হিজরি ক্যালেন্ডারের ২৬ রজব দিবাগত রাত পবিত্র শবেমেরাজ। বছরের ১২টি মাসই আল্লাহতায়ালার অশেষ দান আর প্রত্যেকটি মাসই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে পাঁচটি রাত বিশেষ ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র শবেমেরাজ এর অন্যতম। এই রাতে রাসুলের (সা.) জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মোজিজা বা অলৌকিক ঘটনাগুলোর একটি ‘মেরাজ’ সংঘটিত হয়। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের আগে একদিন রাতে রাসুল (সা.) আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঊর্ধ্বাকাশে গমন করেন। ঐতিহাসিক সেই সফরকেই মেরাজ বলা হয়। মেরাজ আরবি শব্দ, শাব্দিক অর্থ ঊর্ধ্বগমন, আকাশপথে ভ্রমণ করা, সোপান ইত্যাদি। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘পবিত্র সত্তা তিনি, যিনি বান্দাকে তার নিদর্শনগুলো দেখানোর জন্য রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশ পবিত্র, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ১)।
মেরাজ বা ঊর্ধ্বজগতের ভ্রমণ সংঘটিত হয় নবীজির নবুওতের ১১তম বছরের ২৭ রজব। তখন নবীজির বয়স ৫১ বছর। নবীজির স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকালের পরে এবং আকাবার শপথের আগে মেরাজের ঘটনা ঘটে। ৬২১ খ্রিষ্টাব্দের (নবুয়তের দ্বাদশ বছরে) হজের সময় নবী মুহাম্মদ (সা.) মিনার কাছে আকাবা উপত্যকায় মদিনার ১২ সদস্যের এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং কিছু বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। মদিনার ওই লোকদের এ শপথ আকাবার প্রথম শপথ নামে পরিচিত। মেরাজের ঘটনার সুনির্দিষ্ট সালের ব্যাপারে কিছুটা মতভেদ থাকলেও ঘটনাটি হিজরতের এক বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে (২৬ তারিখ দিবাগত রাতে) সংঘটিত হয়েছিল এ ব্যাপারে অধিকাংশ ইমাম ও ঐতিহাসিকরা একমত। মেরাজের রাতে আল্লাহতায়ালা তার প্রিয় বান্দা ও রাসুলকে তার একান্ত সান্নিধ্যে নেওয়ার অলৌকিক ব্যবস্থা করেন, তাকে জান্নাত-জাহান্নামসহ অসংখ্য নিদর্শন দেখান, তার সঙ্গে একান্তে কথা বলেন, তার অন্তর নূর, প্রজ্ঞা ও হেকমত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন, মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে তাকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও সুরা বাকারার শেষ তিন আয়াত হাদিয়া প্রদান করা হয়।
মেরাজের ঘটনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন হযরত জিবরাইল (আ.) ও হজরত মিকাইল (আ.)। তারা ওই রাতে উম্মে হানির ঘরে গভীর ঘুমে থাকা নবী মুহাম্মদকে (সা.) পবিত্র কাবা চত্বরে নিয়ে যান। সেখানে তারা নবীকে (সা.) মহাভ্রমণের উপযোগী করার লক্ষ্যে আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় ‘সিনা চাক’ করেন। এরপর তারা তাকে বোরাক নামক দ্রুতগামী বাহনে করে বায়তুল মোকাদ্দাসে নিয়ে যান। সেখানে নবীজি (সা.) অনেক নবীর নামাজের জামাতে ইমামতি করেন। সেখান থেকে বোরাক নামক বিশেষ গতিসম্পন্ন বাহনে শুরু হয় নবীজির ঊর্ধ্বজগতের সফর। জিবরাইল নবীজিকে নিয়ে চললেন। প্রথম আসমানে গিয়ে কড়া নাড়লেন। জিজ্ঞাসা করা হলো, কে? বললেন, জিবরাইল। জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনার সঙ্গে কে? বললেন, মুহাম্মদ। জিজ্ঞাসা করা হলো, তার কাছে কি আপনাকে পাঠানো হয়েছে? বললেন, হ্যাঁ। এরপর নবীজিকে সম্ভাষণ জানানো হলো—মারহাবা, উত্তম আগমনকারীর আগমন ঘটেছে! খুলে দেওয়া হলো নবীজির জন্য আসমানের দরজা। নবীজি প্রথম আসমানে গেলেন। সেখানে ছিলেন হজরত আদম (আ.)। জিবরাইল পরিচয় করিয়ে দিলেন। নবীজি আদমকে সালাম বললেন। বাবা আদম জবাব দিলেন। নবীজিকে সাদর অভিবাদন জানালেন—মারহাবা, নেককার পুত্র ও নেককার নবী। হজরত আদম (আ.) নবীজির জন্য দোয়া করলেন।
তারপর নবীজি উঠতে থাকলেন দ্বিতীয় আসমানের দিকে। সেখানেও দরজা খুলতে প্রথম আসমানের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। এরপর নবীজিকে ইস্তেকবাল করা হলো। নবীজি সেখানে দেখতে পেলেন দুই খালাত ভাই হজরত ইসা (আ.) ও ইয়াহইয়া (আ.)কে। তাদের সঙ্গে নবীজির সালাম বিনিময় হলো। তারা নবীজিকে স্বাগত জানালেন—মারহাবা, আমাদের পুণ্যবান ভাই এবং সজ্জন নবী। তারা নবীজির জন্য দোয়া করলেন। তারপর নবীজিকে তৃতীয় আসমানের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেও দুই আসমানের মতো জিজ্ঞাসাবাদ হলো এবং নবীজিকে স্বাগত জানানো হলো। সেখানে গিয়ে দেখলেন হজরত ইউসুফ (আ.)। হজরত ইউসুফের সঙ্গে নবীজির সালাম ও কুশল বিনিময় হলো। নবীজি (সা.) বলেন, হজরত ইউসুফকে যেন দুনিয়ার অর্ধেক সৌন্দর্য ঢেলে দেওয়া হয়েছে। তারপর চললেন চতুর্থ আসমানের দিকে। সেখানেও আগের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। স্বাগত-সম্মান জানানো হলো। সেখানে হজরত ইদ্রিস (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। সালাম ও কুশল বিনিময় হলো। হজরত ইদ্রিস (আ.) নবীজির জন্য দোয়া করলেন। তারপর চললেন ষষ্ঠ আসমানের দিকে। সেখানেও আগের পর্বগুলোর মতো জিজ্ঞাসা করা হলো। নবীজিকে অভিনন্দন জানানো হলো। সেখানে দেখা হলো হজরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে। হজরত মুসা (আ.) নবীজিকে খুব ইস্তেকবাল করলেন। তারপর নবীজি সপ্তম আসমানের দিকে উঠতে থাকেন। সেখানে দেখা হলো হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে। জিবরাইল (আ.) পরিচয় করিয়ে দিলেন—ইনি আপনার পিতা, সালাম করুন। নবীজি হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সালাম বিনিময় করলেন। নবীজি বলেন, হজরত ইব্রাহিম (আ.) তখন বায়তুল মামুরে হেলান দিয়েছিলেন। বায়তুল মামুর, যেখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা আসে। এরপর এই সত্তর হাজার আর ফিরে আসে না। এভাবে প্রতিদিন সত্তর হাজার করে ফেরেশতার নতুন নতুন কাফেলা আসতে থাকে। তারপর নবীজিকে নিয়ে যাওয়া হলো সিদরাতুল মুনতাহার দিকে। সেই কুল বৃক্ষের একেকটি পাতা হাতির কানের মতো। আর একেকটি ফল মটকার মতো বড় বড়। যখন ওটাকে আল্লাহর বিধান আচ্ছন্ন করে নিল তা পরিবর্তিত হয়ে গেল। সৃষ্টির কারও সাধ্য নেই তার সৌন্দর্যের বিবরণ দেওয়ার। জিবরাইল বললেন, এটা সিদরাতুল মুনতাহা। এখানে চারটি নহর। দুটি অদৃশ্য আর দুটি দৃশ্যমান। নবীজি জিজ্ঞাসা করলেন, দৃশ্যমান নদী দুটি কোনগুলো? জিবরাইল বললেন, অদৃশ্যমান দুটি জান্নাতে। আর দৃশ্যমান দুটি হলো নীল নদ ও ফুরাত নদী। সবশেষে আরও ওপরে উঠে সাক্ষাৎ করেন মহান রবের সঙ্গে। মহান আল্লাহ উম্মতের জন্য উপহার হিসেবে প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ এবং পরে কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ দান করলেন। এর মাধ্যমেই উম্মত মহান রবের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে।
নবীজির মক্কায় বসবাসের জীবনের শেষভাগে আকাবার শপথের আগে সংঘটিত হয়েছিল মেরাজ। সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মেরাজের রয়েছে গভীর যোগসূত্র। কারণ, নবীজির মক্কি জীবনের শেষভাগে কাফেরদের বিরোধিতা তীব্র আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে কাফেররা নবীজির বংশের সঙ্গে সব ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। নবুয়তের সপ্তম বছরের এ অবরোধে আবু তালিব উপত্যকায় কার্যত মুসলমানরা বন্দি হয়ে পড়েন। নবুয়তের দশম বছর নবীজির কষ্টের জীবনসঙ্গী এবং তার অর্থনৈতিক বড় অবলম্বন হজরত খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। এ সময় নবীজির অন্যতম অভিভাবক আবু তালেবও ইন্তেকাল করেন। আবু তালেব মুসলমান না হলেও কাফেরদের অত্যাচারের মুখে সবসময় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতেন। মানসিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবলম্বন হাতছাড়া হওয়ার পর নবীজি ও সাহাবিদের ওপর কাফেরদের অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। মক্কার ভূমি মুসলমানদের জন্য ক্রমান্বয়ে সংকীর্ণ হতে থাকে। এমতাবস্থায় মদিনা থেকে একটি আশার আলো দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু সে আলো ছিল বেশ ক্ষীণ। তখন নবীজি একবুক আশা নিয়ে তায়েফে দাওয়াত দিতে গেলেন। কিন্তু তায়েফবাসী দাওয়াত তো গ্রহণ করলই না, বরং নবীকে মেরে রক্তাক্ত করল। এমন অবস্থায় যখন নবীজির জাগতিক সব অবলম্বন হাতছাড়া, মক্কাবাসীদের ইমান গ্রহণের বিষয়ে আশাহত, গোটা আরব তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ, তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে, চরম দুঃখ-কষ্টে সান্ত্বনা দেওয়া ও আশার বাণী শোনানো স্ত্রীও পরপারে, বংশের অভিভাবকও ইন্তেকাল করেছেন; ঠিক তখন আল্লাহতায়ালা নবীজির সব দুঃখ-কষ্ট ভোলানোর জন্য এবং নবুয়ত-রিসালাতের কঠিন কাজকে আরও সুদৃঢ় করার জন্য তাকে তার পরম সান্নিধ্যে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভে তিনি তৃপ্ত হন, অসংখ্য নিদর্শন দর্শনে তিনি হিকমত ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ হন। আল্লাহর সান্নিধ্যে এসে তিনি একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবিলায় ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা প্রদর্শনের যোগ্যতা অর্জন করেন। মহান আল্লাহর ভালোবাসায় তিনি সবকিছু করার মনোবল অর্জন করেন। মেরাজের পরই আকাবার শপথের মাধ্যমে হিজরতের পটভূমি তৈরি হয়। মেরাজের পর নাজিল হয় মেরাজ সম্পর্কিত বনি ইসরাইল সুরা। এ সুরায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ঐতিহাসিক চৌদ্দ দফা নাজিল হয়। এ নির্দেশিকার আলোকে নবীজি সাহাবিদের গড়ে তোলেন এবং হিজরতের পর একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
লেখক: ইমাম ও খতিব