শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা: ১০ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল আতঙ্ক, রক্ত আর আর্তনাদে। ২০১৬ সালের ৭ জুলাই, পবিত্র ঈদুল ফিতরের সকাল। শোলাকিয়া ঈদগাহে লাখো মুসল্লি ঈদের জামাতে অংশ নিতে জড়ো হয়েছেন। ঠিক তখনই আজিমউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কে মুফতি মুহাম্মদ আলী মসজিদের সামনে পুলিশের নিরাপত্তা চৌকিতে অতর্কিত হামলা চালায় অস্ত্রধারী জঙ্গিরা। মুহূর্তেই থমকে যায় পুরো এলাকা। দুই ঘণ্টাব্যাপী বন্দুকযুদ্ধ, গুলির শব্দ আর মানুষের ছোটাছুটিতে ভয়ার্ত হয়ে ওঠে শোলাকিয়া। সেই ঘটনার এক দশক পূর্ণ হলেও আজও রয়ে গেছে তার ক্ষতচিহ্ন। দেয়ালে গুলির দাগ, নিহত গৃহবধূ ঝর্ণা রানী ভৌমিকের স্মৃতি আর স্বজন হারানোর বেদনা যেন প্রতিদিনই মনে করিয়ে দেয় দেশের অন্যতম আলোচিত জঙ্গি হামলার কথা। হামলায় জঙ্গিরা নৃশংসভাবে হত্যা করে পুলিশের দুই কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম ও আনসারুল হককে। আহত হন পুলিশের অন্তত আট সদস্য। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় আবির রহমান নামে এক জঙ্গি। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় আটক করা হয় শফিউল ইসলাম ডনকে। হামলার সময় জঙ্গিদের ছোড়া একটি গুলি জানালা ভেদ করে গিয়ে লাগে ভৌমিক নিবাসে থাকা গৃহবধূ ঝর্ণা রানী ভৌমিকের শরীরে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত

শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা: ১০ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল আতঙ্ক, রক্ত আর আর্তনাদে। ২০১৬ সালের ৭ জুলাই, পবিত্র ঈদুল ফিতরের সকাল। শোলাকিয়া ঈদগাহে লাখো মুসল্লি ঈদের জামাতে অংশ নিতে জড়ো হয়েছেন। ঠিক তখনই আজিমউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কে মুফতি মুহাম্মদ আলী মসজিদের সামনে পুলিশের নিরাপত্তা চৌকিতে অতর্কিত হামলা চালায় অস্ত্রধারী জঙ্গিরা। মুহূর্তেই থমকে যায় পুরো এলাকা। দুই ঘণ্টাব্যাপী বন্দুকযুদ্ধ, গুলির শব্দ আর মানুষের ছোটাছুটিতে ভয়ার্ত হয়ে ওঠে শোলাকিয়া।

সেই ঘটনার এক দশক পূর্ণ হলেও আজও রয়ে গেছে তার ক্ষতচিহ্ন। দেয়ালে গুলির দাগ, নিহত গৃহবধূ ঝর্ণা রানী ভৌমিকের স্মৃতি আর স্বজন হারানোর বেদনা যেন প্রতিদিনই মনে করিয়ে দেয় দেশের অন্যতম আলোচিত জঙ্গি হামলার কথা।

হামলায় জঙ্গিরা নৃশংসভাবে হত্যা করে পুলিশের দুই কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম ও আনসারুল হককে। আহত হন পুলিশের অন্তত আট সদস্য। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় আবির রহমান নামে এক জঙ্গি। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় আটক করা হয় শফিউল ইসলাম ডনকে।

হামলার সময় জঙ্গিদের ছোড়া একটি গুলি জানালা ভেদ করে গিয়ে লাগে ভৌমিক নিবাসে থাকা গৃহবধূ ঝর্ণা রানী ভৌমিকের শরীরে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ঈদের দিন পরিবারের সঙ্গে থাকার কথা থাকলেও তিনি হয়ে ওঠেন জঙ্গি হামলার নিরীহ শিকার।

হামলার পর পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে আহত জঙ্গি শফিউল ইসলাম ডন এবং তানিম নামে স্থানীয় এক সন্দেহভাজন যুবককে আটক করা হয়। মামলায় মোট ২৪ জনকে আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে ১৯ জন বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে।

দশ বছর পরও হামলার স্মৃতি বহন করছে সবুজবাগ এলাকার সেই গলি। বর্তমানে এর নাম ‘ঝর্ণা রানী ভৌমিক সড়ক’। গলির কয়েকটি বাড়ির দেয়ালে এখনো স্পষ্ট গুলির চিহ্ন। ভৌমিক নিবাসের সেই জানালাটিও সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, যেটি ভেদ করে গুলিটি ঝর্ণা রানীকে প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। জানালার পাশেই টাঙানো রয়েছে তার ছবি। তাঁর স্বামী গৌরাঙ্গ ভৌমিকও দুই বছর আগে মারা গেছেন। তাদের একমাত্র ছেলে শুভ দেব বর্তমানে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ঈদের দিন এলেই সেই ভয়াবহ সকাল চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যারা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখনো আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। বিশেষ করে তখনকার শিশুদের মনেও রয়ে গেছে গভীর ছাপ। তাদের দাবি, দীর্ঘদিনেও বিচার শেষ না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে। দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মুফতি মুহাম্মদ আলী মসজিদের ইমাম বলেন, দোতলা থেকে পুরো ঘটনাটি দেখেছিলাম। এখনো সেই দৃশ্য মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। এমন ঘটনা যেন আর কখনো না ঘটে। আমরা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বাংলাদেশ চাই।

জঙ্গি হামলার তিন দিন পর পাকুন্দিয়া থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ সামসুদ্দীন বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় মামলা করেন।

জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর মো. শাহ কামাল সরকার জানান, বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে মামলার বিচার কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। পাঁচ আসামির মধ্যে বর্তমানে দুজন উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন এবং তিনজন কারাগারে আছেন।

তিনি বলেন, মামলার ১০২ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ৬৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য সমন জারি করা হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলে বিচার দ্রুত এগোবে। সাক্ষী উপস্থিত না হওয়া এবং বিচারকের স্বল্পতার কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে বিচারকাজ থেমে নেই। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এক দশক পেরিয়ে গেলেও শোলাকিয়ার সেই রক্তাক্ত সকাল কেবল ইতিহাসের একটি ঘটনা নয়, এটি কিশোরগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে। সময় এগিয়েছে, কিন্তু স্বজন হারানোর বেদনা, গুলির দাগ আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow