শিক্ষক যখন অপমানিত, শিক্ষা তখন বিপন্ন
বিভিন্ন সময়ে আমাদের শিক্ষক নির্যাতনের ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকগণ নেতাকর্মী/ক্যাডার ছাড়াও জনপ্রতিনিধি, কমিটির সদস্য, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের দ্বারাই তুলনামূলকভাবে বেশি নির্যাতিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। অথচ এই চারটি গ্রুপই হওয়ার কথা ছিল বেসরকারি শিক্ষকদের সার্বক্ষণিক রক্ষাকবচ। শিক্ষক নির্যাতিত হলে সহানুভূতি নিয়ে সদলবলে এগিয়ে আসার কথা ছিল জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবকদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের তো শিক্ষক নির্যাতন রোধে নৈতিক দায়িত্ব পালন করার কথা। শিক্ষকদের ওপর আঘাত এলে শিক্ষার্থীরা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে রুখে দাঁড়াবে—এমন ধারণা অদূর অতীতেও আমাদের সমাজে বিদ্যমান ছিল। তাই অনেকেই শিক্ষকদের সমীহ করত। কেউ চিন্তাও করত না শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার কথা, গায়ে হাত তোলা তো আরও দূরের বিষয়। অথচ বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন শিক্ষকেরাও। বিভিন্ন সময়ে সরকার বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়ছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণ বা সমর্থন করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পাঠবিমুখ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। কেউ
বিভিন্ন সময়ে আমাদের শিক্ষক নির্যাতনের ক্ষেত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকগণ নেতাকর্মী/ক্যাডার ছাড়াও জনপ্রতিনিধি, কমিটির সদস্য, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের দ্বারাই তুলনামূলকভাবে বেশি নির্যাতিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। অথচ এই চারটি গ্রুপই হওয়ার কথা ছিল বেসরকারি শিক্ষকদের সার্বক্ষণিক রক্ষাকবচ। শিক্ষক নির্যাতিত হলে সহানুভূতি নিয়ে সদলবলে এগিয়ে আসার কথা ছিল জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবকদের।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের তো শিক্ষক নির্যাতন রোধে নৈতিক দায়িত্ব পালন করার কথা। শিক্ষকদের ওপর আঘাত এলে শিক্ষার্থীরা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে রুখে দাঁড়াবে—এমন ধারণা অদূর অতীতেও আমাদের সমাজে বিদ্যমান ছিল। তাই অনেকেই শিক্ষকদের সমীহ করত। কেউ চিন্তাও করত না শিক্ষকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার কথা, গায়ে হাত তোলা তো আরও দূরের বিষয়। অথচ বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন শিক্ষকেরাও।
বিভিন্ন সময়ে সরকার বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব পড়ছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণ বা সমর্থন করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী পাঠবিমুখ ও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ স্বেচ্ছায় বা উসকানিতে সরাসরি অংশ নিচ্ছে বা সমর্থন দিচ্ছে শিক্ষক নির্যাতনে। অপমান-অপদস্ত করে অনেককে বাধ্য করা হচ্ছে পদত্যাগে। এ ধরনের ঘটনার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের অপব্যবহার করা হচ্ছে বলে ধারণা করা যায়।
এর আগে ও পরে শিক্ষককে কান ধরে উঠবস করানো, জনসমক্ষে বিবস্ত্র করা, গলায় জুতার মালা পরানো, জুতা দিয়ে মারধর করা, গাছে বেঁধে রাখা, পিটিয়ে আহত বা নিহত করা—ইত্যাদি অসংখ্য ঘটনা অতীতেও ঘটেছে এবং এখনো ঘটছে; যা সংবাদমাধ্যম, টিভি, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষক নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের মাত্রা এতটা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী এবং এর প্রতিকার কী? দীর্ঘদিনের বিচারহীনতা ও শক্ত প্রতিবাদহীনতা এর প্রধান কারণ হলেও এর বাইরে আরও অনেক কারণ রয়েছে। দিন দিন নির্যাতনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। একজনের দেখাদেখি যুক্ত হচ্ছে অন্যজন, অন্য গ্রুপ বা অন্য দল। আমাদের সমাজে শিক্ষক নির্যাতন যেন এক ধরনের স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, শিক্ষক নির্যাতন ও হত্যায় এখন শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন বাস্তব কারণে শিক্ষার্থীরা আর আগের মতো শিক্ষকদের শ্রদ্ধা করে না। তারা দেখে, এই সমাজ শিক্ষকদের—বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের—যথাযথ রাষ্ট্রীয় সচ্ছলতা ও মর্যাদা দেয় না। তারা আরও দেখে, সরকারি কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, কমিটির সদস্য, নেতাকর্মী, বিত্তবান, বাড়িওয়ালা, দোকানি ও অভিভাবক—কেউই শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান করে না। তাহলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সম্মান শিখবে কোথা থেকে?
এখনই বন্ধ করতে হবে শিক্ষক নির্যাতন। কোনো অবস্থাতেই শিক্ষকের অপমান মেনে নেওয়া যাবে না। শিক্ষকদের মর্যাদার উদাহরণ ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সুপথে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পরিচালনা কমিটির ভূমিকা ও যোগ্যতা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। সমাজের সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। প্রয়োজনে শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
আগের দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান বলতে সবাই হেডস্যার বা প্রিন্সিপাল স্যারকেই বুঝত। কিন্তু এখন অনেকেই প্রধান বলতে বোঝেন কমিটির সভাপতিকে। আগে প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের চেয়ার ছিল সর্বোচ্চ মর্যাদার, এখন অনেক ক্ষেত্রে সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে কমিটির সভাপতি। এমনকি কোথাও কোথাও সভাপতিদের শিক্ষকদের চেয়ারে বসার প্রবণতাও দেখা যায়। ফলে শিক্ষক সমাজ এখন অনেক ক্ষেত্রে কমিটির অধীনস্থ স্বল্পবেতনভোগী কর্মচারীতে পরিণত হয়েছে। সেখানে শিক্ষকের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ।
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে ছাড়, ফি মওকুফ, বেতন হাফ বা ফ্রি করা, উপবৃত্তির সুযোগ দেওয়া, ফেল করা শিক্ষার্থীকে প্রমোশন দেওয়া, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া—এসবই অনেক ক্ষেত্রে কমিটির সভাপতি, সদস্য বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা বুঝে যায়, শিক্ষকের সিদ্ধান্তের চেয়ে প্রভাবশালীদের কথাই বেশি কার্যকর।
অনেক সময় ধর্মীয় উন্মাদনার কারণেও শিক্ষক নির্যাতন বা বৈষম্য দেখা যায়। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। একসময় শিক্ষককে ধর্ম বা পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দেখা হতো না; বরং জ্ঞান ও গুণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হতো। এখন এই বিভাজন শিক্ষাক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাস্তবে শিক্ষকরা চাকরিজীবী হিসেবে রাষ্ট্রের নির্দেশনা মানতে বাধ্য। কোনো সরকার যদি অযৌক্তিক দলীয় এজেন্ডা চাপিয়ে দেয়, তবে চাকরি রক্ষার স্বার্থে অনেকেই তা পালন করতে বাধ্য হন। ফলে সরকার পরিবর্তনের পর যদি শিক্ষকদের বারবার দায়ী করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে শিক্ষক নির্যাতনের মাত্রা আরও বাড়বে।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কিছু শিক্ষক-প্রধানের নৈতিক দুর্বলতা, চারিত্রিক প্রশ্নবিদ্ধতা এবং আর্থিক অনিয়মও শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে। কিছু শিক্ষকের অপকর্ম পুরো শিক্ষক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শিক্ষক নির্যাতন প্রতিরোধে শিক্ষকদের ভূমিকা অন্যান্য পেশাজীবীদের তুলনায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল। শিক্ষক সমাজ বিভিন্ন গ্রুপ, মতাদর্শ ও স্বার্থে বিভক্ত। এই বিভাজন ও অনৈক্যের কারণে কার্যকর প্রতিবাদ গড়ে উঠছে না।
আলোচিত বিষয়গুলোর বাইরে আরও অনেক কারণ রয়েছে। শিক্ষকদেরও আত্মসমালোচনা করতে হবে। স্বীকার করতে হবে নিজেদের ভুলত্রুটি ও দুর্বলতা। মনে রাখতে হবে, শুধু নিয়োগপত্র পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না; শিক্ষক হয়ে উঠতে হয়।
দীর্ঘ অশুভ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠা এসব সমস্যা এক দিনে সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা। রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সেরা শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকতা পেশাকে স্বপ্ন হিসেবে গ্রহণ করে।
এখনই বন্ধ করতে হবে শিক্ষক নির্যাতন। কোনো অবস্থাতেই শিক্ষকের অপমান মেনে নেওয়া যাবে না। শিক্ষকদের মর্যাদার উদাহরণ ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সুপথে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পরিচালনা কমিটির ভূমিকা ও যোগ্যতা পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। সমাজের সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। প্রয়োজনে শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে এই জাতিকে চরম মূল্য দিতে হবে। কারণ, বঞ্চিত, নিপীড়িত ও মর্যাদাহীন শিক্ষক দিয়ে কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো সক্ষম জাতি গঠন সম্ভব নয়।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কলামিস্ট ও শিক্ষা বিষয়ক নিবন্ধকার।
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?