২০২৪ সালের আগস্টে স্বৈরাচারের যে পতন আমরা দেখেছি, তা হুট করে এক বা দুই মাসের কোনো আন্দোলনের ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ১৭ বছরের এক নির্মম ও রক্তক্ষয়ী লড়াই। আর সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের মাঠপর্যায়ের একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে আমি নিজেই ফ্যাসিবাদের সেই নিকষ অন্ধকারের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। এই গল্প বাংলাদেশের রাজপথে বুক চিতিয়ে লড়াই করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিটি সাধারণ কর্মীর রক্ত, ঘাম আর টিকে থাকার এক অলিখিত ইতিহাস।
একটি প্রচলিত কথা আছে- ‘পানি দিয়ে গোসল করলে কেবল গায়ের কাপড় বদলায়, ঘাম দিয়ে গোসল করলে বদলায় নিজের ভাগ্য; আর যারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে গোসল করে, তারা বদলে দেয় আস্ত একটি দেশের ইতিহাস’! বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের হাজারো নেতাকর্মী গত ১৭ বছর আর এই জুলাইয়ের রাজপথে নিজেদের তাজা রক্ত দিয়ে গোসল করে এই বাংলাদেশের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দিয়েছে!
আমার জাতীয়তাবাদী চেতনার শেকড় প্রোথিত কিশোর বয়স থেকেই। সালটা তখন ২০০৮; ধানের শীষের প্রচারণায় কিশোর বয়সেই আমি অংশ নিয়েছিলাম। সেই চপল বয়সেই এই বুকে প্রথম বাসা বেঁধেছিল শহীদ জিয়ার জাতীয়তাবাদী আদর্শ। এরপর পড়াশোনার তাগিদে কিছুদিন এসব থেকে দূরে থাকলেও, ছাত্রদল-বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ সবসময়ই সচল ছিল।
পরে ২০১২-১৩ সেশনে আমি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হই। অবরুদ্ধ স্বদেশের মুক্তি আর সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এক তীব্র তাড়না আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই রাজপথে টেনে এনেছিল। ২০১৩ সালে আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বে যখন হাসিনাশাহীর বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠল, তখন আর ঘরে বসে থাকা সম্ভব হয়নি; সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে আমি যোগ দিই সেই মিছিলে। ক্যাম্পাসের শুরু থেকেই আমরা বিরোধী দলের রাজনীতি বেছে নিয়েছিলাম, যা প্রমাণ করে কোনো সস্তা রাজনৈতিক লোভ-লালসার কাছে ছাত্রদলের কর্মীরা কখনো মাথা বিকিয়ে দেয়নি।
কিন্তু ফ্যাসিবাদের রাহুগ্রাসে তখন সাধারণ ছাত্র রাজনীতিও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। ফজলুল হক হলে থাকার সময় শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বুকে লালন করার অপরাধে, তৎকালীন হল প্রশাসনের প্রকাশ্য মদদে বর্তমানের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ আমাকে হল থেকে বের করে দেয়। এরপর ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় টিএসসিতে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়ে আর হাসিনার স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেওয়ার অপরাধে জহুরুল হক ছাত্রলীগের তৎকালীন সেক্রেটারি ও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সভাপতি জয়ের নেতৃত্বে হিংস্র হায়েনার মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। অমানুষিক প্রহারে তারা আমাকে পিটিয়ে জঘন্যভাবে আহত করেছিল।
এরপর ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি; আমাকে গ্রেপ্তার করা হলো। নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের একটি কর্মসূচি শেষ করে যখন আমি ক্যাম্পাসের দিকে ফিরছিলাম, ঠিক তখনই মাঝপথ থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (SB) সদস্যরা আমাকে অতর্কিতে তুলে নেয়। গাড়ির ভেতরে আমার ওপর শুরু হয় এক অমানুষিক ও বর্বর শারীরিক নির্যাতন। চলন্ত গাড়ির ভেতরেই বুট জুতো আর কিল-ঘুষির এমন কোনো আঘাত নেই যা সেদিন আমার শরীরে সহ্য করতে হয়নি।
নির্যাতনের একপর্যায়ে বুট দিয়ে আমার বুক চেপে ধরে তারা হিংস্র গলায় জেরা করতে শুরু করল—‘তোর এত সাহস কেন? তুই ছাত্রদল করিস কেন? তোরে যদি এখন চিরতরে উঠায় নিয়ে যাই, দুনিয়ার কেউ কি তোর খোঁজ পাবে?’ গুম করে দেওয়ার সেই হুমকি আর পৈশাচিক মানসিক ট্রমার ভেতর দিয়ে প্রায় চার-পাঁচ ঘণ্টা ধরে পুরো ঢাকা শহর ঘুরিয়ে আমাকে পল্টন থানায় নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে নিয়ে গিয়েও থামেনি তাদের কুৎসিত দুর্ব্যবহার আর একের পর এক গুম করে ফেলার হুমকি।
অবশেষে, অবর্ণনীয় নির্যাতনের পর আমার নামে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও সাজানো বিস্ফোরক আইনের একটি মিথ্যা মামলা ঠুকে দেওয়া হলো। রাষ্ট্রযন্ত্রের সেই পরিকল্পিত অবিচারের হাত ধরে আমি বন্দি হলাম কারাগারের সেই চেনা অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। তখন আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। আমি কোনোভাবেই শিক্ষাজীবনে ইয়ার গ্যাপ দিয়ে হেরে যেতে চাইনি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আদালত থেকে অনুমোদন নেওয়ার পর, পরীক্ষা দেওয়ার সুবিধার্থে আমাকে পুরোনো নাজিমুদ্দিন রোডের সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তর করা হলো।
আমি রসায়নের একজন নিয়মিত ছাত্র, কোনো দাগী খুনি বা সন্ত্রাসী নই; অথচ আমাকে পরীক্ষা দিতে হয়েছিল জেলখানায়! জেলগেটে বন্ধুদের পাঠিয়ে সংগ্রহ করা বইপত্র ভেতরে ঢোকানোর সময় কারারক্ষীরা চরম দুর্ব্যবহার করে বলেছিল- ‘জেলের ভেতর আবার কিসের পরীক্ষা?’ পরবর্তীতে জেলের ভেতরে জেলারের রুমে রসায়ন বিভাগের দুজন সম্মানিত শিক্ষক, কারা কর্তৃপক্ষ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে আমি জীবনের অন্যতম কঠিন সেই ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিই। এভাবেই রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে চেয়েছিল।
ফ্যাসিবাদের নির্মমতার আরেকটি চরম রূপ আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই। সে সময় আমাদের নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের বিরুদ্ধে তৎকালীন নষ্ট বিচার ব্যবস্থার ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের’ এক ফরমায়েশি ও প্রহসনের রায় ঘোষণা করা হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্রদল পরদিন দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেয়।
কার্জন হলের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জায়গায় এই ধর্মঘট সফল করার মূল দায়িত্বটি অর্পিত হয় আমার ওপর। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে অত্যন্ত গোপনে ও সুকৌশলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৫টি বিভাগের একযোগে তালা ঝুলিয়ে দিই। কিন্তু মূল নারকীয় তাণ্ডবটি শুরু হলো যখন আমি কার্জন হলের প্রধান ফটকে দেশনায়ক তারেক রহমানের ছবিসংবলিত প্রতিবাদী ব্যানারটি টানাতে গেলাম।
নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ব্যানারটি দেখা মাত্রই হিংস্র হায়েনার মতো ৫-৬টি মোটরবাইক নিয়ে গর্জন করতে করতে আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। চোখের পলকে প্রায় ৭০-৮০ জন রক্তপিপাসু নরপশু জিআই পাইপ আর লাঠিসোটা নিয়ে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা কোনো মানুষ ছিল না, ছিল এক একটা ক্ষুধার্ত নেকড়ে। কাপুরুষের মতো দলবেঁধে তারা আমার মাথায়, পিঠে, পায়ে নির্বিচারে আঘাত করতে থাকে।জিআই পাইপের প্রতিটি আঘাতে আমার শরীরের হাড়গুলো কেঁপে উঠছিল, চামড়া ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে পড়ছিল রাজপথে। একপর্যায়ে উপর্যুপরি পিটুনিতে আমার শরীর অসাড় হয়ে আসে, নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। নির্যাতনে আঘাতে আঘাতে আমার পুরো পায়ের চামড়া কালো কুচকুচে হয়ে গিয়েছিল, একটা দাঁত নড়বড়ে হয়ে প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আর তৃষ্ণায় বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। জীবন বাঁচানোর শেষ আকুতি নিয়ে আমি যখন একটুখানি পানির জন্য হাত বাড়ালাম, তখন ছাত্রলীগের সেই নরপশুরা ন্যূনতম মানবতাবোধ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে দিয়েছিল।
মানবিকতা দেখানোর বদলে উল্টো চিৎকার করে বলছিল—‘ওর মুখে পানি দিবি না, প্রস্রাব করে দে... প্রস্রাব করে দে!’ আমার শরীর যখন পুরোপুরি নিথর, চোখ দুটো ওল্টানো , তখন দায় এড়াতে তারা পুলিশ ডেকে আমাকে তাদের হাতে তুলে দেয়। শাহবাগ থানা পুলিশ যখন আমাকে রক্তাক্ত ও নিথর মাংসপিণ্ডের মতো টেনে গাড়িতে তুলছিল, তখন আমার অবস্থা দেখে খোদ পুলিশ সদস্যরাও আতঙ্কে শিউরে উঠে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল—‘ও তো শেষ! ওকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নাও ,নইলে বাচানো যাবে না!’
যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় যেন পুলিশের ঘাড়ে না পড়ে, সেই ভয়ে তারা আমাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পর আমার অবস্থার চরম অবনতি ঘটে; ইন্টারনাল ব্লিডিংয়ের কারণে আমি অনবরত কালচে রক্তবমি করতে থাকি। হাসপাতালের মেঝে আমার নিজের রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি ও কমপ্লিক্সিটির লক্ষণ দেখে কর্তব্যরত এসআই (SI) তাৎক্ষণিকভাবে শাহবাগ থানার ওসিকে (OC) ফোন করে জানান যে ছেলেটা অবস্থা যেকোনো সময় খারাপ হয়ে যেতে পারে। কাস্টডিতে ছাত্রদল কর্মীর শারীরিক যেকোনো সমস্যার দায় এড়াতে ওসি তখন তড়িঘড়ি করে আমার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন এবং একটি মুচলেকা লিখে নিয়ে প্রায় অবচেতন অবস্থায় আমাকে আমার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।
এরপর আমার পরিবার চরম আতঙ্ক, কান্না আর ব্যাকুলতা নিয়ে আমাকে ঢাকা মেডিকেল থেকে জরুরি ভিত্তিতে ইসলামি ব্যাংক হাসপাতালের আইসিইউতে (ICU) স্থানান্তর করে। আইসিইউতে একদিন থেকে কেবিনে শিফট হই। সেই নির্মম মারধরের কারণে আমার কিডনির ক্রিয়েটিনিন লেভেলে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয় এবং লিভার ফাংশন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমার ভাই-বোন এবং মা দিনের পর দিন যে চরম মানসিক ট্রমা আর আতঙ্কের মধ্য দিয়ে গেছেন, তা কোনোদিনও কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এমনকি পরবর্তীতে আমি ঘর থেকে বের হলেও তারা এই গভীর ট্রমায় ভুগতেন- আমি সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরব, নাকি চিরতরে গুমের তালিকায় নাম উঠে যাবে!
কিন্তু এত কিছুর পরও ফ্যাসিবাদের সেই পৈশাচিক নির্যাতন শেষ হয়নি।
এরপরও আমাদের দমানো যায়নি। কার্টুনিস্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদের জেলহাজতে নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে আমি পুনরায় পুলিশের বর্বরোচিত হামলার শিকার হই এবং আমার পিঠে, হাতে পায়ে গুরুতর চোট পাই। শুধু আমি নই, বিগত ১৭ বছর ধরে এই রাজপথে ছাত্রদলের প্রতিটি কর্মীর পিঠ যেন হয়ে উঠেছিল ক্ষত-বিক্ষত বাংলাদেশের মানচিত্রের এক হুবহু রূপ! আমাদের শত শত নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, রিমান্ডের প্রকোপ সহ্য করতে না পেরে অনেকের কিডনি চিরতরে বিকল হয়ে গেছে।
বিগত ১৭ বছরের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, রক্ত আর অবর্ণনীয় নির্যাতনের চূড়ান্ত ও অবিনাশী রূপ আমরা দেখেছিলাম ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনে। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ছাত্রদল যে লড়াইয়ের সলতে পাকিয়েছিল, ২০২৪-এর জুলাইয়ে এসে দেশের আপামর জনতা সেই সংগ্রামে শামিল হয়। শুরু থেকেই আমাদের অভিভাবক দেশনায়ক তারেক রহমানের স্পষ্ট ও দূরদর্শী নির্দেশনা ছিল- নিজেদের দলীয় ব্যানার সরিয়ে রেখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক কোটা আন্দোলনের পাশে জানবাজি রেখে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হবে। আমরা নেতার সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলাম। যখন স্বৈরাচারী সরকারের নারকীয় ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড শুরু হলো, জীবন বাজি রেখে আমরা রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ি সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে। ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর বহিরাগতদের নিয়ে ছাত্রলীগ ঝাপিয়ে পড়েছিল তখন আমরা শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। ১৬ জুলাই থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল, তাদের সেই বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়েও আমরা রাজপথে ঢাল হয়েছিলাম।
এর পরপরই জুলাই আন্দোলনের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাংলাদেশে। ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া হয়ে উঠেছিল এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আঁতুরঘর। শনির আখড়ায় আমরা ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ মেহনতি মানুষ এবং আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করি। কাকরাইল মোড়ে যখন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ জড়ো হতে শুরু করে, তখন দিকনির্দেশনাহীন সেই বিশাল জনস্রোতকে সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত করার মূল দায়িত্বটি আমরা ছাত্রদলের কর্মীরা কাঁধে তুলে নিই। রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া রাজপথে কীভাবে পুলিশের টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড আর বুলেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, কীভাবে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের আক্রমণ প্রতিহত করতে হবে- তার কৌশলগত দিকনির্দেশনা আমরা সাধারণ মানুষকে দিচ্ছিলাম।
বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া এলাকায় আন্দোলনের তীব্রতা ছিল অভূতপূর্ব; সেখানকার এমন কোনো বাসা-বাড়ি ছিল না যেখান থেকে সাধারণ মানুষ স্বৈরাচার পতনের এই লড়াইয়ে শামিল হয়নি। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত কিন্তু বিক্ষিপ্ত বিশাল গোষ্ঠীকে মাঠে টিকিয়ে রাখতে এবং সুসংগঠিত করতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো রাজপথে কাজ করে গেছে। নিজের শরীর পুলিশের রাবার বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিয়েছি, কিন্তু রাজপথ ছাড়িনি। আর সেই রক্তের প্রবল জোয়ারেই ভেসে গেছে ১৭ বছরের সেই অহংকারী গণহত্যাকারী রাজপ্রাসাদ।
এই ঐতিহাসিক মহাবিজয় কোনো সাধারণ ক্ষমতা বদলের গল্প নয়, এটি কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাসের অবসান আর আমার মতো হাজারো কর্মীর শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্তের চূড়ান্ত ঋণ। যেই যন্ত্রণার কথা আজ আমি প্রকাশ করলাম, তা তো আমার জীবনের মাত্র কয়েকটি কালো দিন মাত্র; কিন্তু বিগত ১৭ বছরের সেই ফ্যাসিবাদের দানবীয় নির্যাতন আর নিপীড়নের নির্মম ইতিহাস বলে বা লিখে শেষ করার মতো নয়! আজ যখন আমরা একটি মুক্ত ও স্বাধীন বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, তখন আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ২০১৫ সালে নিজেরই রক্তে লাল হয়ে যাওয়া সেই রক্তাক্ত রাজপথ, ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থায় জেলের ভেতর অন্ধকার ফাইনাল পরীক্ষা আর ২০১৬ সালে কার্জন হলের সামনে ছাত্রলীগের সেই পাশবিক পিটুনিতে আইসিইউতে লড়াই করার প্রতিটি মুহূর্ত।
নিজের যৌবন, শিক্ষাজীবন আর শরীরকে ফ্যাসিবাদের কারাগারে তছনছ করে দিয়ে, মৃত্যুর মুখ থেকে বারবার ফিরে এসে আজ এই বিজয়ের আলোতে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পারি-আমাদের দায়িত্ব আসলে ফুরিয়ে যায়নি, বরং আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। আমাদের অভিভাবক দেশনায়ক তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে ক্ষমতার লোভ আর লালসার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের এখন একটি নতুন ভোরের বাংলাদেশ গড়তে হবে, যেখানে আর কোনোদিন কোনো ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া পড়ার সুযোগ থাকবে না।
লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।