যুদ্ধের জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত : পাকিস্তান

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও যুদ্ধের জন্য পাকিস্তান প্রস্তুত রয়েছে। বৃহস্পতিবার (০৭ মে) ইসলামাবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা কথাও তুলে ধরেছেন। মারকা-ই-হক-এর এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় দেশটির নৌবাহিনীর উপপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শিফাত আলী এবং বিমানবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল তারিক গাজীও উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ২২ এপ্রিল পহেলগামে হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়। পরে পাকিস্তানের অপারেশন বুনইয়ানুম মারসুস এবং ১০ মে যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে। পাকিস্তান এই সংঘাতকে মারকা-ই-হক বা সত্যের যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করে। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই সেনা মুখপাত্র দেশবাসীকে মারকা-ই-হক-এর এক বছর পূর্তির শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেছে এবং বহুমাত্রিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বড় শত্রুকে পরাজিত করেছে। তিনি বলেন, আজ আমরা শুধু কী ঘটেছিল, তা নিয়ে

যুদ্ধের জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত : পাকিস্তান

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ও যুদ্ধের জন্য পাকিস্তান প্রস্তুত রয়েছে। বৃহস্পতিবার (০৭ মে) ইসলামাবাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সক্ষমতা কথাও তুলে ধরেছেন।

মারকা-ই-হক-এর এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় দেশটির নৌবাহিনীর উপপ্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল শিফাত আলী এবং বিমানবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল তারিক গাজীও উপস্থিত ছিলেন।

গত বছরের ২২ এপ্রিল পহেলগামে হামলার পর ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়। পরে পাকিস্তানের অপারেশন বুনইয়ানুম মারসুস এবং ১০ মে যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে। পাকিস্তান এই সংঘাতকে মারকা-ই-হক বা সত্যের যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করে।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই সেনা মুখপাত্র দেশবাসীকে মারকা-ই-হক-এর এক বছর পূর্তির শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করেছে এবং বহুমাত্রিক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বড় শত্রুকে পরাজিত করেছে।

তিনি বলেন, আজ আমরা শুধু কী ঘটেছিল, তা নিয়ে কথা বলব না। বরং ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময় নিয়ে আলোচনা করব। একই সঙ্গে সংঘাতের ১০টি কৌশলগত পরিণতি ব্যাখ্যা করার কথাও জানান তিনি।

আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, এই সংঘাতের প্রথম কৌশলগত ফলাফল হলো পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে তুলে ধরার ভারতের বর্ণনা ভেঙে পড়েছে।

তার ভাষায়, প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে ভারতে সন্ত্রাসবাদের জন্য দায়ী করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পহেলগাম ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও পাকিস্তানের করা প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রমাণ কোথায়? এখন আর কেউ এসব বিশ্বাস করে না। আপনারাই সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী। কেউ তাদের কথা শোনে না, বিশ্বাসও করে না।

দ্বিতীয় কৌশলগত ফলাফল হিসেবে তিনি বলেন, পাকিস্তান এখন অঞ্চলের নিরাপত্তা স্থিতিশীলতার প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার দাবি, এই সংঘাতে কে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং কে উত্তেজনা বাড়িয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে। অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার দূত হচ্ছে পাকিস্তান এবং এর নেতৃত্ব।

তৃতীয় ফলাফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ভারতের সামরিক নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সামরিক মানসিকতা ধারণ করছে।

তিনি বলেন, আগে ভারতীয় সামরিক বাহিনী পেশাদার ছিল, কিন্তু এখন তা রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার হয়েছে।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, সংঘাতের কয়েক মাস পর ভারতের বিমানবাহিনীর প্রধান বললেন, আজই জানতে পারলাম আমরাও কয়েকটি বিমান ভূপাতিত করেছি। এটা সামরিক নেতৃত্বের রাজনৈতিক ব্যবহার ছাড়া আর কিছু নয়।

তিনি আরও বলেন, আপনারা কেন নিজেদের অ্যাডমিরাল, জেনারেল আর মার্শালদের হাস্যকর বানাচ্ছেন? এটা করবেন না।

তিনি আরও বলেন, ভারতীয় রাজনীতিকদের বক্তব্য যুদ্ধ উসকে দেওয়ার মতো। সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিককরণ এবং রাজনীতির সামরিকীকরণকে তিনি অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মন্তব্য করেন।

চতুর্থ কৌশলগত ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্ব এখন বুঝতে পেরেছে যে ভারত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা আড়াল করতে বাইরের ইস্যুকে ব্যবহার করছে এবং সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় কৌশল হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে।

তার মতে, সংখ্যালঘু ও কাশ্মীরিদের দমন-পীড়ন ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। কিন্তু ভারত তা সমাধান না করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।

তিনি বলেন, কাশ্মীর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। এটিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন করা যাবে না।

তিনি আবারও অভিযোগ করেন, ভারত পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে মদদ দিচ্ছে। এমনকি নিজেদের দেশেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে অন্যদের দায়ী করছে বলেও দাবি করেন তিনি।

পঞ্চম ফলাফল হিসেবে তিনি বলেন, মারকা-ই-হক ভারতীয় গণমাধ্যমের আসল চেহারা উন্মোচন করেছে এবং তাদের তথ্যযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

তিনি বলেন, সংঘাত চলাকালে ভারত পাকিস্তানি গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে।

তার ভাষায়, আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শুধু সত্যই টিকে থাকতে পারে। পাকিস্তান সেটাই করেছে। কিন্তু ভারত এখনো মনে করে মিথ্যার মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ষষ্ঠ ফলাফল হিসেবে তিনি বলেন, আধুনিক যুদ্ধের চরিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন যুদ্ধ শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধ এখন স্থল, সমুদ্র, আকাশ, সাইবার জগৎ এবং মানুষের চিন্তায়ও পরিচালিত হয়।

তার দাবি, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী মারকা-ই-হক-এ এসব সবক্ষেত্রেই লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল এবং এখনো রয়েছে।

সপ্তম ফলাফল হিসেবে তিনি পাকিস্তানের বহুমুখী সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার কথা বলেন। অষ্টম ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিরোধ সক্ষমতার সুস্পষ্ট প্রতিষ্ঠা।

তিনি বলেন, দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে যুদ্ধের সুযোগ আছে বলে যারা মনে করে তারা পাগল। যদি কেউ যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে আমাদের অঙ্গীকার নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়।

নবম ফলাফল হিসেবে তিনি বলেন, পাকিস্তান এখন ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল মধ্যম শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে তিনি জনগণ, সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর ঐক্যের কথা উল্লেখ করেন। একে তিনি বুনইয়ানুম মারসুস এর প্রভাব বলে অভিহিত করেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিভিন্ন পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ভারতকে শিক্ষা দেওয়ার পর তারা আবার তাদের পুরোনো পন্থায় ফিরে গেছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করছে।

তার দাবি, মারকা-ই-হক-এর পর পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যায়। পরে অক্টোবরে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসীদের অবকাঠামোয় হামলা চালানোর পর সেই সংখ্যা কমে আসে।

তিনি পুনরায় অভিযোগ করেন, পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদে ভারতের মদদ রয়েছে এবং আফগানিস্তানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে একাধিক ভিডিও প্রদর্শনের পর পাকিস্তানের এই সেনা মুখপাত্র বলেন, পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার যে অংশ মারকা-ই-হক-এ দেখা গেছে, তা পুরো শক্তির মাত্র ১০ শতাংশ।

তিনি বলেন, আমরা প্রস্তুত। কেউ যদি আমাদের পরীক্ষা করতে চায়, তাদের স্বাগত।

তিনি জানান, ভিডিওতে পাকিস্তানের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সামরিক সক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, সেনাবাহিনীর রকেট ফোর্স কমান্ড, যুদ্ধ ট্যাংক, দূরপাল্লার কামান, জাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, কোয়াডকপ্টার, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, ঘুরে বেড়ানো হামলাকারী গোলাবারুদ, ইলেকট্রো-অপটিক্যাল উপগ্রহ এবং সমন্বিত গোলন্দাজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

তিনি বলেন, যখন আমরা বলি জনগণের সমর্থনে সশস্ত্র বাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা করবে, তখন আমরা সেটি সত্যিই বোঝাই।

তবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও কৌশলগত স্পষ্টতা ছাড়া সামরিক সক্ষমতার কোনো মূল্য নেই।পাকিস্তান সংঘাত বা যুদ্ধ চায় না। তবে সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করে আত্মরক্ষা করতে জানে। 

সংবাদ সম্মেলনে রিয়ার অ্যাডমিরাল শিফাত আলী বলেন, মারকা-ই-হক ছিল ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় সংঘাত। এই সংঘাতের আগে ভারতীয় নৌবাহিনী নিজেদের শক্তি নিয়ে গর্ব করত। প্রতিরক্ষা বাজেটের বড় অংশ নৌবাহিনীতে ব্যয় করা হতো। তারা নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রদানকারী বলেও দাবি করত।

তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাহলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তারা সাহস দেখাতে পারল না কেন?

তার দাবি, সংঘাত চলাকালে ভারতীয় নৌবাহিনী উত্তর আরব সাগরে জাহাজ মোতায়েন করেছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের নৌসম্পদে হামলা চালানো এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করা। কিন্তু পাকিস্তান নৌবাহিনীর কার্যকর কৌশলের কারণে সমুদ্রপথে চলাচল, স্থাপনা ও বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক ছিল।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান নৌবাহিনী আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো সময় ভারতীয় তৎপরতা নজরদারিতে রেখেছিল।

রিয়ার অ্যাডমিরাল শিফাত আলী বলেন, পাকিস্তান নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী ভারতীয় বিমানবাহী রণতরী বিক্রান্ত ধ্বংস করতে প্রস্তুত ছিল। তবে ভারতীয় নৌবাহিনী নিরাপদ সীমার বাইরে আসেনি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow