লাফায়েতে স্ট্রবেরি পিকিং: যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পর্যটনের অনন্য অভিজ্ঞতা
গ্রীষ্মের উজ্জ্বল দুপুর। ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক একটা ছুঁয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লাফায়েত শহরের উপকণ্ঠে বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরের মাঝে অবস্থিত একটি স্ট্রবেরি খামারের দিকে আমাদের যাত্রা। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে গাড়ি যখন গ্রামীণ সড়ক ধরে এগিয়ে চলছিল; তখন দুপাশে চোখে পড়ছিল সুবিশাল ভুট্টাক্ষেত, সয়াবিনের সবুজ সমারোহ এবং পরিচ্ছন্ন কৃষিজমি। মনে হচ্ছিল, আধুনিক আমেরিকার শিল্প ও প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি আমেরিকা, যার প্রাণস্পন্দন কৃষির মাটিতে। খামারের প্রবেশপথে পৌঁছাতেই দেখা গেল নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য গাড়ি। পরিবার, বন্ধু ও শিশুদের প্রাণচঞ্চল উপস্থিতি জানিয়ে দিচ্ছিল যে স্ট্রবেরি মৌসুম এখানে বিশেষ উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। ক্ষেতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল সারি সারি স্ট্রবেরি গাছ। যতদূর দৃষ্টি যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে টুকটুকে লাল ফল। দূর থেকে মনে হচ্ছিল যেন সবুজ গালিচার ওপর ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য লাল মুক্তা। স্ট্রবেরি মূলত নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার ফল। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্ট্রবেরি উৎপাদনকারী দেশ। যদিও ক্যা
গ্রীষ্মের উজ্জ্বল দুপুর। ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক একটা ছুঁয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লাফায়েত শহরের উপকণ্ঠে বিস্তৃত সবুজ প্রান্তরের মাঝে অবস্থিত একটি স্ট্রবেরি খামারের দিকে আমাদের যাত্রা। শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে গাড়ি যখন গ্রামীণ সড়ক ধরে এগিয়ে চলছিল; তখন দুপাশে চোখে পড়ছিল সুবিশাল ভুট্টাক্ষেত, সয়াবিনের সবুজ সমারোহ এবং পরিচ্ছন্ন কৃষিজমি। মনে হচ্ছিল, আধুনিক আমেরিকার শিল্প ও প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি আমেরিকা, যার প্রাণস্পন্দন কৃষির মাটিতে। খামারের প্রবেশপথে পৌঁছাতেই দেখা গেল নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য গাড়ি। পরিবার, বন্ধু ও শিশুদের প্রাণচঞ্চল উপস্থিতি জানিয়ে দিচ্ছিল যে স্ট্রবেরি মৌসুম এখানে বিশেষ উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। ক্ষেতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল সারি সারি স্ট্রবেরি গাছ। যতদূর দৃষ্টি যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে টুকটুকে লাল ফল। দূর থেকে মনে হচ্ছিল যেন সবুজ গালিচার ওপর ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য লাল মুক্তা।
স্ট্রবেরি মূলত নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার ফল। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্ট্রবেরি উৎপাদনকারী দেশ। যদিও ক্যালিফোর্নিয়া এই উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয়, তবুও ইন্ডিয়ানা, মিশিগান এবং অন্যান্য মধ্যপশ্চিমাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্ট্রবেরি চাষ হয়। সাধারণত মে মাসের শেষভাগ থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলে স্ট্রবেরি সংগ্রহের মৌসুম থাকে। ফলে সময়টিকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবার খামারে বেড়াতে আসে। যুক্তরাষ্ট্রে স্ট্রবেরি পিকিং একটি জনপ্রিয় কৃষিভিত্তিক বিনোদন, যা সাধারণত মে মাসের শেষভাগ থেকে জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইন্ডিয়ানা, মিশিগান, ওহাইও ও ইলিনয়সহ মধ্যপশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়। খামারগুলো তাদের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৌসুমের খবর প্রকাশ করে।
এই খামারে দর্শনার্থীদের জন্য ছিল ‘ইউ পিক’ ব্যবস্থা। অর্থাৎ ক্রেতারা নিজেরাই ক্ষেত থেকে পছন্দের ফল তুলে নিতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের কৃষিভিত্তিক পর্যটন ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এটি শুধু একটি বিনোদনমূলক কার্যক্রম নয়, বরং কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি কার্যকর উপায়। এর মাধ্যমে মানুষ বুঝতে পারে খাদ্য উৎপাদনের পেছনের শ্রম, সময় এবং যত্নের গল্প।
ফল তোলার সময় সবুজ বোঁটাসহ হালকা মোচড় দিয়ে তুলে নিতে হয়, যাতে গাছের কোনো ক্ষতি না হয়। আমরাও হাতে ঝুড়ি নিয়ে সারি সারি গাছের মাঝখানে হাঁটতে শুরু করলাম। কখনো পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বড় একটি ফল চোখে পড়ছে, কখনো আবার নিচু হয়ে খুঁজে বের করতে হচ্ছে সবচেয়ে পাকা স্ট্রবেরিটিকে। চারদিকে নানা বয়সের মানুষের আনন্দমুখর উপস্থিতি যেন পুরো ক্ষেতটিকে প্রাণবন্ত উৎসবে পরিণত করেছিল। ছোট ছোট শিশুরা লাল টুকটুকে স্ট্রবেরি মুখে পুরে আনন্দে দৌড়াচ্ছে। তাদের হাসি আর উচ্ছ্বাসে চারপাশ আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছিল। আমার ছোট্ট নাতনি বাঁশরীও তার ব্যতিক্রম ছিল না। একের পর এক পাকা স্ট্রবেরি মুখে দিয়ে তার গোলাপি মুখমণ্ডল যেন আরও রক্তিম হয়ে উঠেছিল।
সেই নির্মল আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব সুখ বুঝি এই ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। এদিকে আমার বেয়ান বিউটি মণ্ডল চারদিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘এখানে কি কোনো বাঙালি নেই?’ তার কথা শুনে আমরাও চারপাশে চোখ বোলালাম। কিন্তু সত্যিই, শত শত মানুষের ভিড়েও একজন বাংলা ভাষাভাষী মানুষের দেখা মিলল না। চারদিকে শুধু ইংরেজি কথোপকথন, শিশুদের হাসি আর উৎসবের কোলাহল। মুহূর্তেই মনে হলো, প্রবাসে মানুষ অজান্তেই খুঁজে ফেরে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি আর পরিচিত মুখের ছায়া। লাল স্ট্রবেরির বিশাল ক্ষেতের মাঝেও যেন হঠাৎ বাংলার মাটির গন্ধ ভেসে এলো। তখন উপলব্ধি করলাম, দেশ থেকে দূরে থাকলে মাতৃভূমির প্রতি টান আরও গভীর হয়ে হৃদয়ের ভেতর নিঃশব্দে বেঁচে থাকে।
প্রতিটি ফল তুলতে তুলতে মনে হচ্ছিল যেন মাটির বুক থেকে ছোট ছোট লাল রত্ন সংগ্রহ করছি। চারদিকে শিশুদের হাসি, পরিবারের উচ্ছ্বাস আর পাকা ফলের মিষ্টি সুবাস মিলেমিশে দুপুরটিকে করে তুলেছিল অনন্য, আনন্দময় ও স্মরণীয়। গাছের নিচে লুকিয়ে থাকা পাকা ফলগুলো খুঁজে বের করার মধ্যে ছিল এক ধরনের শৈশবের উত্তেজনা। প্রতিটি ফল তুলতে গিয়ে অনুভব করছিলাম প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সংযোগ। সুপার মার্কেটের ঝকঝকে প্যাকেটের ভেতরে থাকা ফলের সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। এখানে প্রতিটি ফল যেন সরাসরি মাটি, রোদ, বৃষ্টি আর কৃষকের পরিশ্রমের গল্প বলে। খামারের পরিবেশ ছিল প্রাণবন্ত। কোথাও ছোট ছোট শিশুরা আনন্দে ফল তুলছে, কোথাও পরিবারগুলো ছবি তুলছে, আবার কেউ কেউ গাছের পাশেই বসে সদ্য তোলা ফলের স্বাদ নিচ্ছে। কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে এমন উৎসবমুখর পরিবেশ আমাদের দেশের গ্রামীণ ফল উৎসবের কথা মনে করিয়ে দিলেও এখানে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও পর্যটনের ছোঁয়া।
স্ট্রবেরি শুধু সুস্বাদু ফলই নয়, এটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে প্রচুর ভিটামিন সি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খাদ্যআঁশ রয়েছে। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে তাই এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। খামারের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ক্রেতারা সরাসরি ক্ষেত থেকে ফল সংগ্রহ করায় পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচ কমে যায়, একই সঙ্গে কৃষকেরাও ন্যায্য মূল্য পান। কৃষির এই মডেল স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এদিকে আমাদের ঝুড়িও ধীরে ধীরে লাল ফলের ভারে পূর্ণ হয়ে উঠছিল। প্রতিটি স্ট্রবেরির উজ্জ্বল রং যেন দুপুরের সূর্যালোককে আরও দীপ্তিময় করে তুলছিল। মাঝেমধ্যে ফল মুখে দিয়ে স্বাদ নিচ্ছিলাম। বাজারের স্ট্রবেরির তুলনায় এর স্বাদ ছিল অনেক বেশি মিষ্টি, রসালো এবং সতেজ। তখন মনে হচ্ছিল, প্রকৃতির কাছ থেকে সরাসরি পাওয়া উপহার সত্যিই অন্যরকম।
ফেরার সময় সংগ্রহ করা স্ট্রবেরির ঝুড়িটি ওজন করে মূল্য নির্ধারণ করা হলো। আমাদের ঝুড়িভর্তি লাল ফলের দাম পড়ল মাত্র ১০ ডলার। বিষয়টি জেনে সবাই বেশ মজা পেলাম। কারণ খামারের নিয়ম অনুযায়ী, ক্ষেতের ভেতরে ঘুরে ঘুরে যে স্ট্রবেরিগুলো আমরা খেয়েছি, তার জন্য কোনো আলাদা মূল্য দিতে হয়নি। সাত সদস্যের আমাদের পরিবার মনের আনন্দে যে পরিমাণ স্ট্রবেরি খেয়েছে, তার হিসাব যদি করা হতো, তাহলে হয়তো ঝুড়ির দামের চেয়েও বেশি হয়ে যেত। এই ছোট্ট বিষয়টিও পুরো অভিজ্ঞতাকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল।
বিকেলের আলো যখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল; তখন আমরা খামার ছাড়ার প্রস্তুতি নিলাম। ফিরে তাকিয়ে শেষবারের মতো দেখলাম লাল আর সবুজের সেই মনোমুগ্ধকর সমারোহ। মনে হলো, এটি শুধু একটি ফল সংগ্রহের অভিজ্ঞতা নয়; বরং আধুনিক কৃষি, প্রকৃতি এবং মানুষের আন্তরিক সম্পর্ককে কাছ থেকে দেখার অনন্য সুযোগ। লাফায়েতের উপকণ্ঠের সেই স্ট্রবেরি খামার থেকে ফেরার পথে মনে হচ্ছিল, সভ্যতার সব অর্জনের মাঝেও মানুষের প্রকৃত আশ্রয় শেষ পর্যন্ত মাটিতেই। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু মাটির গন্ধ, পাকা ফলের স্বাদ এবং কৃষকের ঘামে জন্ম নেওয়া ফসলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আজও মানুষের হৃদয়কে সবচেয়ে গভীরভাবে স্পর্শ করে। সেই বিকেলের স্মৃতি তাই শুধু চোখে দেখা কোনো দৃশ্য নয় বরং প্রকৃতি ও কৃষির প্রতি নতুন করে ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা অনির্বচনীয় অনুভূতি।
- আরও পড়ুন
ইন্ডিয়ানার বিকেল পেরিয়ে আটলান্টার আলোকিত নিশীথে
চন্দ্রজয়ের ইতিহাস আজও জাগ্রত পারডুর বুকে
সেলেরি বগ লেকপাড়ে ফিরে দেখা দুই বছর
ওয়েস্ট লাফায়েতে দশ দিন, যুক্তরাষ্ট্রকে কাছ থেকে দেখা
যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ: বাংলাদেশি গবেষকের হৃদয়বিদারক ঘটনা
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াবাশ নদীর তীরে শান্তির ঠিকানা
এসইউ
What's Your Reaction?