শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ও রাজনৈতিক তোলপাড়
রাজনীতিতে সব সময় ঘটনা সবচেয়ে বড় নয়। অনেক সময় একটি বাক্য, একটি ঘোষণা, এমনকি একটি সম্ভাবনাও বাস্তব ঘটনার চেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে। কারণ রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, ভয়, প্রত্যাশা, স্মৃতি এবং কল্পনারও জগৎ। সেখানে একটি উচ্চারিত বাক্য কখনো কখনো হাজারো মানুষের মনে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। একই সঙ্গে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরও দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। কথাগুলো ছিল অল্প, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি ছিল বিস্তৃত। মুহূর্তের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হলো ব্যাখ্যা, পাল্টা ব্যাখ্যা, ভবিষ্যদ্বাণী, বিদ্রূপ এবং উচ্ছ্বাসের মিশ্র প্রবাহ। যেন কেউ একটি স্থির পুকুরে ছোট্ট একটি পাথর ছুড়ে দিয়েছেন, আর তার ঢেউ তীর ছুঁয়ে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এটাই রাজনীতির বিস্ময়। সেখানে ভাষা কখনো কখনো বাস্তবতার আগেই রাজনীতি সৃষ্টি করে। শেখ হাসিনা এমন একজন রাজনৈতিক চরিত্র, যাঁকে বাংলাদেশের সমসাম
রাজনীতিতে সব সময় ঘটনা সবচেয়ে বড় নয়। অনেক সময় একটি বাক্য, একটি ঘোষণা, এমনকি একটি সম্ভাবনাও বাস্তব ঘটনার চেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে। কারণ রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, ভয়, প্রত্যাশা, স্মৃতি এবং কল্পনারও জগৎ। সেখানে একটি উচ্চারিত বাক্য কখনো কখনো হাজারো মানুষের মনে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। একই সঙ্গে নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরও দেশে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। কথাগুলো ছিল অল্প, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি ছিল বিস্তৃত। মুহূর্তের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন বিতর্কের জন্ম হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হলো ব্যাখ্যা, পাল্টা ব্যাখ্যা, ভবিষ্যদ্বাণী, বিদ্রূপ এবং উচ্ছ্বাসের মিশ্র প্রবাহ। যেন কেউ একটি স্থির পুকুরে ছোট্ট একটি পাথর ছুড়ে দিয়েছেন, আর তার ঢেউ তীর ছুঁয়ে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
এটাই রাজনীতির বিস্ময়। সেখানে ভাষা কখনো কখনো বাস্তবতার আগেই রাজনীতি সৃষ্টি করে।
শেখ হাসিনা এমন একজন রাজনৈতিক চরিত্র, যাঁকে বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাস থেকে আলাদা করা যায় না। তাঁকে ঘিরে যেমন প্রবল সমর্থন রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর বিরোধিতা। তিনি কারও কাছে উন্নয়ন, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতার প্রতীক; আবার কারও কাছে কর্তৃত্ববাদ, দমননীতি ও রাজনৈতিক সংকটের স্মারক। ফলে তাঁর যেকোনো বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই কেবল একটি ব্যক্তিগত মতামত থাকে না; সেটি রাজনৈতিক ঘটনাতেও পরিণত হয়।
রাজনীতিতে মানুষের কল্পনা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী। ঘোণাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, এ দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে কোনো অধ্যায় পুরোপুরি শেষ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া সব সময় নিরাপদ নয়। কখনো কখনো একটি মাত্র বাক্যই নিস্তরঙ্গ রাজনৈতিক জলরাশিতে এমন ঢেউ তোলে, যার বিস্তার কত দূর যাবে, তা তখন আর কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন। এরপর আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা আত্মগোপনে যান, অনেকে বিদেশে আশ্রয় নেন, অনেকে গ্রেপ্তার হন। পরে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়। মাঠের রাজনীতিতে দলটির উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন আর দৃশ্যমান নয়; বরং স্মৃতি, বিতর্ক এবং ডিজিটাল উপস্থিতির মধ্যেই অনেকটা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় দেশে ফেরার ঘোষণা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঘোষণার গুরুত্ব কোথায়? ঘোষণাটি কি সত্যিই একটি প্রত্যাবর্তনের সূচনা, নাকি এটি মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা? এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ রাজনীতি সরলরৈখিক কোনো বিজ্ঞান নয়। এখানে দুই আর দুই সব সময় চার হয় না। কখনো হয় তিন, কখনো পাঁচ, আবার কখনো হিসাবই পাল্টে যায়।
রাজনীতির ইতিহাসে নেতানেত্রীদের দেশ ছেড়ে যাওয়া বা নির্বাসন নতুন কোনো ঘটনা নয়। ক্ষমতাচ্যুত নেতা দেশ ছেড়েছেন, আবার ফিরেও এসেছেন। কেউ ফিরে এসে ইতিহাস বদলেছেন, কেউ আর কখনো ফেরেননি। ইতিহাস তাই আমাদের নিশ্চিত উত্তর দেয় না; বরং সম্ভাবনার নানা দরজা খুলে দেয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও সেটিই সত্য।
তিনি দেশে ফিরবেন কি না, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় মাত্র নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিচারিক প্রক্রিয়া, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক সমীকরণ, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। ফলে আজ কেউ যদি নিশ্চিতভাবে বলেন, তিনি অবশ্যই ফিরবেন, অথবা কেউ যদি সমান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, তিনি কোনো দিনই ফিরতে পারবেন না—তাহলে দুজনেই মূলত অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় সত্য হলো তার অনিশ্চয়তা।
এই ঘোষণার আরেকটি দিক আরও গভীর। রাজনীতিতে বাস্তব শক্তির পাশাপাশি একটি অদৃশ্য শক্তিও কাজ করে—মনস্তাত্ত্বিক শক্তি। কোনো দল যখন দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকে, তখন নেতৃত্বের একটি আশাবাদী বার্তাও কর্মীদের কাছে নতুন প্রাণসঞ্চার করতে পারে। আবার প্রতিপক্ষের কাছেও একই বার্তা নতুন সতর্কতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে একই বাক্য দুই বিপরীত রাজনৈতিক শিবিরে দুই বিপরীত মানসিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটি অংশ এই ঘোষণাকে নতুন আশার আলো হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অনেকে এটিকে রাজনৈতিক নাটক, কৌশল কিংবা অসম্ভব প্রতিশ্রুতি বলে ব্যাখ্যা করছেন। উভয় প্রতিক্রিয়াই আসলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিফলন। এই মেরুকরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখানে মানুষ অনেক সময় ঘটনাকে নয়, ঘটনার প্রতি নিজের অবস্থানকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে একই সংবাদ একজনের কাছে আশার, আরেকজনের কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠে।
সম্ভবত এখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট। আমরা ঘটনাকে বিশ্লেষণ করার আগে তাকে ভালোবাসা কিংবা ঘৃণার পাল্লায় মাপতে শুরু করি। শেখ হাসিনার ঘোষণার পর আরেকটি বিষয়ও সামনে এসেছে। অনেকেই বলছেন, দেশে এখনো ‘হাসিনাভীতি’ কাজ করছে। আবার অন্যরা বলছেন, এটি কেবল রাজনৈতিক প্রচারণার ভাষা।
আসলে ভয় একটি জটিল সামাজিক অনুভূতি। ভয় সব সময় চিৎকার করে প্রকাশ পায় না; অনেক সময় নীরবতার মধ্যেও থাকে। আবার সব সমালোচনাও ভয় থেকে আসে না। গণতান্ত্রিক সমাজে সমালোচনা স্বাভাবিক রাজনৈতিক আচরণ। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে সমর্থন ও বিরোধিতা—উভয়ই অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে, তখন বোঝা যায় তিনি এখনো রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক।
এই অর্থে শেখ হাসিনা এখনো বাংলাদেশের রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র। কারণ তাঁকে নিয়ে যেমন সমর্থকেরা কথা বলেন, তেমনি বিরোধীরাও নীরব থাকতে পারেন না। কোনো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রভাব এমনই হয়—তাঁদের উপস্থিতি যেমন আলোচনার বিষয়, অনুপস্থিতিও তেমনি আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে এখানেও সংযম প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে আলোচনার বিস্তারকে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনি তাঁকে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করাও তাড়াহুড়ো হবে। রাজনীতি খুব কমই স্থির থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাস তো আরও বেশি অস্থির। এখানে অনেক অসম্ভব ঘটনা বাস্তবে ঘটেছে, আবার অনেক নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী কয়েক মাসের মধ্যেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
এই কারণেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সবচেয়ে বড় গুণ ভবিষ্যদ্বাণী করা নয়; বরং অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করা। ডিসেম্বর এখনো অনেক দূরে। এর মধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে পারে, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে, আন্তর্জাতিক পরিবেশ বদলাতে পারে, এমনকি ঘোষণার ভাষ্যও বদলে যেতে পারে। ফলে আজকের আলোচনাকে আগামীকালের বাস্তবতা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। শেখ হাসিনার এই ঘোষণা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো গভীরভাবে ব্যক্তি-নির্ভর। প্রতিষ্ঠান, নীতি কিংবা কর্মসূচির চেয়ে অনেক সময় ব্যক্তিত্বই আলোচনার কেন্দ্র দখল করে নেয়। একটি রাজনৈতিক দল মাঠে অনুপস্থিত থাকতে পারে, কিন্তু তার নেতা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থেকে যেতে পারেন। এ এক অদ্ভুত বাস্তবতা, যা কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের রাজনীতিতেই দেখা যায়।
শেষ পর্যন্ত এই ঘোষণার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হয়তো শেখ হাসিনা ফিরবেন কি ফিরবেন না—সেই প্রশ্নে নয়। বরং এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো এমন এক মানসিক ভূগোলে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি বাক্যই হাজারো মানুষের আশা জাগাতে পারে, একই সঙ্গে হাজারো মানুষের আশঙ্কাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
রাজনীতি তাই কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার শিল্প নয়; এটি মানুষের মনেরও ইতিহাস। সেখানে কখনো একটি নির্বাচনের ফলের চেয়েও একটি ঘোষণার অভিঘাত বড় হয়ে ওঠে। কারণ ঘোষণা ভবিষ্যৎকে বদলায় কি না, তা পরে বোঝা যায়; কিন্তু ঘোষণা মানুষের কল্পনাকে নাড়া দেয় সঙ্গে সঙ্গেই।
আর রাজনীতিতে মানুষের কল্পনা অনেক সময় বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী। ঘোণাটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, এ দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে কোনো অধ্যায় পুরোপুরি শেষ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া সব সময় নিরাপদ নয়। কখনো কখনো একটি মাত্র বাক্যই নিস্তরঙ্গ রাজনৈতিক জলরাশিতে এমন ঢেউ তোলে, যার বিস্তার কত দূর যাবে, তা তখন আর কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।
লেখক : জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট।
এইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?