যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে ধুঁকছে বিশ্ব অর্থনীতি
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে হামলায় যোগ দেয়। অপারেশন মিডনাইট হ্যামার নামে একটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা করে। ২১–২২ জুন রাতে পরিচালিত এই অভিযানে নাতাঞ্জ, ফোর্দো এবং ইসফাহান—এই তিনটি মূল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলার পরপরই ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে তার এই দাবির পক্ষে জোড়ালো কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। এর আগে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড কংগ্রেসকে জানান, ইরান কোনো ধরনের পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না। এরপর ট্রাম্পের তার এই দাবিকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেন। এক পর্যায়ে গ্যাবার্ডও ট্রাম্পের ভাষায় কথা বলতে থাকেন। এরপর ট্রাম্প বারবার দাবি করেছিলেন, ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন, শুধু স্থাপনাই নয়, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ধ্বংস হয়ে গেছে। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। অনেকেই মনে করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ব
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে হামলায় যোগ দেয়। অপারেশন মিডনাইট হ্যামার নামে একটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা করে। ২১–২২ জুন রাতে পরিচালিত এই অভিযানে নাতাঞ্জ, ফোর্দো এবং ইসফাহান—এই তিনটি মূল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
হামলার পরপরই ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তবে তার এই দাবির পক্ষে জোড়ালো কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
এর আগে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড কংগ্রেসকে জানান, ইরান কোনো ধরনের পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না। এরপর ট্রাম্পের তার এই দাবিকে ভুল বলে আখ্যায়িত করেন। এক পর্যায়ে গ্যাবার্ডও ট্রাম্পের ভাষায় কথা বলতে থাকেন।
এরপর ট্রাম্প বারবার দাবি করেছিলেন, ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন, শুধু স্থাপনাই নয়, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ধ্বংস হয়ে গেছে।
এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবার ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
অনেকেই মনে করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছেন। তিনি ট্রাম্পকে দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন। কারণ এর আগে অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে দিয়ে তিনি এই যুদ্ধ শুরু করতে চেয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে একটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে হামলা ও পাল্টা হামলা কমালেও উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনও একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ অব্যাহত রেখেছে।
তবে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হলেও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে। বিশেষ করে বিশ্বের অনেক দেশই জ্বালানি সংকটে পড়েছে। কমছে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। কারণ যুদ্ধ শুরুর পরই বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। যা যুদ্ধবিরতির পরও বহাল রয়েছে।
তাছাড়া অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি এ অবরোধের ফলে দিনে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে ইরানের। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেশ কয়েকটা জাহাজ জব্ধ করেছে। আবার একইভাবে ইরান হরমুজ প্রণালি থেকে জাহাজ আটক করে নিয়ে গেছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির ফুসফুসখ্যাত এই প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে।
জানা গেছে, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে হরমুজ প্রণালি। সাধারণ সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইউএস এনার্জি ইনফরমেশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে, যার বার্ষিক বাণিজ্য মূল্য প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার। এই তেল শুধু ইরান থেকেই নয়, বরং ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও আমিরাত থেকেও আসে।
এছাড়া, বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়, যার বেশিরভাগই কাতার থেকে রপ্তানি হয়।
শুধু জ্বালানি নয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানিকৃত সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশও এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে খাদ্য, ওষুধ ও প্রযুক্তিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
ফলে বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি অনেক দিন ধরে বন্ধ থাকার কারণে বিশ্ববাজারে এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যহারে বেড়ে গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যা যুদ্ধ বিরতির পর কমে ৯০ ডলারের আশপাশে ঘুরপাক খেলেও এখন আবার তা বেড়ে ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ছিল ৭০ ডলারের নিচে।
বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, যার সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাসক্ষেত্র ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে।
মাত্র আট সপ্তাহের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সংকটের কারণে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং ভোগব্যয় কমে যাচ্ছে, যা একটি নেতিবাচক অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করছে।
জ্বালানি দামের প্রভাবে বিমান চলাচল খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। জার্মানির লুফথানসা এই গ্রীষ্মে ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করেছে। একইভাবে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি এয়ারলাইনস আংশিকভাবে ফ্লাইট কমিয়েছে, ফলে পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে দরিদ্র দেশগুলোর ওপর, যেখানে উচ্চ জ্বালানি ব্যয় বহন করা কঠিন। আইএমএফ এরই মধ্যে সতর্ক করেছে যে আফ্রিকায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে ইউএনডিপি জানিয়েছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে লাখো মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে।
জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। এরই মধ্যে ভারত ও জাপানের বিভিন্ন শিল্প উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হিলিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও ন্যাফথার মতো পণ্যের ঘাটতিও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শিল্পে প্রভাব ফেলছে—যার মধ্যে মাইক্রোচিপ থেকে শুরু করে ভোক্তা পণ্যও রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ ব্যাঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেয় বিশ্বের প্রায় সব দেশ। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও এই যুদ্ধকে সমর্থন করছে না। এমনকি ট্রাম্পের সাহায্যের আবেদনেও সাড়া দেয়নি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো।
চীন শুরু থেকেই এই সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সব পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সংঘাতটিকে অন্যায্য যুদ্ধ বলে উল্লেখ করে সতর্ক করেন যে বিশ্ব যেন জঙ্গলের আইন বা শক্তির আধিপত্যে না ফিরে যায়।
বেইজিং আরও জোর দিয়ে বলেছে, ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করতে হবে এবং সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে হবে। রাশিয়াও প্রায় একই ভাষায় ইরানে হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে এবং তেহারের প্রতি বারবার সমর্থন ব্যক্ত করছে।
যুদ্ধবিরোধী শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে ইউরোপের দেশ স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ও আকাশসীমা পর্যন্ত ব্যবহার করতে দেয়নি। যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
আইএমএফ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।
বলা হয়েছে, চলতি বছরে বৈশ্বিক অর্থনীতি ৩.১ শতাংশ হারে বাড়বে বলে তারা আশা করছে। এর আগে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে আইএমএফ ৩.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল।
নতুন পূর্বাভাসটি গত বছরের তুলনায়ও কম, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ৩.৪ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হয়েছিল। আইএমএফ জানিয়েছে, বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশ ভেদে এই প্রভাব ভিন্ন হবে এবং কিছু দেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সৌদি আরবের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.১ শতাংশ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের জন্য ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২.৮ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ১.১ শতাংশে নামানো হয়েছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার জন্য পূর্বাভাস ২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ১.৯ শতাংশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ইউরোজোনে প্রবৃদ্ধি চলতি বছরে ১.১ শতাংশে নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৫ সালের ১.৪ শতাংশ এবং জানুয়ারির পূর্বাভাস ১.৩ শতাংশের চেয়েও কম।
আইএমএফ আরও জানিয়েছে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছে। নতুন করে মূল্যস্ফীতির হার ৪.৪ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা জানুয়ারির তুলনায় ০.৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
সূত্র: এমএসএম
What's Your Reaction?