যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ: বাংলাদেশি গবেষকের হৃদয়বিদারক ঘটনা

যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের এক শান্ত বিকেলে মেফেয়ারের নিরিবিলি পথ পেরিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে এসে দাঁড়ালাম ওয়াবাশ নদীর তীরে। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে নদীর জলে মিশে যাচ্ছিল, যেন অস্তগামী সূর্য তার শেষ সোনালি স্পর্শ দিয়ে প্রকৃতির বুকে এক বিষণ্ন অথচ মোহনীয় আবেশ এঁকে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লাফায়েত ও ওয়েস্ট লাফায়েত শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা ওয়াবাশ নদী দূর থেকে শান্ত মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি নদী নয়; এটি যেন সময়ের দীর্ঘ ইতিহাস বহন করা এক প্রবহমান স্রোতধারা। কোথাও খরস্রোতা, কোথাও পাথরে আঘাত লেগে জলের গর্জন, আবার কোথাও গভীর স্থিরতা। নদীর বুক চিরে ভেসে আসে ঠান্ডা বাতাস, যার ভেতর মিশে থাকে অদ্ভুত বিষণ্নতা। ওয়াবাশের পশ্চিম তীরেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পারডু ইউনিভার্সিটি, যা বিশ্বখ্যাত জ্ঞান ও গবেষণার এক মহীরুহ হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর নানা দেশের প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর এ ক্যাম্পাস। বাংলাদেশ থেকেও দুই শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী এখানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত। কেউ কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছেন, কেউ প্রকৌশল, কেউবা

যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ: বাংলাদেশি গবেষকের হৃদয়বিদারক ঘটনা

যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের এক শান্ত বিকেলে মেফেয়ারের নিরিবিলি পথ পেরিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে এসে দাঁড়ালাম ওয়াবাশ নদীর তীরে। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে কোমল হয়ে নদীর জলে মিশে যাচ্ছিল, যেন অস্তগামী সূর্য তার শেষ সোনালি স্পর্শ দিয়ে প্রকৃতির বুকে এক বিষণ্ন অথচ মোহনীয় আবেশ এঁকে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লাফায়েত ও ওয়েস্ট লাফায়েত শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা ওয়াবাশ নদী দূর থেকে শান্ত মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি নদী নয়; এটি যেন সময়ের দীর্ঘ ইতিহাস বহন করা এক প্রবহমান স্রোতধারা। কোথাও খরস্রোতা, কোথাও পাথরে আঘাত লেগে জলের গর্জন, আবার কোথাও গভীর স্থিরতা। নদীর বুক চিরে ভেসে আসে ঠান্ডা বাতাস, যার ভেতর মিশে থাকে অদ্ভুত বিষণ্নতা।

ওয়াবাশের পশ্চিম তীরেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পারডু ইউনিভার্সিটি, যা বিশ্বখ্যাত জ্ঞান ও গবেষণার এক মহীরুহ হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীর নানা দেশের প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর এ ক্যাম্পাস। বাংলাদেশ থেকেও দুই শতাধিক মেধাবী শিক্ষার্থী এখানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত। কেউ কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করছেন, কেউ প্রকৌশল, কেউবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল গবেষণায় ডুবে আছেন। এ ক্যাম্পাসের প্রতিটি ভবন যেন স্বপ্নের আরেকটি অধ্যায়। কিন্তু সেই স্বপ্নের শহরেই কয়েক বছর আগে ঘটে গিয়েছিল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। ২০২৩ সালের জুন মাসের শেষের দিকের এক শীতল সন্ধ্যা। আকাশে কুয়াশার ধূসরতা, নদীর জলে জমাট অন্ধকার। সেদিন ওয়াবাশ নদী নিজের বুকে ধারণ করেছিল বাংলাদেশের অসাধারণ মেধাবী সন্তানের শেষ আর্তনাদ।

তিনি ছিলেন পুরান ঢাকার হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। শৈশবে কাটিয়েছেন পুরান ঢাকার স্কুলজীবন, কৈশোরে কলেজের দিনগুলোতে গড়ে তুলেছেন সাফল্যের নানা স্বাক্ষর, আর বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা অধ্যবসায়ী সময় পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে। পরে অসাধারণ মেধা ও পরিশ্রমে শিক্ষকতায় যুক্ত হন। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ছাত্রদের কাছে ছিলেন প্রিয়, সহকর্মীদের কাছে ছিলেন সম্ভাবনাময় তরুণ বুদ্ধিজীবী। এরপর ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি গবেষণার জন্য পাড়ি জমান আমেরিকায়, পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে।

pardu

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল উপস্থিতি। সুদর্শন, মার্জিত, বন্ধুবৎসল এবং সংস্কৃতিমনা। ব্যস্ত গবেষণার মাঝেও গান, বাঁশি, গিটার আর বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে ডুবে থাকতেন। কেউ বলতেন, তিনি কথা বলতেন কবিতার মতো; কেউ বলতেন, তার হাসির আড়ালেও লুকিয়ে থাকতো গভীর বিষণ্নতা। পারডুতে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তার সম্পর্কে নানা স্মৃতি ও গল্প শুনেছি। কেউ তার প্রাণবন্ত আড্ডার কথা বলেছেন, কেউ স্মরণ করেছেন তার সংগীতপ্রেম আর আন্তরিক ব্যবহারের কথা। আবার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কণ্ঠে ধরা পড়েছিল অদৃশ্য মানসিক ক্লান্তির ইঙ্গিত, যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায়নি। এখনো পারডুতে অধ্যয়নরত অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থাপিত ‘অসমাপ্ত পি’ স্মৃতিচিহ্নের সামনে ফুল দিয়ে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। যেন অসমাপ্ত স্বপ্ন আর অপূর্ণ জীবনের বেদনা আজও সেই ক্যাম্পাসের বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

বিদায়ের আগের সেই রাতেও তিনি যেন শিল্পীর মতো নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলোর সঙ্গে গভীর আত্মিক কথোপকথনে নিমগ্ন ছিলেন। টেবিলের ওপর সাজানো ছিল বাঁশি, গিটার এবং তার প্রিয় বাদ্যযন্ত্রগুলো। আর সেই টেবিলেই ছিল কয়েকটি চিঠি। মায়ের জন্য লেখা দীর্ঘ নোট, বড় বোনের জন্য আরেকটি, বাবার উদ্দেশে কিছু কথা, ছোট ভাইয়ের জন্যও শেষ বার্তা। পরে পুলিশ সেগুলো উদ্ধার করে। সেখানে কোনো আক্ষেপ, রাগ কিংবা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল না। সবকিছুর জন্য তিনি নিজেই যেন স্থির মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবু চিঠির পাতার ভাঁজে রয়ে গিয়েছিল গভীর শূন্যতা আর অপূর্ণতার মলিন আবেশ, যেন কোনো প্রিয় ভালোবাসা হারানোর নির্মম সত্য সেখানে অগোচরে লুকিয়ে ছিল।

পরদিন বিকেলে ওয়াবাশ নদীর তীরে তাকে শেষবার দেখা যায়। পুলিশের পর্যবেক্ষণ সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে নদীর দিকে তার ধীর পদচারণা। তারপর এক মুহূর্ত। জলের দিকে ঝাঁপ। কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য, অথচ তার অভিঘাত বহন করছে অসংখ্য মানুষ আজও। সেদিন নদী ছিল অদ্ভুত খরস্রোতা। উত্তাল জলের সেই প্রবল স্রোতের ভেতর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল একটি দেশের স্বপ্ন, একটি পরিবারের গর্ব, অসংখ্য শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক এবং এক সংবেদনশীল শিল্পীমনের মানুষ।

ওয়াবাশ নদীর পাথুরে তীর আজও যেন সেই ঘটনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলের শেষ আলো পড়লে নদীর জলে এক ধরনের ধূসর বিষণ্নতা দেখা যায়। মনে হয়, প্রকৃতি নিজেও যেন তাকে রক্ষা করতে পারেনি বলে অপরাধবোধে স্তব্ধ হয়ে আছে। বাতাসে ভেসে আসে অদৃশ্য বাঁশির সুর, দূরের কোনো জানালায় জ্বলে ওঠা আলো বারবার মনে করিয়ে দেয়, এই শহরে একদিন একজন বাংলাদেশি তরুণ তার সমস্ত মেধা, স্বপ্ন ও শিল্পীসত্তা নিয়ে বেঁচে ছিলেন। তার পদচারণা, তার সুর আর তার স্মৃতি যেন আজও এই নদীর বাতাসে মিশে আছে।

pardu

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। তখনকার অনেক বাংলাদেশি গবেষক ইতোমধ্যে পিএইচডি শেষ করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন, কেউ দেশে ফিরে শিক্ষকতা করছেন, কেউ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে নতুন জীবন গড়েছেন। পারডুর আড্ডাগুলোও বদলে গেছে। নতুন মুখ এসেছে, পুরোনোরা হারিয়ে গেছে ব্যস্ততার স্রোতে। কিন্তু সেই ঘটনার স্মৃতি এখনো বাংলাদেশি কমিউনিটির ভেতর বেঁচে আছে। কারণ একজন মেধাবীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি একটি দেশের ক্ষতি। একটি জাতি তার সম্ভাবনার অংশ হারায়। গবেষণাগারের একটি চেয়ার খালি হয়, ছাত্রদের সামনে অনুপ্রেরণার একটি মুখ হারিয়ে যায়, আর কোনো এক মধ্যবিত্ত মা সারাজীবন অপেক্ষা করেন এমন এক সন্তানের জন্য, যে আর কখনো দরজায় কড়া নাড়বে না।

সেদিন সন্ধ্যায় ওয়াবাশ নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল, এই নদী শুধু দুই শহরকে বিভক্ত করেনি, জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানেও যেন এক অদৃশ্য সীমারেখা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আলোকোজ্জ্বল বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন, অন্যদিকে একাকিত্ব, মানসিক অবসাদ আর ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ার যন্ত্রণা। নদীর কালচে জলে সূর্যের শেষ আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল। দূরে পারডু ইউনিভার্সিটির উঁচু ভবনগুলো তখনো উজ্জ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অথচ সেই আলোয় যেন ভেসে উঠছিল হারিয়ে যাওয়া এক বাংলাদেশি গবেষকের অবয়ব, যিনি হয়তো পৃথিবীকে অনেক কিছু দিতে পারতেন, যদি আরেকটু সময়, আরেকটু সঙ্গ আর সামান্য মানসিক আশ্রয় পেতেন। ওয়াবাশ নদী এখনো বয়ে চলেছে, তার স্রোতও থেমে নেই। কিন্তু নদীর বাতাসে আজও যেন চাপা কান্নার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। বাংলাদেশ হারিয়েছে তার এক মূল্যবান সম্পদকে, আর পারডুও হারিয়েছে তার এক মেধাবী ও শিল্পীমনস্ক গবেষককে।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow