দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গঠিত কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ মহাদেশীয় প্রতিরক্ষা বোর্ডে আর অংশ নেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কানাডা প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে; এমন অভিযোগ তুলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।
সোমবার (১৮ মে) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কলবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ‘পার্মানেন্ট জয়েন্ট বোর্ড অন ডিফেন্স’ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত নিজেদের সম্পৃক্ততা স্থগিত রাখবে। একই সঙ্গে বোর্ডটির কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গঠিত এই বোর্ডটি উত্তর আমেরিকার আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে আসছিল। তবে ২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমেই টানাপোড়েনের দিকে গেছে।
কলবি তার পোস্টে লেখেন, শক্তিশালী ও বাস্তব সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন কানাডা আমাদের সবার জন্যই উপকারী। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কানাডা তাদের প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বক্তৃতা আর বাস্তবতার ব্যবধান আর এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যৌথ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বাস্তবভাবে ভাগাভাগি করতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা মিত্রদের সমালোচনা করে আসছে। তাদের অভিযোগ, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মিত্র দেশগুলো অতিরিক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে, নিজেদের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত বছর ন্যাটো সম্মেলনে প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্র জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের বিষয়ে একমত হয়। শুধু স্পেন এ সিদ্ধান্ত থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকারও প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। কানাডা জানিয়েছে, মোট ব্যয়ের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ‘মূল সামরিক সক্ষমতা’ জোরদারে ব্যয় হবে। বাকি অর্থ বন্দর উন্নয়ন, জরুরি প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে খরচ করা হবে।
২০২৫ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমানোর পক্ষে সরব অবস্থান নিয়েছেন। চলতি বছর এক বক্তব্যে তিনি বলেন, মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে বর্তমান বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার যুগ মোকাবিলা করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার বিরুদ্ধে অন্যায্য বাণিজ্যনীতি অনুসরণ এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ মানুষ ও মাদক পাচার ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও তুলেছে। যদিও সমালোচকরা এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
কানাডাকে নীতিগতভাবে চাপে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্তপারের আমদানির ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করেছে। এমনকি ট্রাম্প অতীতে মন্তব্য করেছিলেন, কানাডা যদি যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়, তাহলে এসব শুল্ক এড়ানো সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডন ব্যাকন সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোট বজায় রাখতে আরও পরিণত ও বিচক্ষণ নেতৃত্ব প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ‘কানাডা হবে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য’ কিংবা ‘তাদের প্রধানমন্ত্রী হবেন ৫১তম গভর্নর’ এ ধরনের মন্তব্য থেকেই বর্তমান পরিস্থিতির শুরু। এসব অপমানজনক বক্তব্য আমাদের কোনো লাভ দেয়নি, বরং অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।”
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো চলতি বছরের শেষ দিকে আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ইউএসএমসিএ’র হালনাগাদ সংস্করণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে।