শত কষ্টেও করেননি ‘ভিক্ষাবৃত্তি’

অপেক্ষার প্রহর শেষে তিন কন্যার পর এক টুকরো চাঁদের স্বপ্ন বুনেছিলেন সুফিয়া বেগম ও আলী হোসেন দম্পতি। তাদের সেই স্বপ্ন নীল আকাশে ডানা মেললো, ঘর আলো করে জন্ম নিল এক পুত্রসন্তান। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন। আনন্দের সেই হিল্লোল মুহূর্তেই থমকে গেল যখন জানা গেল, নবজাতকটি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। সমাজের বাঁকা চোখের সঙ্গে লড়াই করে সেই চাঁদের নাম রাখা হলো ‘শাহ জামাল’। উপকূলীয় এই পরিবারটির শুরু হলো এক অসম লড়াই। একদিকে দারিদ্র্যের করাঘাত, অনাহার-অর্ধাহার আর অসুস্থতা, অন্যদিকে এক বিশেষ শিশুকে নিয়ে যুদ্ধ শুরু হলো। এই যুদ্ধের অন্য নাম-বেঁচে থাকার আকুতি। প্রতিটি দিনই ছিল তাদের জন্য এক নতুন পরীক্ষার নামান্তর। তবুও তারা দমে যাননি। নিজেদের আত্মসম্মানবোধকে বুক দিয়ে আগলে রেখে তারা বুনেছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। বারবার ঝড়ের ঝাপটায় সেই রঙিন স্বপ্নগুলো ফিকে হয়েছে, জীবন হয়েছে ধূলিমলিন-বর্ণহীন। কিন্তু দহনজ্বালা সহ্য করেও তারা থামেননি। প্রতিটি সূর্যাস্তের পর যেমন নতুন ভোরের অপেক্ষা থাকে, তেমনি বারবার ভেঙে যাওয়া জীবনের সন্ধিগুলো তারা নতুন করে সাজিয়েছেন পরম মমতায়। কেমন ছিল সেই গল্পটি? উপকূলীয়

শত কষ্টেও করেননি ‘ভিক্ষাবৃত্তি’

অপেক্ষার প্রহর শেষে তিন কন্যার পর এক টুকরো চাঁদের স্বপ্ন বুনেছিলেন সুফিয়া বেগম ও আলী হোসেন দম্পতি। তাদের সেই স্বপ্ন নীল আকাশে ডানা মেললো, ঘর আলো করে জন্ম নিল এক পুত্রসন্তান। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল ভিন্ন। আনন্দের সেই হিল্লোল মুহূর্তেই থমকে গেল যখন জানা গেল, নবজাতকটি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। সমাজের বাঁকা চোখের সঙ্গে লড়াই করে সেই চাঁদের নাম রাখা হলো ‘শাহ জামাল’।

উপকূলীয় এই পরিবারটির শুরু হলো এক অসম লড়াই। একদিকে দারিদ্র্যের করাঘাত, অনাহার-অর্ধাহার আর অসুস্থতা, অন্যদিকে এক বিশেষ শিশুকে নিয়ে যুদ্ধ শুরু হলো। এই যুদ্ধের অন্য নাম-বেঁচে থাকার আকুতি। প্রতিটি দিনই ছিল তাদের জন্য এক নতুন পরীক্ষার নামান্তর। তবুও তারা দমে যাননি। নিজেদের আত্মসম্মানবোধকে বুক দিয়ে আগলে রেখে তারা বুনেছিলেন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।

বারবার ঝড়ের ঝাপটায় সেই রঙিন স্বপ্নগুলো ফিকে হয়েছে, জীবন হয়েছে ধূলিমলিন-বর্ণহীন। কিন্তু দহনজ্বালা সহ্য করেও তারা থামেননি। প্রতিটি সূর্যাস্তের পর যেমন নতুন ভোরের অপেক্ষা থাকে, তেমনি বারবার ভেঙে যাওয়া জীবনের সন্ধিগুলো তারা নতুন করে সাজিয়েছেন পরম মমতায়। কেমন ছিল সেই গল্পটি?

jagonews

উপকূলীয় জেলা বরগুনা সদরের সুজার খেয়াঘাট আশ্রয়ণ প্রকল্পে বর্তমান বসতি শাহ জামালের। প্রায় ৪০ বছর আগে পেটের তাগিদে গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির রাজাপুর ছেড়ে বরগুনায় এসেছিলেন শাহ জামালের মা-বাবা। বরগুনার একটি সড়কের পাশের সরকারি খাস জমিতে ঝুপড়ি ঘরে কাটছিল ওই পরিবারের অনাহার-অর্ধাহারের দিন-রাত্রি। মানবেতর জীবনের সেই দৃশ্য চোখ কাড়ে তৎকালীন কিছু গণ্যমান্যদের। তাদের সহায়তায় আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল বরগুনার কড়ইতলা সুজার খেয়াঘাট আশ্রয়ণ প্রকল্পে। সেই থেকে তাদের বসত সেখানেই।

