যুদ্ধের কারণে বন্ধ সার-গ্যাস সরবরাহ, খাদ্য সংকটের ঝুঁকি
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পরপরই সার ও নাইট্রোজেনের সংকটের খবর সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় নিয়মিত হয়ে ওঠে। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশ এবং নাইট্রোজেন সার সরবরাহ ৩০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পায়। বিশ্বজুড়ে রপ্তানি হওয়া সালফারের অর্ধেকের বেশির চালান গাল্ফ অঞ্চলে আটকে যায়। শত শত জাহাজ এই অঞ্চলে নোঙর করে নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়। যুদ্ধরত পক্ষগুলো থেকে হামলার আশঙ্কায় এ নৌযানগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সার কারখানাগুলো অলস বসে থাকে। বিভিন্ন কারখানা ও সেগুলোর সরঞ্জাম ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। এখন স্থায়ীভাবে হরমুজ খুলে দিলেও প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা সারের উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব সময়ে ফিরে যেতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর রয়টার্সের। শস্য উৎপাদনে সারের ঘাটতি দুর্ভিক্ষের কারণ হতে পারে-আঠার শতকের শেষদিকে বিজ্ঞানীদের দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ ছিল এটি। তবে, এ দুশ্চিন্তা দ্রুতই দূর হয়, ১৯০৯ থেকে ১৯১৩ সালের মধ
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পরপরই সার ও নাইট্রোজেনের সংকটের খবর সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় নিয়মিত হয়ে ওঠে। যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ ১৭ শতাংশ এবং নাইট্রোজেন সার সরবরাহ ৩০ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পায়। বিশ্বজুড়ে রপ্তানি হওয়া সালফারের অর্ধেকের বেশির চালান গাল্ফ অঞ্চলে আটকে যায়।
শত শত জাহাজ এই অঞ্চলে নোঙর করে নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য হয়। যুদ্ধরত পক্ষগুলো থেকে হামলার আশঙ্কায় এ নৌযানগুলো হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সার কারখানাগুলো অলস বসে থাকে। বিভিন্ন কারখানা ও সেগুলোর সরঞ্জাম ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
এখন স্থায়ীভাবে হরমুজ খুলে দিলেও প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা সারের উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব সময়ে ফিরে যেতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর রয়টার্সের।
শস্য উৎপাদনে সারের ঘাটতি দুর্ভিক্ষের কারণ হতে পারে-আঠার শতকের শেষদিকে বিজ্ঞানীদের দুশ্চিন্তার প্রধান কারণ ছিল এটি। তবে, এ দুশ্চিন্তা দ্রুতই দূর হয়, ১৯০৯ থেকে ১৯১৩ সালের মধ্যে দুইজন জার্মান বিজ্ঞানী যুগান্তকারী হার্বার-বশ প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন। সহজ হয়ে যায় অ্যামোনিয়া সার উৎপাদন। গমসহ অন্যান্য শস্য উৎপাদনে অপরিহার্য হয়ে ওঠে এটি, অ্যামোনিয়া ব্যবহারে ফসলের উৎপাদনও বাড়ে ব্যাপক হারে।
এরপর ১৯৬০ এবং ৭০ এর দশক মিলিয়ে বীজ অঙ্কুরায়ন, কীটনাশকের উন্নয়ন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও সারের উন্নয়নের ফলে সবুজ বিপ্লব সংঘটিত হয়। এ বিপ্লবের ফলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন ভারতীয় এবং মেক্সিকান। আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্ব খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৬০-এ প্রতি হেক্টর জমিতে যেখানে ১৩৩৬ কেজি শস্য উৎপাদিত হতো, ২০২৩ সালে এ উৎপাদন সেখানে প্রতি হেক্টরে তিনগুণ বেড়ে ৪৪৯০ কেজিতে পৌঁছায়। তবে, এ সময়ের মধ্যে মোট চাষযোগ্য জমি বাড়ে কেবল ১৪ শতাংশ।
ভারত, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় ফসল রোপণের মৌসুমে বিশ্বজুড়ে সারের দাম অত্যাধিক বেড়ে যায়। পরবর্তীতে দাম কমলেও উৎপাদক এবং ভোক্তা ক্ষেত্রে ততদিনে যে ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন সার সরবরাহ না হওয়ার কারণে এবার বিশ্বজুড়ে শস্য উৎপাদন কমবে, অর্থাৎ যেসব জায়গায় চাহিদাটা বেশি সেখানেও খাদ্য উৎপাদনে টান পড়তে পারে।
বিশাল সংখ্যক কৃষক ও শহুরে ভোক্তাদের স্বার্থে ভারত চড়া দামে বিপুল পরিমাণে ইউরিয়া নাইট্রোজেন সার কেনে। সেই সার এখন বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার কৃষকরা তাদের গমের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, বর্তমান দামে চাষ করা তাদের কাছে অযৌক্তিক মনে হচ্ছে, যা সারের খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট না।
খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটাই খেয়েছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ড। কারণ, গাল্ফ অঞ্চলের দেশগুলো থেকে এই দেশগুলোর আমদানি পণ্যের সবচেয়ে বড় অংশই ছিল সার।
আফ্রিকার কিছু অংশে তো কৃষকরা সারের দেখাই পাননি! ব্রাজিলের কৃষকরা তো পড়েছিলেন উভয়সংকটে- হয় দামি সারের কারণে তাদের পরিবারের খরচ কমাতে হবে, নাহয় কম সার ব্যবহার করে উৎপাদন কম করবে। শেষ পর্যন্ত তাদের আর্থিক সক্ষমতার ওপরই সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসবে। যুদ্ধ যদি চলতেই থাকে কিংবা অন্য কোনো কারণে যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী দিনশেষে হবেন খেটে খাওয়া কৃষকরাই।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার সূচকে দেখা যায় ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্যের প্রভাবে খাদ্যের দামও অস্বাভাবিক বেড়েছে।
গ্রীষ্মের অতিরিক্ত গরমও খাদ্যপণ্য উৎপাদন হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। চলতি বছরের মতো অতীতেও ভারতে এল নিনোর প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এল নিনোর কারণে অতীতে খরাও হয়েছে, এতে করে বিভিন্ন দেশের সরকার কিছু মৌলিক খাদ্যপণ্যের রপ্তানি কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
এএমএ
What's Your Reaction?
