রুপালি পর্দায় আকাশ হকের ‘ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমে ৪০ জনের সঙ্গে বসবাস, পরে এক কক্ষে ২০০ শিক্ষার্থীর গাদাগাদি—এ অভিজ্ঞতাই বদলে দেয় আকাশ হকের জীবন। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের অমানবিক আবাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে যে সিনেমার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন ২০১৫ সালে, তার বাস্তব রূপ মিলেছে এক দশক পর। ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়েছে তার নির্মিত সিনেমা ‘ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’। ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্যার এ এফ রহমান হলে উঠেছিলেন আকাশ হক। শুরুতেই থাকতে হয় হলের গণরুমে। প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। পরে বিজয় একাত্তর হলে স্থানান্তরিত হয়ে দেখেন, একটি কক্ষে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর অবস্থান—যা তার কাছে জেলখানার মতো মনে হয়েছিল। আকাশ হক বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকেই ভাবতে থাকি, এ ব্যবস্থার প্রতিবাদ করব। সিনেমা বানাব। ক্যাম্পাসের ভেতরের চিত্র সবার সামনে তুলে ধরব।’ দীর্ঘ ১০ বছর ধরে লালিত সে ভাবনাই গত বছর বাস্তবে রূপ নেয়। গত শুক্রবার জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। ৫০০ আসনের হলে প্র
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমে ৪০ জনের সঙ্গে বসবাস, পরে এক কক্ষে ২০০ শিক্ষার্থীর গাদাগাদি—এ অভিজ্ঞতাই বদলে দেয় আকাশ হকের জীবন। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের অমানবিক আবাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে যে সিনেমার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন ২০১৫ সালে, তার বাস্তব রূপ মিলেছে এক দশক পর। ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়েছে তার নির্মিত সিনেমা ‘ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’।
২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে স্যার এ এফ রহমান হলে উঠেছিলেন আকাশ হক। শুরুতেই থাকতে হয় হলের গণরুমে। প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। পরে বিজয় একাত্তর হলে স্থানান্তরিত হয়ে দেখেন, একটি কক্ষে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর অবস্থান—যা তার কাছে জেলখানার মতো মনে হয়েছিল।
আকাশ হক বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকেই ভাবতে থাকি, এ ব্যবস্থার প্রতিবাদ করব। সিনেমা বানাব। ক্যাম্পাসের ভেতরের চিত্র সবার সামনে তুলে ধরব।’
দীর্ঘ ১০ বছর ধরে লালিত সে ভাবনাই গত বছর বাস্তবে রূপ নেয়। গত শুক্রবার জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। ৫০০ আসনের হলে প্রায় ৮০০ দর্শকের উপস্থিতি প্রমাণ করে সিনেমাটি ঘিরে আগ্রহ। আসন না পেয়ে অনেকেই চলাচলের জায়গায় বসে সিনেমা দেখেন, জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ ফিরে যান।
প্রিমিয়ারের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আকাশ বলেন, ‘আমি পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দর্শকের ভিড়ে একসময় ঠেলাঠেলিতে বাইরে চলে যেতে হয়। বাইরে দাঁড়িয়ে শুনছিলাম—কয়েকজন বলছিলেন, ভালো না লাগলে ১০-১৫ মিনিট দেখেই চলে যাব। কিন্তু সিনেমা শেষ হওয়ার আগে একজন দর্শকও উঠে যাননি।’
গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে কথা হয় আকাশ হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গণরুম সম্পর্কে কিছুটা জানতাম। কিন্তু স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীকে এত মানবেতরভাবে থাকতে হবে—এটা কল্পনাই করিনি। যে বিশ্ববিদ্যালয় স্বপ্ন দেখায়, তার সবকিছুই তো স্বপ্নের মতো হওয়া উচিত।’
সিনেমাটিতে গণরুমের বাস্তবতার পাশাপাশি উঠে এসেছে ছাত্ররাজনীতি, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, হলের খাবারের মান ও ক্যাম্পাসের সামগ্রিক পরিবেশ। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের চোখে কেমন হওয়া উচিত একটি আদর্শ ক্যাম্পাস—সেই ছবিও তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের প্রতিটি অংশই নির্মাতার নিজের দেখা ও অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে।
সিনেমার পরিকল্পনার মধ্যেই আকাশ হক মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করতে ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। সেখানে রাজনীতিমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ তাকে আরও নাড়া দেয়। পড়াশোনার ফাঁকে চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ চালিয়ে যান। দেশে ফিরে ২০২৪ সালে শুরু করেন সিনেমার শুটিং।
বড় কোনো প্রযোজক বা বাজেট ছাড়াই সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন আকাশ। পেশাদার শিল্পী না পেয়ে ক্যাম্পাসের পরিচিত বড় ভাই ও ছোট ভাইদের মধ্য থেকেই অভিনয়শিল্পী নির্বাচন করেন। একটি ক্যামেরা ও একটি লেন্স দিয়েই শুরু হয় শুটিং। পুরো সিনেমা শুট করা হয়েছে প্রাকৃতিক আলোয়, কোথাও কোথাও ব্যবহার করা হয়েছে একটি বা দুটি বৈদ্যুতিক বাল্ব। মেকআপের প্রয়োজন পড়েনি।
শুটিং শেষে আসে আরেক চ্যালেঞ্জ—এডিটিং, ডাবিং ও মিউজিক। অর্থের অভাব থাকলেও থেমে যাননি আকাশ। নিজেরাই তৈরি করেন শব্দরোধী কক্ষ। জানালা ও শব্দ ঢোকার সম্ভাব্য জায়গা লেপ-কম্বল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। ভয়েস রেকর্ডিংয়ের জন্য বানানো হয় একটি বিশেষ বাক্স, সেখানেই সম্পন্ন হয় ডাবিংয়ের কাজ।
সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া নির্মাতাকে আশাবাদী করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রুপে সিনেমাটি দেখে আরমান রহমান নামের এক দর্শক লেখেন, ‘এই সিনেমায় সময়ের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কাছে ক্যাম্পাস স্বপ্নের মতোই হওয়া উচিত।’
অনেক শিক্ষার্থী জায়গার স্বল্পতার কারণে সিনেমাটি দেখতে না পারার আক্ষেপ জানিয়েছেন। আবার কবে সিনেমাটি দেখা যাবে—সে প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। নির্মাতা জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় শিগগির সিনেমাটি মুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে।
সিনেমাটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেবদ্যুতি আইচ, রকি খান, ববি বিশ্বাস, আখতারুজ্জামান আজাদ, আবু সায়েদ, ইফাদ হাসান ও নিলয় বালা।
What's Your Reaction?