তারও আগে, খুব অল্প বয়সেই শাহ জামালের মা সুফিয়া বেগমের বিয়ে হয়েছিল রিকশাচালক আলী হোসেনের সঙ্গে। দাম্পত্য জীবন শুরুর বছর দুয়েক পরেই তাদের ঘরে জন্ম নেয় একটি মেয়ে। তার বছর চারেক পরে জন্ম হয় আরেক মেয়ের। ওই দুই মেয়েই মারা যায়-খিঁচুনি ও ডায়রিয়াতে। এরপর জন্ম হয় তৃতীয় মেয়ে নূর নাহারের। আর নূর নাহারের বয়স যখন চার বছর, ঠিক তখন জন্ম নেয় শাহ জামাল। শাহ জামালের জন্মের পরেই সেখানে উপস্থিত সবাই কেমন চুপ হয়ে গেলেন। কারণ জীবন্ত দেহের ছেলেটির জন্ম হয়েছিল দুটি র্নিজীব-মৃত পা নিয়ে।

একে তো জন্ম হয়েছে দরিদ্র পরিবারে, অপরদিকে নিষ্পাপ হলেও নিষ্প্রাণ দুটি পা। সমাজের নানা কথা-কুকথা, অপমান-বঞ্চনা, করুণা-অবহেলা সয়েই শুরু হয় তার মানব সমাজের পথচলা। এভাবেই কেটে গেছে ৩২টি বছর। এখন সেই শাহ জামাল ৩৩ বছর বয়সের যুবক। জন্ম থেকেই খুঁড়িয়ে চলা সেই শাহ জামাল আজও খুঁড়িয়ে চলে। হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরে, শাহ জামাল এগিয়ে চলে।

তবে এই ৩২ বছরে তিনি হয়ে উঠেছেন এক খণ্ড দর্শন। মা থেকে প্রাপ্য শিক্ষা তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। সেই শিক্ষার নাম, ‘করবে না ভিক্ষা’। প্রতিবন্ধীর প্রতিবন্ধকতা নিয়ে চলাচল ও স্বাভাবিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শাহ জামাল কখনো ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়াননি। আজ তিনি ছোট্ট দোকান করেন, সেখানে চা, বিস্কুট, রুটি-কেকসহ সস্তা খাবার বিক্রি হয়। সেই সস্তার রোজগারেই সন্তুষ্ট হয়ে জীবন কাটান এই যুবক। জীবনযুদ্ধে এভাবেই বেঁচে থাকার চেষ্টা তার।

শাহ জামাল বলেন, ‘ছোট থেকে মানুষের কত কটুকথা শুনেছি, খোঁড়া-ল্যাংড়া বলে উপহাস করেছে কতজনে। এসব বোঝার পর মাঝে মাঝে কষ্ট হতো। নিজেকে তো বটেই পরিবারকে অনেক ছোট মনে হতো। কিন্তু কখনো ছোট হয়ে বাঁচার চেষ্টা করিনি। মায়ের কোল থেকেই জেনে এসেছি, যত কষ্টই হোক ভিক্ষাবৃত্তি ভালো না। মা বলতেন, কখনো ভিক্ষা করবি না। তাই সেই পথে যাইনি, ভিক্ষা করিনি।’

শাহ জামালের মা সুফিয়া বেগম জানান, একে তো অভাবের পরিবার, তার ওপরে প্রতিবন্ধী ছেলে। জন্ম থেকেই ছেলেটার পা নেই। সবাই ওকে ‘লুলা জামাল’ বলে। কিন্তু আমার ছেলে তো আমার কাছে সোনার টুকরা। আমি তো ওকে ফেলতে পারি না।

jagonewsঅভাব অনটনে শুধু চোখের জল না ঝরিয়ে উত্তরণের চেষ্টা থাকা দরকার। আমাদের ইচ্ছাশক্তিই পারে অভাবের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাতে। এমনটাই প্রমাণ করেছেন শাহ জামাল। যিনি নিয়তিকে হার মানিয়েছেন কর্ম ও ইচ্ছাশক্তির কাছে।

শাহ জামালের পোড়া চোখের জবানবন্দি খুঁজতেই, প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে তার পরিবারের পরিস্থিতি। সে গল্পও একটু বলি।কথায় আছে, ‘মরার ওপর খরার ঘা’। তেমন গল্প আছে শাহ জামালের জীবনে। বিগত দুই দশক আগেও শাহ জামালের বাবা আলী হোসেন মিয়া রিকশা চালাতেন। সেই উপার্জনে তাদের সংসার চলত। এরপর হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় আলী হোসেন মিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন। থেমে যায় রোজগারের চাকা। এমন পরিস্থিতিতে অনেকটা বাধ্য হয়েই, পুরোদমে কাজে জড়ান শাহ জামালের মা সুফিয়া। সম্পূর্ণ পরিবারের ঘানি যখন সুফিয়ার কাঁধে ওঠে তখন তার বয়স ৩০ বা ৩২ বছর হবে।

নিজেও অসুস্থ ছিলেন সুফিয়া, তার উপরে কাজের চাপ। অপরদিকে, অসুস্থ নারীর পরিশ্রমের যথাযথ দাম ছিল না। সুফিয়া সারা দিন খেটেও তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে পারতেন না পরিবারের জন্য। ভাতের আশায় প্রতিদিন অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন তিনি। বাসা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ, মাটি কাটার কাজ, মাটির চুলা তৈরির কাজ, অন্যের বাড়ি-ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দেওয়ার কাজ, ধান সেদ্ধ করার কাজ, গবাদি পশু দেখভালের কাজ। হেন পরিশ্রমের কাজ করে জুগিয়েছেন স্বামী সন্তানের আহার।

সে সময়কার স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে সুফিয়া জানালেন, তখন এমনিতেই কাজ পাওয়া যেত না। তার ওপরে, চলাচলে অক্ষম ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কাজে গেলে কেউ কাজে রাখতে চাইত না। ফলে ছেলেটাকে বাসায় রেখে যেতে হতো। আর এ কারণে মেয়েটাকেও লেখাপড়া করাতে পারিনি।

শাহ জামালের বোন নূর নাহারের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর এই ঘরের সদস্য সংখ্যা কমে যায়। চার সদস্যের এই পরিবারে এখন রয়েছে তিনজন। অসুস্থতার কারণে সুফিয়ার স্বামী কোনো ভারি কাজ করতে পারেন না। কাজে অক্ষম হলেও সুফিয়ার স্বামী মাঝেমধ্যে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। এই ঝালমুড়ির আসল কারিগর সুফিয়া। সকালে কাজে যাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় সব কিছুর বন্দোবস্ত করে দিয়ে যেতেন তিনি।

সুফিয়া বলেন, ‘মাঝেমধ্যে মনে পড়ে পরিবারের অভাবের দিন শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ২০ বছরের মধ্যে দিনে বা বিকেলে কখনোই একটু বিছানায় বসতেও পারি নাই। শরীরে জ্বর নিয়েও কাজ করেছি।’

চোখ মুছতে মুছতে সুফিয়া জানান, তার জীবনের কথাগুলো। আগের মতো চোখে দেখতে পান না তিনি। বয়সের কারণে কোমর ও পিঠে ব্যথা বাসা বেঁধেছে। কয়েক বছর আগেও (মেয়ের বিয়ে দেওয়ার আগ অবধি) খুব হতাশার মধ্যে দিন কাটত তার। চলাচলে অক্ষম ছেলেটাও এখন বড় হয়েছে, হুইল চেয়ার নিয়ে নিজেই ঘুরে আসতে পারেন পুরোটা গ্রাম। তাই মায়ের দুশ্চিন্তাও একটু কমেছে। তবু ফেলে আসা সেসব দুর্দিনের স্মৃতি আজও ঠিকমতো ঘুমাতে দেয় না সুফিয়াকে।

আলোচ্য পরিবারটির জীবনযুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখেছেন, বরগুনা সরকারি শিশু পরিবারের শিক্ষিকা সেলিনা পারভিন। এক সময় শাহ জামালের মা ঝিয়ের কাজ করতেন এই শিক্ষিকার ঘরে। তিনি বলেন, ‘মানুষ যে পরিবারের প্রয়োজনে কতটা পরিশ্রম করতে পারে তার প্রমাণ শাহ জামালের পরিবার। কোনো ঘরে কাজের বিনিময়ে একটু ভাত-তরকারি দিলেও শাহ জামালের মা তা নিজে না খেয়ে নিয়ে যেতেন স্বামী-সন্তানের জন্য। এত কষ্ট করে তিনি টিকিয়ে রেখেছেন তার সংসার। তবে এরা কখনোই কোনো খারাপ কাজে জড়াইনি, অসম্মানের পেশায় যায়নি। আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, শুধু পরিশ্রমের মধ্যদিয়ে।’

এটি কেবল এক পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প নয়, বরং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক অদম্য মানবিক সংগ্রামের মহাকাব্য। শাহ জামাল, মা সুফিয়া বেগম কিংবা বাবা আলী হোসেনের বেঁচে থাকার বাস্তবতা ছিল দুঃখগাথা। এত কষ্ট করেও, তারা ছিলেন দর্শনে অবিচল। তাদের দর্শন ছিল, ভিক্ষাবৃত্তিকে না বলা। একটি কষ্টগাথা পারিবারিক জীবন ব্যবস্থায় এমন চিন্তা-চেতনা সত্যি প্রশংসার যোগ্য। তারা যেন জীবন্ত প্রমাণ-জীবনযুদ্ধে হেরে যেতে মানুষের জন্ম নয়। হাল না ছেড়ে, বেঁচে থাকার চেষ্টা করা দরকার। তাদের জীবনধারণ থেকে এই মানবসমাজ শিক্ষা নিতে পারে, ‘মাথা নত না করেও, কঠিন সময়কেও জয় করা সম্ভব-শুধু পরিশ্রম দিয়ে’।

আরও পড়ুন
পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ: ঐতিহ্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্তের পকেট
বৃদ্ধকালে কাঙ্ক্ষিত জীবন: মানুষ আসলে কী চায়?

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow