লেবাননের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ইসরায়েল
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বহু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী গাসসান সালামে। সোমবার (২৯ জুন) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী শহর টাইরের একটি প্রাচীন স্তম্ভের শীর্ষের মুকুট উড়ে গেছে। দক্ষিণের আরেকটি শহরে মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ধ্বংস হয়েছে। নাবাতিয়াহ শহরের মামলুক আমলের ঐতিহাসিক বাজারে বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী শতাব্দীপ্রাচীন বহু লেবাননি জনপদ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের প্রায় চার মাসব্যাপী স্থল ও আকাশ অভিযান কেবল ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়েছে। তবে সালামের মতে, বাস্তবে এর ফলে দক্ষিণ লেবাননের অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। কারণ, ইসরায়েলি সেনারা এখনো লেবাননের অভ্যন্তরে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীর একটি অঞ্চল দখল করে রেখেছে, যেখানে লেবাননের কর্মকর্তাদের প্রবে
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বহু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সংস্কৃতিমন্ত্রী গাসসান সালামে।
সোমবার (২৯ জুন) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী শহর টাইরের একটি প্রাচীন স্তম্ভের শীর্ষের মুকুট উড়ে গেছে। দক্ষিণের আরেকটি শহরে মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান ধ্বংস হয়েছে। নাবাতিয়াহ শহরের মামলুক আমলের ঐতিহাসিক বাজারে বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী শতাব্দীপ্রাচীন বহু লেবাননি জনপদ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের প্রায় চার মাসব্যাপী স্থল ও আকাশ অভিযান কেবল ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়েছে। তবে সালামের মতে, বাস্তবে এর ফলে দক্ষিণ লেবাননের অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এক সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। কারণ, ইসরায়েলি সেনারা এখনো লেবাননের অভ্যন্তরে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীর একটি অঞ্চল দখল করে রেখেছে, যেখানে লেবাননের কর্মকর্তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
সালামে বলেন, দখলদারিত্বের মধ্যে থেকে আমরা কাজ করতে পারি না। দখলকৃত এলাকার মধ্যে রয়েছে মধ্যযুগীয় বিউফোর্ট দুর্গ এবং শতাব্দীপ্রাচীন বহু গ্রাম, যেখানে খ্রিস্টান, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানরা বসবাস করতেন। এসব এলাকার উপাসনালয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, এমন অনেক গ্রাম আছে, যেগুলো পুরোপুরি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দখলমুক্ত এলাকাও বিমান হামলা থেকে রেহাই পায়নি। টাইর, নাবাতিয়াহ ও তেবনিন শহরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ হয়েছে। তেবনিনের ক্রুসেড আমলের দুর্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, ঐতিহ্য বলতে শুধু রোমান বা ফিনিশীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বোঝায় না। ঐতিহাসিক ভবন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তারা বেসামরিক অবকাঠামোর অতিরিক্ত ক্ষতি করতে চায় না এবং কেবল সামরিক প্রয়োজনেই হামলা চালায়। একই সঙ্গে উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়।
সেনাবাহিনীর দাবি, সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোর অস্তিত্ব বিবেচনায় নিয়ে কঠোর অনুমোদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযান পরিচালিত হয়। ইসরায়েল অভিযোগ করেছে, হিজবুল্লাহ বিউফোর্ট দুর্গে অস্ত্র সংরক্ষণ করেছিল। তবে লেবাননের কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ফিনিশীয়, বাইজেন্টাইন, মামলুক ও ক্রুসেডারসহ বিভিন্ন সভ্যতার মিলনস্থল বর্তমান লেবানন। এসব সভ্যতার রেখে যাওয়া মন্দির, দুর্গ ও সমাধিসৌধ দেশটির ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো টাইর শহর ও এর রোমান ধ্বংসাবশেষ সেই ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন। একসময় দ্বীপ দুর্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই শহরকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের বাহিনী স্থলভাগের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
বহু সংঘাতের মধ্যেও শহরটি টিকে ছিল। তবে সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর শহরের বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ধুলায় ঢেকে যাওয়া, ভাঙা কাচের গাড়িগুলো এখনো ছড়িয়ে রয়েছে বহু প্রাচীন স্তম্ভের আশপাশে। প্রাচীন নিদর্শনকে রক্ষার জন্য স্থাপন করা প্রতিরক্ষামূলক ব্যারিয়ারও বিস্ফোরণে উড়ে গিয়ে সেই প্রত্নস্থলের ভেতরেই ছিটকে পড়েছে।
লেবাননের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তা আদনান ইস্তানবুলি একটি রোমান মোজাইকচিত্রের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, এখানে যে ক্ষতি হয়েছে, মনে হচ্ছে যেন নিচ থেকে সবকিছু বিস্ফোরিত হয়েছে বা কোনো ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।
টাইরের উপ-মেয়র আলওয়ান শরাফেদ্দিন বলেন, এটি এমন একটি শহর, যেটি আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত থাকার কথা, অন্তত কোনো সংঘাতেই যেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।
গত মাসে ইউনেস্কো এক বিবৃতিতে জানায়, বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত এবং বিশেষ সুরক্ষাপ্রাপ্ত টাইর শহরের সংরক্ষণ পরিস্থিতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের শামা শহরের একটি ঐতিহাসিক দুর্গ এবং বিউফোর্ট দুর্গের আশপাশে সংঘর্ষ ও ক্ষয়ক্ষতির খবরেও সংস্থাটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পদের ওপর বেআইনি হামলার নিন্দা জানায় ইউনেস্কো।
যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছিলেন, লেবানন সীমান্তসংলগ্ন সব ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
সালামের আশঙ্কা, ইসরায়েলের এই অভিযান লেবাননের শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস স্থায়ীভাবে মুছে ফেলতে পারে। এখানে একটি পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। ছোট ছোট জনপদ এবং পুরো শহরগুলোকে ধারাবাহিকভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।
What's Your Reaction?