রেলওয়ে টিকিট কারসাজিতে সিন্ডিকেটের ছায়া

রেলওয়েতে টিকিট কারসাজিতে সিন্ডিকেটের ছায়া পড়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি রেল কর্তারাও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যার অনেকগুলোর তদন্ত করছে দুদক। এরই ধারাবাহিকতায় দুদকের অভিযোগের তদন্তের একটি চিঠিও দেওয়া হয়েছে কক্সবাজারের স্টেশন মাস্টার গোলাম রব্বানীকে। কক্সবাজার স্টেশন উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৩ সালের পর থেকেই প্রায় আড়াই বছর ধরেই বহাল তবিয়তে রয়েছে এ রব্বানী। অদৃশ্য কারণে, বদলির আওয়াজ উঠলেই শক্তিশালী তদবিরে আবারও থেমে যায়। তবে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রেলমন্ত্রী অনিয়ম দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, দুদকের চিঠি ছাড়াও স্টেশন মাস্টার কক্সবাজার স্টেশনে নিয়ম না থাকলেও রানিং স্টাফ রুমে রাত্রিযাপন করেন। কক্সবাজার ভ্রমণে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের ভ্রমণবিলাসের সুযোগ সুবিধাও দিয়ে আসেন, যার কারণে বিভিন্ন স্টেশনে অনেকেই বদলি হলেও অদৃশ্য কারণে তাকে বদলি করা হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তদবির করে এই স্টেশনে আসার পর নতুন করে জামায়াত বিএনপির কানেকশনে থেকে যাওয়ার চেষ্টাও করছেন তিনি। জানা গেছে, চট্টগ্রামের কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনে টিক

রেলওয়ে টিকিট কারসাজিতে সিন্ডিকেটের ছায়া
রেলওয়েতে টিকিট কারসাজিতে সিন্ডিকেটের ছায়া পড়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি রেল কর্তারাও জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যার অনেকগুলোর তদন্ত করছে দুদক। এরই ধারাবাহিকতায় দুদকের অভিযোগের তদন্তের একটি চিঠিও দেওয়া হয়েছে কক্সবাজারের স্টেশন মাস্টার গোলাম রব্বানীকে। কক্সবাজার স্টেশন উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৩ সালের পর থেকেই প্রায় আড়াই বছর ধরেই বহাল তবিয়তে রয়েছে এ রব্বানী। অদৃশ্য কারণে, বদলির আওয়াজ উঠলেই শক্তিশালী তদবিরে আবারও থেমে যায়। তবে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রেলমন্ত্রী অনিয়ম দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, দুদকের চিঠি ছাড়াও স্টেশন মাস্টার কক্সবাজার স্টেশনে নিয়ম না থাকলেও রানিং স্টাফ রুমে রাত্রিযাপন করেন। কক্সবাজার ভ্রমণে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের ভ্রমণবিলাসের সুযোগ সুবিধাও দিয়ে আসেন, যার কারণে বিভিন্ন স্টেশনে অনেকেই বদলি হলেও অদৃশ্য কারণে তাকে বদলি করা হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তদবির করে এই স্টেশনে আসার পর নতুন করে জামায়াত বিএনপির কানেকশনে থেকে যাওয়ার চেষ্টাও করছেন তিনি। জানা গেছে, চট্টগ্রামের কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট কালোবাজারি ও বিক্রয় ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগ অবশেষে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের মুখে পড়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযোগটির প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ে মাঠে নেমেছে এবং এ লক্ষ্যে কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের একটি এনফোর্সমেন্ট টিম গঠন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র তলব করে সরেজমিন তদন্ত শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দুদকের উপসহকারী পরিচালক ও টিম সদস্য মুহাম্মদ হুমায়ুন বিন আহমদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি গত ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি করা হয়। চিঠিটি সরাসরি প্রেরণ করা হয়েছে কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর কাছে। এতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিস্তৃত রেকর্ডপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। দুদকের এ পদক্ষেপকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে কক্সবাজার রেলস্টেশনের বহুল আলোচিত টিকিট সিন্ডিকেট এবং দীর্ঘদিনের অভিযোগের স্তরভিত্তিক চিত্র। দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে এ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কক্সবাজার রেলস্টেশনে অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমে টিকিট বিক্রয়ে অসঙ্গতি রয়েছে এবং নির্দিষ্ট কোটা ব্যবস্থার অপব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে টিকিট কালোবাজারি চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাধারণ যাত্রীরা নির্ধারিত দামে টিকিট না পেলেও একই টিকিট পরবর্তীতে অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। দুদকের চিঠিতে তদন্তের স্বার্থে যেসব নথি চাওয়া হয়েছে, তার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। গত ১ জানুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিক্রিত সব টিকিটের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, অনলাইন ও অফলাইন বিক্রয়ের পৃথক তথ্য, ঢাকা-কক্সবাজার ও কক্সবাজার-ঢাকা এবং চট্টগ্রাম রুটের টিকিট ডেটা, স্টেশনভিত্তিক টিকিট বিক্রয় রেজিস্টার, কাউন্টারভিত্তিক বিক্রয় বিবরণী, ট্রেনভিত্তিক সিট অ্যালোকেশন রিপোর্ট, বাতিল ও রিফান্ড রেকর্ড, কোটা টিকিট বরাদ্দ তালিকা, স্টাফ আইডি ও সিস্টেম এক্সেস পারমিশনসহ প্রশাসনিক নথি— সবই জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিউটি রোস্টার, শিফটভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন এবং ছুটির রেকর্ডও চাওয়া হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, এসব নথি বিশ্লেষণের মাধ্যমে টিকিট ব্যবস্থাপনায় কারা কোনো পর্যায়ে দায়িত্বে ছিলেন, কারা সিস্টেমে প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন এবং কীভাবে টিকেট বরাদ্দ ও বিক্রয় হয়েছে— তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল টিকিটিং সিস্টেমের সার্ভার ডেটা ও লগ যাচাই করে প্রকৃত বিক্রয় তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। স্টেশন মাস্টার মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন উদ্বোধনের পর থেকেই তিনি এ স্টেশনে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রভাব বজায় রেখে তিনি এখনো দায়িত্বে বহাল রয়েছেন বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে পরিচিতজনদের জন্য হোটেল বুকিংয়ের ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাজে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে থাকলেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকায় প্রশাসনিক জবাবদিহি ও তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই হলে পুরো বিষয়টির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। অভিযোগ প্রসঙ্গে গোলাম রব্বানী কালবেলাকে বলেন, তদন্ত চলমান। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে, সেটিও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্তেই তা বেরিয়ে আসবে। রানিং স্টাফ রুমে নিয়মিত অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, স্টাফদের রুম খালি থাকায় একটি রুম ব্যবহার করি। তবে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি। এই অনুসন্ধান নতুন কিছু নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভিযোগের ধারাবাহিকতায় এটি সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কক্সবাজার রেলস্টেশন চালুর পর থেকেই টিকিট সংকট ও কালোবাজারির অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ২০২৩ সালের শেষদিকে কক্সবাজার এক্সপ্রেস চালুর পর প্রথম থেকেই টিকিটের অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়। যাত্রীরা নিয়মিত অভিযোগ করে আসছিলেন যে, অনলাইন কিংবা কাউন্টার কোনো মাধ্যমেই টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ একই টিকিট পরে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কক্সবাজার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা গ্রহণ করে এবং তদন্তের দায়িত্ব দেয় র‍্যাব-১৫-কে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র টিকিট সংগ্রহ করে কালোবাজারে বিক্রি করছে, যা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে। তবে সেই তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার অভিযোগে বুকিং সহকারী ইব্রাত হোসেনকে ফেনীর হাসানপুর রেলস্টেশনে বদলি করা হয়। বিষয়টি তখন গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেন স্টেশন মাস্টার গোলাম রব্বানী নিজেই। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অন্যদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে। স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী যাত্রী এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, টিকিট বুকিং কাউন্টারের কিছু কর্মচারী একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, কাউন্টারে টিকিট ‘ব্লক’ দেখিয়ে পরে তা কালোবাজারিদের কাছে সরবরাহ করা হয়। যাত্রীরা টিকিট না পেয়ে ফিরে গেলে সেই টিকিট দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি করা হয়। এতে প্রতিদিন বড় অঙ্কের অর্থ হাতবদল হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজার-ঢাকা ও কক্সবাজার-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী চলাচল করছেন, যাদের বড় একটি অংশ পর্যটক। উচ্চ চাহিদার এই রুটকে কেন্দ্র করেই টিকিট সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ যাত্রীরা নিয়মিত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম শিগ্‌গিরই সরেজমিনে তদন্ত শুরু করবে বলে জানা গেছে। তদন্ত শেষে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জমা দেওয়া হবে এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। কক্সবাজার রেলস্টেশনের টিকিট কালোবাজারি ইস্যুতে এই অনুসন্ধানকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন কালবেলাকে বলেন, বিষয়টা শুনেছি। নিয়মতান্ত্রিকভাবে যেটা করার সেটা রেল প্রশাসন করবে। তাছাড়া অনিয়ম দুর্নীতি ইস্যুতে জিরো টলারেন্স রয়েছে। এতে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow