রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচকে ফেরাই হবে বড় প্রাপ্তি

‘নতুন অর্থবছরে রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ, গত অর্থবছরে যেসব নেতিবাচক প্রভাব রপ্তানি খাতে চাপ সৃষ্টি করেছিল, তা কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে দ্বি-অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।’ জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এ মন্তব্য করেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি কেমন হতে পারে এবং কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এ বিষয়ে কথা বলেন এই অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কার্যত নেতিবাচক বলা যায়। নতুন অর্থবছরে রপ্তানি খাতের সম্ভাবনা কীভাবে দেখছেন? সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির ওপর ভিত্তি করে চলতি বছর প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। রপ্তানি আয় গত বছরের কাছাকাছিই থাকবে। আরও পড়ুন কেন ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না রপ্তান

রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচকে ফেরাই হবে বড় প্রাপ্তি

‘নতুন অর্থবছরে রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ, গত অর্থবছরে যেসব নেতিবাচক প্রভাব রপ্তানি খাতে চাপ সৃষ্টি করেছিল, তা কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে দ্বি-অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।’

জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এ মন্তব্য করেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি কেমন হতে পারে এবং কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এ বিষয়ে কথা বলেন এই অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি

সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কার্যত নেতিবাচক বলা যায়। নতুন অর্থবছরে রপ্তানি খাতের সম্ভাবনা কীভাবে দেখছেন?

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির ওপর ভিত্তি করে চলতি বছর প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। রপ্তানি আয় গত বছরের কাছাকাছিই থাকবে।

তবে নতুন অর্থবছরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কারণ, চলতি বছরে যেসব নেতিবাচক প্রভাব ছিল, তা কিছুটা কমে আসতে পারে। আমি মনে করি না যে দ্বি-অংকের (ডাবল ডিজিট) প্রবৃদ্ধি আশা করা বাস্তবসম্মত হবে। নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ফিরে আসাটাই হবে বড় বিষয়।

নতুন অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী হতে পারে?

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। চীন থেকে উৎপাদন স্থানান্তরের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার বড় অংশই ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারত পাচ্ছে। বাংলাদেশকে এই প্রতিযোগিতায় আরও সক্ষম হতে হবে।

এছাড়াও, এলডিসি উত্তরণের প্রভাব ধীরে ধীরে সামনে আসবে। যদিও এখনো বিভিন্ন বাজারে আমাদের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (প্রেফারেন্সিয়াল অ্যাকসেস) থাকবে, তবুও প্রতিযোগিতার চাপ বাড়বে।

তাই জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) মতো উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে হবে। অন্য দেশের সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে অপ্রচলিত (নন-ট্র্যাডিশনাল) বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর।

রপ্তানি খাত এগিয়ে নিতে সরকারের কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?

আমার মতে, এবারের বাজেটে সরকার কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এসব পদক্ষেপ রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়ক হবে।

তবে, শুধু এসব উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সব মিলিয়ে আমি আশাবাদী হওয়ার তিনটি কারণ দেখছি- চলতি বছরের বড় দুটি বৈশ্বিক চাপ কিছুটা কমে আসতে পারে, সরকারের ইতিবাচক নীতিগত উদ্যোগ ও রপ্তানিমুখী শিল্পে সহায়ক সংস্কার। এই তিনটি বিষয় আগামী অর্থবছরে রপ্তানি খাত কিছুটা হলেও এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে।

আপনি কেন মনে করছেন আগামী অর্থবছরে রপ্তানি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে?

চলতি বছর কয়েকটি বড় নেতিবাচক কারণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়ানো এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়া- এসব রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ প্রেক্ষাপটে আমি আশাবাদী হওয়ার তিনটি প্রধান কারণ দেখছি।

প্রথমত, চলতি অর্থবছর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় রপ্তানি চাহিদায় ধীরগতি দেখা গেছে। আগামী অর্থবছরে এই চাপ কিছুটা শিথিল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ উন্নত অর্থনীতিগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার ফলে সুদের হার ও জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।

এতে ভোক্তা ব্যয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের চাহিদা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সরকারের নেওয়া নীতিগত উদ্যোগগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণ, শুল্ক ও কর ব্যবস্থায় সহায়ক পদক্ষেপ এবং ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ- এসব উদ্যোগ শিল্পের কার্যকরী মূলধনের চাপ কমাবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল আরও দক্ষ করবে।

ফলে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হবে।

তৃতীয়ত, রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঠামোগত সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জোরদার করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে খাতটি আরও স্থিতিশীল ভিত্তি পাবে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়ন, লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন ও নীতি বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।

এসব পদক্ষেপ রপ্তানি খাত শুধু স্বল্পমেয়াদে নয়, বরং টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।

আইএইচও/এএসএ/ এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow