রাষ্ট্র মেরামতের ধারণাপত্র

৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। সারা দেশের মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনায় এক নতুন ধারার স্বপ্ন দেখছে। প্রাথমিকভাবে সারা দেশের আবালবৃদ্ধাবনিতা একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন প্রত্যাশা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী সরকারকে ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মেরামতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ তুলে ধরাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। এখানে প্রাসঙ্গিক কিছু প্রেক্ষাপট আলোচনা, রাষ্ট্র মেরামতের মূল দর্শন ও কৌশলগত স্তরসমূহ সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি সরকার গঠনের প্রথম ১০০ কার্যদিবসে করনীয়র একটি গাইডলাইন উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।  ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এ ভূখণ্ডে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের একটি দূরত্বপূর্ণ ও বৈরী সম্পর্কের সূচনা হয়। রাষ্ট্রকে জনগণের কল্যাণের বাহন নয়, বরং শোষণ ও দমনমূলক শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। দুঃখজনকভাবে স্বাধীনতার পরও এই মানসিকতার পূর্ণ সংশোধন ঘটেনি; বরং সময়ের সাথে সাথে তা নতুন ভাষা, নতুন স্লোগান ও নতুন কৌশলে আরও বিস্তৃত হয়েছে। ‘মানি না, মানবো ন

রাষ্ট্র মেরামতের ধারণাপত্র

৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটেছে। সারা দেশের মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনায় এক নতুন ধারার স্বপ্ন দেখছে। প্রাথমিকভাবে সারা দেশের আবালবৃদ্ধাবনিতা একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন প্রত্যাশা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী সরকারকে ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মেরামতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ তুলে ধরাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। এখানে প্রাসঙ্গিক কিছু প্রেক্ষাপট আলোচনা, রাষ্ট্র মেরামতের মূল দর্শন ও কৌশলগত স্তরসমূহ সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি সরকার গঠনের প্রথম ১০০ কার্যদিবসে করনীয়র একটি গাইডলাইন উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে। 

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই এ ভূখণ্ডে রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের একটি দূরত্বপূর্ণ ও বৈরী সম্পর্কের সূচনা হয়। রাষ্ট্রকে জনগণের কল্যাণের বাহন নয়, বরং শোষণ ও দমনমূলক শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। দুঃখজনকভাবে স্বাধীনতার পরও এই মানসিকতার পূর্ণ সংশোধন ঘটেনি; বরং সময়ের সাথে সাথে তা নতুন ভাষা, নতুন স্লোগান ও নতুন কৌশলে আরও বিস্তৃত হয়েছে।

‘মানি না, মানবো না’, ‘জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’—এ ধরনের স্লোগান, দেয়াল লিখন ও আচরণ জনগণের মনে রাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। এর ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি অবজ্ঞা এবং রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ অনেকের কাছে ব্যক্তিগত বিজয়ের অনুভূতিতে রূপ নিয়েছে। জনগণকে সচেতনভাবে কিংবা অচেতনভাবে এই মৌলিক সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে যে—রাষ্ট্র মানেই জনগণ, আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ মানেই জনগণের সম্মিলিত সম্পদ।

এই সংকটের সাথে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্ত হয়েছে আরও গভীর ও বিপজ্জনক একটি প্রবণতা—নৈতিকতা, শালীনতা ও শ্রদ্ধাবোধের অবক্ষয়। জ্ঞানী-গুণীদের প্রতি অবমাননা, কটূক্তি, গালাগাল, অশ্রাব্য ভাষা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ এবং ব্যক্তি-কেন্দ্রিক স্বার্থপর চিন্তা সমাজকে ক্রমশ একটি দায়িত্বহীন ও অসভ্য জনগোষ্ঠীতে পরিণত করছে। ‘আমার কী লাভ’ বা ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’—এই মানসিকতা সামগ্রিক কল্যাণ, টেকসই উন্নয়ন ও প্রকৃত জনস্বার্থমূলক উদ্যোগকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে প্রয়োজনভিত্তিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ছে, আর অগ্রাধিকার পাচ্ছে কমিশননির্ভর, বাহুল্যপূর্ণ তথাকথিত মেগা প্রকল্প।

এই বাস্তবতায় স্পষ্ট, রাষ্ট্র মেরামত কেবল অবকাঠামোগত বা প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয় নয়; বরং এটি একটি মানসিক, নৈতিক ও চেতনাগত পুনর্গঠনের সামগ্রিক প্রকল্প। চলমান এই অস্বস্তিকর অবস্থার উত্তরণ ঘটাতেই হবে। মানসিক চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ জাগ্রত করতেই হবে। মানুষের কল্যাণে ‘সাদকায়ে জারিয়ার’ অংশ হিসাবে কাজ করার মননশীলতা তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্র, রাষ্ট্রযন্ত্রকে এগিয়ে আসতে হবে সর্বাগ্রে।  এর জন্য আমাদের স্বল্প, মাঝারি ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই লেখা তারই কিছু ধারণা দেওয়ার প্রয়াস মাত্র।

রাষ্ট্র মেরামতের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি মৌলিক দর্শনের ওপর—
এক. রাষ্ট্র জনগণের প্রতিপক্ষ নয়, জনগণেরই সম্প্রসারিত রূপ
ইসলাম রাষ্ট্রকে শোষণের যন্ত্র নয়, বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে দেখে। সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ন্যায়বিচারে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও—যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হয়।’ — (সুরা নিসা : ১৩৫)
গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছেন: ‘The state exists not merely to live, but to live well.’
ইসলাম এই ধারণাকে আরও উচ্চতর স্তরে উন্নীত করে বলে—রাষ্ট্র মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণের মাধ্যম।

দুই. রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ‘ক্ষমতা’ নয়, ‘আমানত’
কুর’আন বলছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে।’ — (সুরা নিসা : ৫৮)। এই প্রসঙ্গে আল্লাহর রসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।’ — (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রকে legitimate authority বলেছেন। ইসলাম এর সাথে যোগ করে—নৈতিক ও জবাবদিহিমূলক কর্তৃত্ব।

তিন. জনকল্যাণমূলক কাজ: সাদকায়ে জারিয়ার আধুনিক রূপ
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানুষের কল্যাণের নিয়তে পরিচালিত হয়, তবে তা ব্যক্তিগত সাদকায়ে জারিয়ার মতোই স্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনবে। 

চার. নৈতিকতা ও শালীনতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়, ইহসান ও আত্মীয়কে দান করার নির্দেশ দেন।’ — (সুরা নাহল: ৯০)
নৈতিক ভিত্তি ছাড়া উন্নয়ন কেবল বাহ্যিক চাকচিক্য—ভিতরে তা ভঙ্গুর।

পাঁচ. পারিবারিক অনুশাসন ও বন্ধন সমাজ তথা রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ধাপ
‘হে ইমানদারগণ, তোমরা তোমাদের নিজেদের ও নিজ পরিবারকে জাহান্নামের আগুন হতে বাঁচাও যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’ — (সুরা তাহরিম : ৬)
চিন্তা করে দেখুন, আমরা সবাই যদি নিজেকে আর নিজ পরিবারকে পরকালের শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য সচেষ্ট থাকি তবে প্রতিটি পারিবারিক বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে, গড়ে তোলবে পারিবারিক সহমর্মীতা সম্পন্ন একটি মানবিক সমাজ যা প্রকারান্তরে তৈরি করবে কল্যাণ রাষ্ট্রের শক্ত ভিত। 

রাষ্ট্র মেরামতের কৌশলগত স্তরসমূহকে তিনটি ভাগে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে-
প্রথমত. স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা (১–২ বছর):
ক. রাষ্ট্র–জনগণ সম্পর্ক পুনর্গঠন:
‘আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ — (সুরা রা‘দ : ১১)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’আলার এই নির্দেশনাকে অন্তরে ধারণ ও করণীয় নির্ধারন করতে হবে। 
•    ‘রাষ্ট্র মানেই আমি’—এই ধারণা গণমাধ্যম ও শিক্ষা কারিকুলামে প্রতিষ্ঠাকরণ
•    রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষাকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন
খ. ভাষা ও আচরণে শালীনতা প্রতিষ্ঠা:
‘মানুষের সঙ্গে সুন্দর কথা বলো।’ — (সুরা বাকারা : ৮৩) । আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’আলার এই নির্দেশনার আলোকে-
•    রাজনৈতিক ভাষা ও মিডিয়ায় শালীনতার নৈতিক মানদণ্ড স্থাপন করতে হবে
•    অশালীন ভাষা ও বক্তব্যকে ‘অসভ্যতা’ আখ্যা দিয়ে তা বন্ধ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে আইনপ্রণয়ন 
গ. তাৎক্ষণিক জবাবদিহি ও দৃশ্যমান জনকল্যাণ:
•    রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দ্রুত জবাবদিহি
•    ছোট কিন্তু অর্থবহ জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে অগ্রাধিকার

দ্বিতীয়ত. মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা (৩–৫ বছর) :
এক. মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা সংস্কার: ‘তিনি তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।’ — (সূরা জুমু‘আ: ২) । কুর’আন, সুন্নাহ’র আলোকে শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা, নাগরিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রচিন্তা অন্তর্ভুক্তকরণ।
দুই. জ্ঞানী-গুণীদের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠা: ‘যারা জানে আর যারা জানে না—তারা কি সমান?’(সুরা জুমার: ৯) । সমাজের জ্ঞানী-গুনীদের সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আলেম, শিক্ষক ও চিন্তাবিদদের নীতিনির্ধারণে অন্তর্ভুক্তিকরণ। 
তিন. উন্নয়ন দর্শনের সংশোধন:
•    প্রয়োজনভিত্তিক ও মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন
•    ‘জনকল্যাণ সূচক’ বাধ্যতামূলক

তৃতীয়ত. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা (৫–১৫ বছর):
ক. নৈতিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠা:
•    আমানতদারি ও তাকওয়াভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা (Just and Equality based state)
•    ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
খ. নাগরিককে রাষ্ট্রের অংশীদার করা: মদিনা সনদের আলোকে স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটিভিত্তিক অংশগ্রহণ সুনিশ্চিতকরণ
গ. প্রজন্মগত মানসিক রূপান্তর : ব্যক্তি-কেন্দ্রিক স্বার্থপরতা থেকে সামষ্টিক কল্যাণের দর্শন

ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১০০ কার্যদিবস একটি সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন। এই ১০০ কার্যদিবসের কার্যক্রম, সরকার সম্পর্কে জনগনের মনে একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি করবে। তাই এই সময়ে সবচেয়ে বেশি জনদূর্ভোগ সম্পন্ন বিষয়াদির দ্রুত একটা আপদকালীন সমাধান এবং পাশাপাশি একটি স্বল্প ও মাঝারি মেয়াদি পরিকল্পনা জনগনের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এই কর্মসূচিগুলো জনকল্যাণে রাষ্ট্রের সদিচ্ছার দৃশ্যমান বার্তা বহন করবে।

এক. পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা অভিযান : নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল, সাধারণ জনগন এবং বিশেষ করে দলীয় সকলকে প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে নিজ নিজ এলাকার সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত, বেসরকারি অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, মাদরসা, মার্কেট, বাজার, দোকানপাট, রাস্তাঘাট, অলিগলি ধুলাবালি ও আবর্জনামুক্ত করার কাজে অংশ নেয়া। ৩০ দিন পর সকল এলাকা পরিদর্শন করে ভালো কাজের পুরস্কার, অবহেলায় সামাজিক জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা। 

দুই. ফুটপাত ও রাস্তা অবৈধ দখলমুক্তকরণঃ জনগণের চলাচলের অধিকার নিশ্চিতকরণে সাধারণ জনগন এবং বিশেষ করে দলীয় সকলকে প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে নিজ নিজ এলাকার সকল রাস্তাঘাট, ফুটপাত, অলিগলি থেকে অবৈধ স্থাপনা তুলে দিয়ে জনগনের চলাচলকে স্বাচ্ছন্দ্য ও সহজ করার কাজে অংশ নেয়া। ৩০ দিন পর সকল এলাকা পরিদর্শন করে ভালো কাজের পুরস্কার, অবহেলায় সামাজিক জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা। 

তিন. ট্রাফিক শৃঙ্খলা ও আইন মান্যতার সংস্কৃতি : রেজিস্ট্রেশনবিহীন, যথাযথ ফিটনেসবিহীন এবং অননুমোদিত যানবাহন, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, স্টপেজ, ইচ্ছেমতো লেন ব্যবহার ও পরিবর্তন ইত্যাদিতে ভেঙেপড়া ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সামগ্রিকভাবে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। মনে রাখতে হবে, বর্তমান এই ট্রাফিক জ্যাম আমাদের অনেক শ্রম-ঘণ্টাই শুধু কেড়ে নিচ্ছে না, সাথে সাথে অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়িয়ে দেশের জ্বালানি তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে বায়ুদূষণ ও ব্যক্তগত খরচ। প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে হবে।     

চার. ভাঙাচোরা রাস্তা ও অবকাঠামোর জরুরি মেরামতঃ প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি বড় প্রকল্পসমূহ এক বছরের জন্য থামিয়ে সারা দেশের সকল ভাঙাচোরা রাস্তা, ব্রীজ, কালভার্ট, ফুটপাত ইত্যাদি জরুরি ভিত্তিতে প্রথম ১০০ কার্যদিবসের মধ্যেই শেষ করে সকল রাস্তাঘাট চলাচল উপযোগি করে দিতে হবে। 

পাঁচ. চাঁদাবাজি বন্ধ করা : সারাদেশে বিশেষ করে পন্যবাহি যানবাহন, সকল্ধরনের স্টেশন, রাস্তাঘাট, পাড়ামহল্লা থেকে চাঁদাবাজি সমূলে নির্মুল করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যে কোন ধরনের চাঁবাজদের উত্থান বন্ধ করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কাজে সাধারণ জনগন এবং বিশেষ করে দলীয় সকল স্তরের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সারাদেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে।

ছয়. মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স : সারাদেশে মাদকের ক্রয়-বিক্রয়, লেনদেন, ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সকল বর্ডারে মাদকের অনুপ্রবেশ যেকোন মূল্যে বন্ধ করতে হবে। এই কাজে সাধারণ জনগন এবং বিশেষ করে দলীয় সকল স্তরের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সারাদেশে ‘মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ ক্যাম্পেইন এবং মাদকের লেনদেন ও ব্যবহার বন্ধ করতেই হবে। 

সাত. দূর্নীতি বন্ধে কার্যকরি উদ্যোগ : দুর্নীতি বন্ধে সকল সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে বিগত ১৬ বছরের দুর্নীতির শ্বেতপত্র তৈরি, প্রকাশ ও তা বন্ধে যুগপোযোগি ও কার্যকরি ব্যবস্থার সুপারিশনামা মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসির জন্য উপস্থাপন করতে হবে। দ্রুত ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ ও শক্তহাতে তা প্রয়োগের মাধ্যমে দেশ থেকে দূর্নীতি নির্মূলে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। 

আট. প্রতিটি ক্ষেত্রে কল্যাণ রাষ্ট্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রূপরেখা প্রণয়ন। 

নয়. যুগোপযোগি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরির কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহণ করা।

দশ. সমাজের প্রতিটি স্তরে ‘আল্লাহর উপর আস্থা’, ‘রসুলের (সা.) সুন্নাহ থেকে দিকনির্দেশনা’ ‘পরকালের জবাবদিহিতা’ এবং ‘ সর্বক্ষেত্রে কথায় ও কাজে সততা’ স্থাপন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা।

রাষ্ট্র মেরামত কোনো একক সরকার বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি একটি সমষ্টিগত নৈতিক পুনর্জাগরণ। রাষ্ট্রকে আগে এগিয়ে আসতে হবে, কারণ রাষ্ট্রই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

‘নিয়তের ওপরই সমস্ত কাজ নির্ভরশীল।’ — (সহিহ বুখারি)

রাষ্ট্র যদি ক্ষমতার বদলে খিদমাহ, উন্নয়নের বদলে কল্যাণ এবং প্রকল্পের বদলে সাদকায়ে জারিয়ার নিয়তে কাজ করে—
তবে ইন শা আল্লাহ, একটি নৈতিক, মানবিক ও টেকসই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন সম্ভব।

(লেখক : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা। বর্তমানে একটি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত) 
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow