দেশের কিছু এলাকায় একটি কুপ্রথা প্রচলিত আছে, কোরবানির সময় মেয়ের বাড়ি থেকে জামাইয়ের জন্য কোরবানির পশু পাঠাতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটিকে অলিখিত বাধ্যবাধকতা হিসেবে ধরা হয়। কোরবানির মৌসুম ঘনিয়ে এলে কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় পশু পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ফলে বরপক্ষের মনে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয় যে, তাদের ছেলের শ্বশুরবাড়ি থেকেও যেন এমন কিছু আসে, যা সামাজিকভাবে তাদের মর্যাদা বাড়ায়। অন্যদিকে মেয়ের পক্ষেও চাপ তৈরি হয় যে, জামাইকে বড় কোরবানির পশু না দিতে পারলে মানসম্মান নষ্ট হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর কারণে মেয়েরা মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের ঝুঁকিতেও পড়ে। এমনকি কেউ যদি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও চাপমুক্তভাবে উপহার দিতে চায়, তবুও এ প্রথা অনেকের জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সব মিলিয়ে, যৌতুক হিসেবে পাঠানো এ পশু দিয়ে কোরবানি করা নানা দিক থেকে জটিলতার সৃষ্টি করে।
যৌতুকের শামিল হওয়ার কারণে: বাস্তবতা হলো, এ ধরনের উপহার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যৌতুকের পর্যায়ে পড়ে। খুব কম মানুষই সম্পূর্ণ চাপমুক্ত ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমন উপহার দেয়। অনেক সময় সামর্থ্য না থাকলেও সামাজিক চাপে পড়ে দিতে বাধ্য হয়। অথচ যৌতুক মূলত অন্যায়ভাবে চাপ সৃষ্টি করে অন্যের সম্পদ গ্রহণের নামান্তর, যা ইসলামে সুস্পষ্টভাবে হারাম এবং জুলুমের অন্তর্ভুক্ত।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না এবং তা বিচারকদের (ঘুষ হিসেবে) প্রদান করো না, যাতে মানুষের সম্পদের কোনো অংশ জেনেবুঝে পাপের মাধ্যমে গ্রাস করতে পার।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৮৮)। হাদিসে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি শুধু পবিত্র (হালাল) জিনিসই গ্রহণ করেন।’ (মুসলিম, হাদিস: ২২৩৬)। অতএব, জবরদস্তি বা সামাজিক চাপে অর্জিত সম্পদ দিয়ে কোরবানি করলে তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে সংশয় থেকেই যায়।
ইবাদত প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা: যৌতুকের পশু অনেক সময় ‘মানসম্মানের প্রতীক’ হয়ে দাঁড়ায়। এতে শয়তান মানুষের অন্তরে লোক দেখানো মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। কোরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হলেও, তা ধীরে ধীরে প্রশংসা ও বাহবা পাওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে। এতে ইবাদতের মূল চেতনা ক্ষুণ্ন হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে না পৌঁছে এগুলোর গোশত, না পৌঁছে রক্ত; বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত ৩৭)। অতএব, যখন কোরবানি ‘কে কত বড় পশু দিল’, এ প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তখন ইখলাস নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে ওঠে।
অহংকার ও গর্বের জন্ম দেওয়া: যৌতুকের পশু নিয়ে অনেক সময় পরিবার বা ব্যক্তি অহংকারে আক্রান্ত হয়—‘আমাদের শ্বশুরবাড়ি থেকে এত বড় পশু এসেছে’, ‘আমরা উচ্চবিত্ত পরিবারে সম্পর্ক করেছি’, এ ধরনের মনোভাব নিয়তকে কলুষিত করে। অথচ কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান, আয়াত ১৮)
সামাজিক কুপ্রথাকে শক্তিশালী করা: এ ধরনের উপহার গ্রহণ করলে সমাজে ভুল ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, বিয়েতে মেয়েপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করা স্বাভাবিক, এমনকি বাধ্যতামূলক। এতে জুলুমের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। অথচ ইসলাম স্পষ্টভাবে অন্যায় কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ২)। সুতরাং, যৌতুকের পশু গ্রহণ এবং তা দিয়ে কোরবানি করা অনেক সময় একটি সামাজিক অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার শামিল হয়ে যায়। তাই বরপক্ষের উচিত আগেই বিনয়ের সঙ্গে কনেপক্ষকে এ ধরনের কুপ্রথা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করা। একই সঙ্গে সমাজের প্রত্যেক সচেতন মানুষের দায়িত্ব, এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা। তবে কেউ যদি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, আন্তরিকভাবে এবং কোনো ধরনের চাপ ছাড়াই উপহার দেয়, তা গ্রহণ করা জায়েজ। কিন্তু যেহেতু শয়তান মানুষের ইবাদতকে বিনষ্ট করতে সদা তৎপর, তাই সন্দেহজনক ও কুপ্রথা সংবলিত বিষয় থেকে বিরত থাকাই অধিক উত্তম।
লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক