ের আনন্দ কেন? আমি কি নিজেই এমন কিছু বানাতে পারি না?’ সেই প্রশ্নই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল এক দৃঢ় সংকল্প। এই সংকল্পের বীজ অবশ্য আরও আগেই বোনা হয়েছিল। ছোটবেলায়, যখন তার বয়স তেরো কি চৌদ্দ, তখন থেকেই

যন্ত্র নয়, এক তরুণের সাহসের প্রতীক এটি

বিকেলের নরম আলো তখন গুলশানের রাস্তায় ধীরে ধীরে নেমে আসছে। চারপাশে শহুরে ব্যস্ততা, গাড়ির শব্দ, মানুষের তাড়াহুড়া সবকিছু যেন এক অদৃশ্য ছন্দে এগিয়ে চলেছে। সেই ভিড়ের মাঝেই এক তরুণ প্রথমবারের মতো হাতে ধরেছিল একটি স্টিয়ারিং। কয়েক মিনিটের জন্য হলেও, সে যেন নিজের এক অন্য জগতে পৌঁছে গিয়েছিল। ছোট্ট একটি গো-কার্ট, তবু তার গায়ে লেগে থাকা অনুভূতিটা ছিল বিশাল।

এই তরুণের নাম রিজওয়ান রশিদ রিওন। এইচএসসি-২৫ ব্যাচের কমার্স বিভাগের একজন ছাত্র। সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নতুন পথ, নতুন স্বপ্ন, নতুন সংগ্রাম। কিন্তু তার জীবনের গল্পের এক বিশেষ অধ্যায় শুরু হয়েছিল সেই গুলশানের বিকেলেই; যখন সে প্রথম বুঝতে পেরেছিল, কোনো কিছু শুধু ব্যবহার করে আনন্দ পাওয়ার চেয়ে নিজের হাতে তৈরি করে পাওয়া আনন্দ অনেক বড়।

যন্ত্র নয়, এটি এক তরুণের সাহসের প্রতীক

মাত্র পাঁচ-ছয় মিনিটের জন্য চালানো সেই গো-কার্টের অভিজ্ঞতা তার মনে এক গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল, ‘এত টাকা খরচ করে অল্প সময়ের আনন্দ কেন? আমি কি নিজেই এমন কিছু বানাতে পারি না?’ সেই প্রশ্নই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল এক দৃঢ় সংকল্প। এই সংকল্পের বীজ অবশ্য আরও আগেই বোনা হয়েছিল। ছোটবেলায়, যখন তার বয়স তেরো কি চৌদ্দ, তখন থেকেই সে ইউটিউবে বিভিন্ন যন্ত্র বানানোর ভিডিও দেখত। অন্যদের কাছে এগুলো হয়তো ছিল নিছক বিনোদন, কিন্তু রিজওয়ানের কাছে এগুলো ছিল অজানা সম্ভাবনার দরজা। তখন সে বুঝতে পারেনি, একদিন এই ভিডিওগুলোর কোনো একটা ধারণা তার নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

এইচএসসি পরীক্ষার সময়ই গো-কার্ট বানানোর চিন্তাটা প্রথম মাথায় আসে। কিন্তু বাস্তবতা তখন অন্য কথা বলছিল। পরীক্ষার চাপ, পড়াশোনার ব্যস্ততা সব মিলিয়ে সে চাইলেও কাজ শুরু করতে পারেনি। তবু তার মনের ভেতরে সেই স্বপ্নটা চুপচাপ বেঁচে ছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন সে নতুন এক শক্তি পেল। সে জানত, এখন আর থেমে থাকার সময় নেই।

রিজওয়ানের বাসার আশপাশে কিছু সুবিধা ছিল, যা তার কাজে সাহায্য করেছিল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সহজেই পাওয়া যেত, টাউন হল বা অন্যান্য জায়গা খুব কাছেই ছিল। তবে কোনো কাজের আসল চ্যালেঞ্জ থাকে পরিকল্পনায় আর সেখানেই শুরু হয়েছিল তার প্রকৃত পরীক্ষা।

গো-কার্ট বানাতে তার প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল। এই সময়টা শুধু যন্ত্রাংশ জোগাড় বা প্রযুক্তিগত সমস্যার জন্যই দীর্ঘ হয়নি; বরং সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অভিজ্ঞতার অভাব এবং পরিকল্পনার ঘাটতি। একদিন চাকা কিনে এনে বুঝেছে, স্টিয়ারিং তো এখনও আনা হয়নি। আবার স্টিয়ারিং আনার পর মনে হয়েছে, সিট বেল্ট ছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। এই ছোট ছোট ভুলগুলোই তাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, শিখিয়েছে বাস্তব জীবনের পাঠ। প্রতিটি সমস্যার পর নতুন করে শুরু করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে তার মধ্যে।

যন্ত্র নয়, এটি এক তরুণের সাহসের প্রতীক

গো-কার্টের নিরাপত্তা নিয়ে সে বিশেষভাবে চিন্তা করেছে। কারণ এই গাড়িটি রাস্তার খুব কাছাকাছি অবস্থানে থাকে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি। সিট বেল্ট লাগানোর সিদ্ধান্ত ছিল তার নিজের সচেতনতারই প্রমাণ। সে জানত, নিজের তৈরি জিনিসের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া খুব জরুরি।

ইঞ্জিন হিসেবে সে ব্যবহার করেছে জেনারেটরের ইঞ্জিন। সাধারণত জেনারেটর, স্পিডবোট বা পানির পাম্পে যে ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়, সেগুলোই এখানে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়। প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি খুব জটিল না হলেও, বাস্তবে সেটি কার্যকরভাবে বসানো ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্রেকিং সিস্টেমও সে সহজভাবে তৈরি করেছে। টাই রডের মাধ্যমে সামনের চাকার সঙ্গে সংযোগ রেখে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করেছে। এতে করে গাড়িটি চালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ রাখা সহজ হয়েছে। এই পুরো প্রকল্পে তার খরচ হয়েছে এক লাখ টাকারও বেশি। একজন শিক্ষার্থীর জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি বিনিয়োগ। তবে রিদওয়ানের কাছে এটি ছিল ব্যয় নয়; বরং ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিনিয়োগ।

আরও পড়ুন: 

 

এই যাত্রা সে কারোর কাছ থেকেই তেমন কোনো সহায়তা পায়নি। পরিবারের সদস্য, শিক্ষক কিংবা বন্ধুদের কাছ থেকেও বিশেষ সমর্থন মেলেনি। বরং একজন ব্যক্তি নেতিবাচকভাবে তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু কখনো কখনো নেতিবাচক কথাও ইতিবাচক শক্তি হয়ে ওঠে। সেই কথাগুলোই যেন তাকে প্রমাণ করার এক অদৃশ্য প্রেরণা দিয়েছে। সে বুঝেছে, অন্যের সন্দেহের জবাব সবচেয়ে ভালোভাবে দেওয়া যায় নিজের কাজের মাধ্যমে।

গো-কার্টটি তৈরি হওয়ার পর প্রথমবার সেটি চালানোর অনুভূতি ছিল তার জীবনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। সেই মুহূর্তে সে যেন নিজের ভেতরের সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে ফেলেছিল। এই অভিজ্ঞতা তাকে শুধু একটি যন্ত্র বানানোর আনন্দ দেয়নি, বরং শিখিয়েছে জীবনের গভীর কিছু সত্য। যেমন- স্বপ্ন বড় না ছোট, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস।

আজ যখন সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তার মনে নতুন নতুন পরিকল্পনা জন্ম নিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় কিছু তৈরি করার ইচ্ছা তার মধ্যে জেগে উঠেছে। রিদওয়ানের গল্প আসলে একটি প্রজন্মের গল্প, যারা সীমাবদ্ধতার মাঝেও স্বপ্ন দেখতে জানে, যারা ব্যর্থতাকে ভয় না পেয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চায়।

যন্ত্র নয়, এটি এক তরুণের সাহসের প্রতীক

এই শহরের হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও কোথাও না কোথাও এমন তরুণরা নিজেদের মতো করে নতুন কিছু তৈরি করে যাচ্ছে। হয়তো তাদের গল্প সবসময় শিরোনামে আসে না, কিন্তু তাদের স্বপ্নের চাকা ঘুরতেই থাকে। গো-কার্টটি হয়তো একটি ছোট প্রকল্প, কিন্তু এর পেছনে থাকা দৃঢ়তা, অধ্যবসায় এবং স্বপ্ন এসবই তাকে আলাদা করে তোলে।

একদিন হয়তো এই তরুণ আরও বড় কোনো উদ্ভাবনের মাধ্যমে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। কিন্তু তার সেই যাত্রার সূচনা হয়েছিল একটি সাধারণ বিকেলে, একটি ছোট্ট স্টিয়ারিং ধরে। স্বপ্ন কখনো হঠাৎ করে বড় হয়ে ওঠে না; ধীরে ধীরে, একেকটি ছোট পদক্ষেপে, একেকটি সাহসী সিদ্ধান্তে সেটি গড়ে ওঠে। রিদওয়ানের গল্প সেই ধৈর্যের, সেই সাহসের, সেই বিশ্বাসের গল্প।

এই গল্প শুধু একটি গো-কার্ট তৈরির নয়; এটি এক তরুণের নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে আবিষ্কারের গল্প। আর তাই, যখন কোনো তরুণ নিজের স্বপ্নের পথে হাঁটতে শুরু করে, তখন তার প্রতিটি পদক্ষেপই হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার নতুন ভাষা। রিজওয়ানের জীবন হয়তো এখনও শুরু মাত্র, কিন্তু তার গল্প ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে স্বপ্ন দেখতে জানলে আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস থাকলে, অসম্ভব বলে কিছু থাকে না।

জেএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow