যেখানে ক্যামেরা থামে, সেখানেও বিজিবির বীরত্বগাথা

সাঈফ ইবনে রফিক বাংলাদেশের টেলিভিশন পর্দা এখন বিশ্বকাপের রঙে উদ্ভাসিত। স্টুডিওর ঝলমলে আলোয় আর্জেন্টিনা কিংবা প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে সংবাদ পাঠ করছেন উপস্থাপকেরা। উল্লাস, করতালি, বিজ্ঞাপনের ঝলক—চারদিকে উৎসবের ধ্বনি। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ে, উপকূলে, সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত জনপদে চলছে জীবন-মৃত্যুর আরেক যুদ্ধ। সেখানে গ্যালারি নেই, করতালি নেই, ক্যামেরার ঝলকানি নেই। আছে কেবল পাহাড়ি ঢলের গর্জন, ধসে পড়া মাটির আর্তনাদ, বুকসমান পানিতে ডুবে যাওয়া গ্রাম, ভেঙে পড়া সড়ক আর প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া, নিঃশব্দ সংগ্রাম। গত কয়েক দিনের বন্যা, ভারী বর্ষণ ও ভূমিধসে সাত জেলার ১০ লাখের বেশি মানুষের জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবেই প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন। দুই লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দী কিংবা বিচ্ছিন্ন। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ৮০ হাজার বসতবাড়ি, তিন হাজার ৮৪০ কিলোমিটার সড়ক এবং ৩৩৯টি সেতু ও কালভার্ট বিধ্বস্ত হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। এগুলো হাজারো ভাঙা সংসার, হাজারো নির্ঘুম রাত, হাজারো মায়ের বুকফাটা কান্নার নীরব সাক্ষী। ঢাকার ঝাঁকে ঝাঁকে

যেখানে ক্যামেরা থামে, সেখানেও বিজিবির বীরত্বগাথা

সাঈফ ইবনে রফিক

বাংলাদেশের টেলিভিশন পর্দা এখন বিশ্বকাপের রঙে উদ্ভাসিত। স্টুডিওর ঝলমলে আলোয় আর্জেন্টিনা কিংবা প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়িয়ে সংবাদ পাঠ করছেন উপস্থাপকেরা। উল্লাস, করতালি, বিজ্ঞাপনের ঝলক—চারদিকে উৎসবের ধ্বনি। অথচ ঠিক সেই মুহূর্তে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ে, উপকূলে, সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত জনপদে চলছে জীবন-মৃত্যুর আরেক যুদ্ধ। সেখানে গ্যালারি নেই, করতালি নেই, ক্যামেরার ঝলকানি নেই। আছে কেবল পাহাড়ি ঢলের গর্জন, ধসে পড়া মাটির আর্তনাদ, বুকসমান পানিতে ডুবে যাওয়া গ্রাম, ভেঙে পড়া সড়ক আর প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া, নিঃশব্দ সংগ্রাম।

গত কয়েক দিনের বন্যা, ভারী বর্ষণ ও ভূমিধসে সাত জেলার ১০ লাখের বেশি মানুষের জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। সরকারি হিসাবেই প্রাণ হারিয়েছেন ৫১ জন। দুই লাখ ৬৭ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দী কিংবা বিচ্ছিন্ন। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ৮০ হাজার বসতবাড়ি, তিন হাজার ৮৪০ কিলোমিটার সড়ক এবং ৩৩৯টি সেতু ও কালভার্ট বিধ্বস্ত হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। এগুলো হাজারো ভাঙা সংসার, হাজারো নির্ঘুম রাত, হাজারো মায়ের বুকফাটা কান্নার নীরব সাক্ষী।

ঢাকার ঝাঁকে ঝাঁকে চকচকে ক্যামেরা যেখানে থমকে যায়, বন্যাকবলিত সড়কে যেখানে টেলিভিশনের গাড়ির চাকা আর গড়ায় না, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি বাহিনীর নিঃশব্দ অভিযাত্রা। দুর্গম পাহাড়, সীমান্তবর্তী গ্রাম, নদীবিচ্ছিন্ন জনপদ—যেখানে জাতীয় গণমাধ্যমের আলো পৌঁছায় না, সেখানেই আলো হয়ে পৌঁছে যান বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি)-এর সদস্যরা। কোনো হাই রেজুলেশনের ক্যামেরা নেই তাঁদের সঙ্গে, কোনো প্রচারের বাসনা নেই বুকে। আছে শুধু একটাই অঙ্গীকার—মানুষকে বাঁচাতে হবে।

দুর্যোগ কি শুধু ঝকঝকে ক্যামেরার সামনেই ঘটে? না। দুর্যোগ ঘটে থানচির দুর্গম থুইসাপাড়ায়, যেখানে বৃষ্টি ও ঢলে ফুলে ওঠা ঝিরির মাঝে আটকা পড়েছিলেন চারজন নিরুপায় পর্যটক। গত ৪ জুলাই আমিয়াখুমের পথে বেরিয়ে ৭ জুলাই থেকে তাঁরা বন্দী হয়ে পড়েন প্রকৃতির নিষ্ঠুর জালে। আর তখনই এগিয়ে আসে বলিপাড়া ব্যাটালিয়নের ৩৮ বিজিবি। কোনো আহ্বানের অপেক্ষা না করেই ১১ জুলাই শুরু হয় প্রাণ বাজি রাখা এক অভিযান। থুইসাপাড়া, জিন্নাপাড়া, হালিরামপাড়া, নিকোলাসপাড়া, অংসাউপাড়া—একের পর এক দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়েছেন তাঁরা। পায়ের নিচে পিছলে যাওয়া কাদা, মাথার ওপর অবিরাম বৃষ্টি, চারপাশে ধসে পড়া পাহাড়ের হুংকার উপেক্ষা করে প্রথম দিন সীমান্ত সড়কে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু হার মানেননি তাঁরা। পরদিন আরেকটি দল প্রায় চার ঘণ্টা ধরে দুর্গম পাহাড় আর খরস্রোতা ছড়া ডিঙিয়ে অবশেষে আটকে পড়া পর্যটকদের নেপিউপাড়া বিওপিতে পৌঁছে দেয়। প্রায় ৪৮ ঘণ্টাব্যাপী এই রুদ্ধশ্বাস অভিযান শেষে তাঁদের নিরাপদে থানচিতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

এই দৃশ্য কোনো বহুক্যামেরার ব্যবস্থায় ধারণ করা হয়নি। পাহাড়ের গা বেয়ে পিছলে পড়া পা, খরস্রোতে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রাখা, ভেজা পোশাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিঃশব্দ পথচলা, রাতের গাঢ় অন্ধকারে আতঙ্কিত মানুষকে বুকে টেনে নিয়ে আশ্বস্ত করার সেই মুহূর্ত—কোনো টেলিভিশন তা ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু উদ্ধার হওয়া সেই চার পর্যটকের কাছে সেটিই ছিল জীবনের সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে অবিস্মরণীয় ছবি। যে ছবি কোনো পর্দায় দেখা যায়নি, তা খোদাই হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য কৃতজ্ঞ কিছু মানুষের হৃদয়ে।

এটি বিচ্ছিন্ন কোনো বীরত্বগাথা নয়। এ যেন এক চলমান মহাকাব্য। বান্দরবান, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ফেনী, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও জামালপুরের ৯০টি পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট থেকে দিনরাত সজাগ দৃষ্টি রাখছে বিজিবি। বান্দরবানেই উদ্ধার করা হয়েছে ১২২টি পরিবারের ছয় শতাধিক অসহায় মানুষকে, যাঁদের মধ্যে ১১৬ জন পর্যটক। প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও জরুরি সহায়তা। অন্তত ৪৮ জনকে দেওয়া হয়েছে চিকিৎসাসেবা। প্রতিটি জীবন যেন তাঁদের কাছে সমান মূল্যবান।

বন্যার শুরুর ভয়াবহ দিনগুলোতেই থানচির নাফাখুম, রেমাক্রি, জিন্নাপাড়া ও বড়পাথর এলাকায় আটকে পড়া শতাধিক পর্যটককে মৃত্যুর মুখ থেকে টেনে এনেছে বিজিবি। একই নিঃশব্দ নিষ্ঠায় বলিপাড়া, বাগানপাড়া, অন্তনীপাড়া, হিন্দুপাড়া ও মুসলিমপাড়ার পানিবন্দী পরিবারের হাতে পৌঁছে দিয়েছে চাল, ডাল, শুকনো খাবার; যখন দুই শতাধিক মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে ভয়াবহ দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছিলেন।

বিশ্বকাপের উত্তেজনা থাকবে, প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে উচ্ছ্বাস চলবে, এবং তা চলাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র ও তার সংবাদমাধ্যমকে ভুলে গেলে চলবে না—স্টুডিওর ঝলমলে জার্সির বাইরেও একটি বাংলাদেশ আছে, যেখানে মানুষ এখনো বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে, পাহাড়ধসে পথ বন্ধ হয়ে আছে, শিশুরা এখনো খাবারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। আর ঠিক সেখানেই কাদা, জল আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে নিঃশব্দে, নিরলসভাবে লড়ে যাচ্ছেন বিজিবির সাহসী সন্তানেরা।

উদ্ধারের পাশাপাশি চলছে আশ্রয় ও ত্রাণের নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস। বান্দরবান শহরের ক্রাইক্ষ্যংপাড়ায় আটকে পড়া ১২২টি পরিবারকে উদ্ধার করে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে বিজিবি পরিচালিত স্কুল ও স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তের কোনাপাড়া গ্রামের ২০০টি বন্যাদুর্গত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি)। আলীকদম, বলিপাড়া, কাপ্তাই, বাঘাইছড়ি ও রামগড়ে ছুটে গেছে একের পর এক ব্যাটালিয়ন—খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে। আর সর্বশেষ কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার বলিরপাড়া, আবাসন প্রকল্প ও মোরারপাড়া গ্রামের পাঁচ শতাধিক বানভাসি মানুষের কাছেও পৌঁছে গেছে নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়ন (১১ বিজিবি)। সেখানে পাঁচ শতাধিক মানুষকে রান্না করা খাবার পরিবেশনের পাশাপাশি ৫১০টি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে চাল, ডাল, আলু, সয়াবিন তেল, চিড়া, পেঁয়াজ, গুড়, লবণ, হলুদ ও মরিচসহ প্রয়োজনীয় শুকনো খাদ্যসামগ্রী। বন্যার অভিঘাতে যখন বহু পরিবার চুলায় আগুন জ্বালানোর সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছে, তখন এই সহায়তা তাদের কাছে ছিল শুধু ত্রাণ নয়, নতুন করে বেঁচে থাকার শক্তি।

বিজিবির দায়িত্ব শুধু মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কে উপড়ে পড়া গাছ, স্তূপীকৃত মাটি ও ধ্বংসস্তূপ নিজ হাতে সরিয়ে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করেছেন তাঁরা। নাইক্ষ্যংছড়িতে পাহাড়ি স্রোতের তোড়ে ধসে পড়ার মুখে থাকা একটি স্টিলের সেতু রক্ষায় রাতের আঁধারে বালুর বস্তা ফেলে গড়ে তুলেছেন প্রতিরোধপ্রাচীর। ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগের খুঁটি মেরামতেও স্থানীয় প্রশাসনের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন এই নীরব যোদ্ধারা। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তিকেও যুক্ত করা হয়েছে মানবিক এই অভিযানে। পেকুয়ার বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে পরিস্থিতি, যাতে বিচ্ছিন্ন জনপদ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও জরুরি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে—এমন স্থানগুলো দ্রুত শনাক্ত করে যথাসময়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়।

এই প্রতিটি কাজ আসলে ছোট নয়। প্রতিটিই একেকটি জীবন রক্ষার মহাকাব্য। একটি গাছ সরানো মানে একটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য পথ খুলে দেওয়া, হয়তো একটি সদ্যোজাত শিশুর নিঃশ্বাস বাঁচানো। একটি সেতুর ভিত রক্ষা করা মানে কয়েকটি গ্রামের সঙ্গে পৃথিবীর সংযোগ অটুট রাখা। একটি ক্ষুধার্ত শিশুর হাতে শুকনো খাবারের প্যাকেট তুলে দেওয়া মানে সেই শিশুর চোখে আবার আশার আলো জ্বালানো। একজন অসুস্থ বৃদ্ধের কাছে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া মানে মৃত্যুর দুয়ার থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনা।

অথচ এই বীরত্বগাথার সিংহভাগই থেকে যায় জাতীয় টেলিভিশনের পর্দার আড়ালে। সংবাদমাধ্যমেরও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা আছে। যোগাযোগবিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল, বিদ্যুৎহীনতা, দুর্বল ইন্টারনেট এবং দুর্গম পথে ক্যামেরাকর্মীদের পৌঁছাতে না পারা—এসব বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে কম রেজুলেশনের একটি ভিডিওকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যাচাই করে, প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা, মানচিত্র, ভয়েস ওভার এবং স্থানীয় প্রতিনিধির তথ্য যুক্ত করে সেই ফুটেজও হয়ে উঠতে পারে জাতির কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর মাধ্যম। কারণ সংবাদ কেবল নান্দনিক দৃশ্য নয়; সংবাদ হলো মানুষের জানার অধিকার, মানুষের বেঁচে থাকার সত্য।

সবচেয়ে বড় কথা, বিজিবি টেলিভিশনে দেখানোর জন্য এই লড়াই লড়ছে না। কোনো সদস্য পাহাড়ি খরস্রোত পার হচ্ছেন না প্রচারচিত্রের লোভে, রাতভর ভেজা পোশাকে ছুটছেন না কোনো পুরস্কারের আশায়। তাঁরা এগিয়ে যান কেবল একটি তাড়না থেকে—মানুষকে বাঁচাতে হবে, যে কোনো মূল্যে। সীমান্ত পাহারার পাশাপাশি দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে বিজিবি নিজের পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করে। নাইক্ষ্যংছড়ি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফয়জুল কবিরও একই প্রত্যয়ের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশের যেকোনো দুর্যোগ ও মানবিক সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো বিজিবির অন্যতম দায়িত্ব। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার, ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। এই ঘোষণায় কেবল একটি ব্যাটালিয়নের অবস্থান নয়, প্রতিফলিত হয়েছে সমগ্র বিজিবির মানবিক দর্শন।

আর এখানেই লুকিয়ে আছে বিজিবি ও সীমান্তের মানুষের সম্পর্কের আসল, অবিনশ্বর রসায়ন।

যে সদস্য দুর্যোগের রাতে নিজের কাঁধে তুলে একজন অসহায় বৃদ্ধকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেন, সীমান্তে উত্তেজনার দিনে সেই একই সদস্যের পাশে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান স্থানীয় মানুষ। যে বাহিনী পাহাড়ি ঢলের গর্জন উপেক্ষা করে খাদ্য নিয়ে ছুটে যায় দুর্গম পাড়ায়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কোনো আগ্রাসী তৎপরতা দেখা দিলে সেই এলাকার মানুষই আগেভাগে খবর পৌঁছে দেয় বিজিবিকে, পথ দেখায়, আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গড়ে তোলে দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ। এ কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সম্পর্ক নয়। এ বিশ্বাসের বন্ধন, রক্তে গাঁথা নির্ভরতার বন্ধন, পারস্পরিক দায়বদ্ধতার এক অটুট শৃঙ্খল।

বিজিবি তাই শুধু সীমান্তের নীরব প্রহরী নয়। কোনো রাতে তারা উদ্ধারকর্মী, কোনো ভোরে চিকিৎসাসেবক, কখনো ভাঙা সড়ক জোড়া লাগানো শ্রমিক, কখনো ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে হাসি ফোটানো এক মানবিক মুখ। সীমান্তে তারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অটল প্রতীক, আর দুর্যোগের রাতে তারা কোটি মানুষের একমাত্র ভরসার নাম।

বিশ্বকাপের উত্তেজনা থাকবে, প্রিয় দলের জয়-পরাজয় নিয়ে উচ্ছ্বাস চলবে, এবং তা চলাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র ও তার সংবাদমাধ্যমকে ভুলে গেলে চলবে না—স্টুডিওর ঝলমলে জার্সির বাইরেও একটি বাংলাদেশ আছে, যেখানে মানুষ এখনো বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে, পাহাড়ধসে পথ বন্ধ হয়ে আছে, শিশুরা এখনো খাবারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। আর ঠিক সেখানেই কাদা, জল আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে নিঃশব্দে, নিরলসভাবে লড়ে যাচ্ছেন বিজিবির সাহসী সন্তানেরা।

সেই লড়াইয়ের ছবি হয়তো কোনো টেলিভিশনের পর্দায় ঝকঝকে নয়, হয়তো কখনো তা প্রচারিতই হবে না। কিন্তু ইতিহাসের খাতায় সেই ছবির

রেজুলেশন সবচেয়ে উঁচু, সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে অমলিন। আর এভাবেই বিজিবি হয়ে ওঠে সীমান্তে নিরাপত্তা, মানবিকতা ও আস্থার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতীক।

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow