শ্যাওলা-কলমিলতার মাঝে ডাহুকের সংসার
তাহমিদ হাসান বাসার ঠিক পেছনেই একটা পুকুর। বিস্তৃত শ্যাওলা ছাড়া বহুদিন কারো ব্যবহারে আসতে দেখিনি। পানির ওপর পুরু হয়ে জমেছে শ্যাওলা আর কলমিলতা। সবুজ গালিচার মতো ছড়িয়ে আছে পাড় পর্যন্ত। মানুষের অযত্নে যে জলাশয় অকেজো হয়ে পড়ে থাকে, সেখানেই আসলে জমে ওঠে আরেক জীবনের সংসার। কলমিলতার ফাঁকে ফাঁকে, ঝোঁপের আড়ালে, দিনভর টুকটাক শব্দ করে ঘুরে বেড়ায় একঝাঁক ডাহুক। কারো চোখে পড়ুক বা না পড়ুক, এখানেই তাদের বাস। অনাদরে বা খুব আদরেই বাড়ছে ডাহুকের সংসার! ডাহুক বাংলার অতি পরিচিত নাম। অথচ পাখিটাকে চোখে দেখার সুযোগ পান কম মানুষই। রাতের বেলা বা বর্ষার ভোরে দূর থেকে ভেসে আসা তীক্ষ্ণ, খানিকটা কর্কশ ডাক শুনেই বেশিরভাগ মানুষ ডাহুককে চেনেন। ভাগ্যবান আমি না চাইতেই পেয়ে গেলাম অস্থায়ী বাসিন্দার দেখা। শরীরের ওপরটা কালচে ধূসর, বুক আর মুখ সাদা, লেজের নিচটায় লালচে আভা। এই রঙের কী চমৎকার বৈপরীত্য! শুনেছি কেউ খেতে বসলে ডাহুক যদি তা দেখে ফেলে, আর তাকে ভাগ না দেওয়া হয়, তবে অভিশাপ লাগে। এমন প্রবাদ-বিশ্বাস বহু প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে এসেছে। যা এই সাধারণ পাখিটিকে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে এক ধরনের রহস্যময় মর্যাদা দিয়ে
তাহমিদ হাসান
বাসার ঠিক পেছনেই একটা পুকুর। বিস্তৃত শ্যাওলা ছাড়া বহুদিন কারো ব্যবহারে আসতে দেখিনি। পানির ওপর পুরু হয়ে জমেছে শ্যাওলা আর কলমিলতা। সবুজ গালিচার মতো ছড়িয়ে আছে পাড় পর্যন্ত। মানুষের অযত্নে যে জলাশয় অকেজো হয়ে পড়ে থাকে, সেখানেই আসলে জমে ওঠে আরেক জীবনের সংসার। কলমিলতার ফাঁকে ফাঁকে, ঝোঁপের আড়ালে, দিনভর টুকটাক শব্দ করে ঘুরে বেড়ায় একঝাঁক ডাহুক। কারো চোখে পড়ুক বা না পড়ুক, এখানেই তাদের বাস। অনাদরে বা খুব আদরেই বাড়ছে ডাহুকের সংসার!
ডাহুক বাংলার অতি পরিচিত নাম। অথচ পাখিটাকে চোখে দেখার সুযোগ পান কম মানুষই। রাতের বেলা বা বর্ষার ভোরে দূর থেকে ভেসে আসা তীক্ষ্ণ, খানিকটা কর্কশ ডাক শুনেই বেশিরভাগ মানুষ ডাহুককে চেনেন। ভাগ্যবান আমি না চাইতেই পেয়ে গেলাম অস্থায়ী বাসিন্দার দেখা। শরীরের ওপরটা কালচে ধূসর, বুক আর মুখ সাদা, লেজের নিচটায় লালচে আভা। এই রঙের কী চমৎকার বৈপরীত্য!
শুনেছি কেউ খেতে বসলে ডাহুক যদি তা দেখে ফেলে, আর তাকে ভাগ না দেওয়া হয়, তবে অভিশাপ লাগে। এমন প্রবাদ-বিশ্বাস বহু প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে এসেছে। যা এই সাধারণ পাখিটিকে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে এক ধরনের রহস্যময় মর্যাদা দিয়েছে। কী জানি! সত্যি কি না!

নটডাঙ্গা বিলের শাপলা আর পুঁটি মাছের ঝোল
অদ্ভুত রকম সত্য কি জানেন? ডাহুক জলাশয়প্রেমী পাখি হলেও পছন্দ ঝোঁপঝাড়, নলখাগড়া, কচুরিপানা বা ঘন জলজ উদ্ভিদে ঢাকা ডোবা-পুকুর, ধানক্ষেতের আল, বাঁশঝাড়ের কিনার। ঘন গাছপালার আড়াল তাকে নিরাপত্তা দেয়, শিকারির চোখ এড়িয়ে চলাফেরার সুযোগ করে দেয়। লম্বা লম্বা পায়ে সে অনায়াসে কচুরিপানার ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতে পারে। প্রয়োজনে সাঁতরেও পার হয় ছোট জলাশয়। তবে এই জাদুর শহরে ডাহুক হয়তোবা পরিযায়ী!
পোকামাকড়, কেঁচো, শামুক, ছোট মাছ, ব্যাঙাচি থেকে শুরু করে বীজ, ধানের কণা, নরম উদ্ভিদের অংশ; যা কিছু জোটে, তা-ই খায় এই ডাহুক। এই বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসই তাকে গ্রামীণ পরিবেশে সহজে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়। অথচ দেখুন না! দিব্যি এই বিষাক্ত নগরের কোলে পরিত্যাক্ত কালো জলের জলাশয়ে ঝোঁপের ভেতর বাস করছে এরা। ছানাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে জলাশয়ের কিনারা ধরে।
বাংলাদেশে ডাহুক এখনো তুলনামূলক সহজলভ্য একটি আবাসিক পাখি। তবে নগরায়ণের চাপে তার আবাসস্থল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। এখনো বিপন্ন তালিকায় নাম ওঠেনি ঠিকই। কিন্তু যেভাবে দেশের ছোট জলাশয়গুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। তাতে দীর্ঘমেয়াদে এ পাখি টিকে থাকবে কি না, তা-ও চিন্তার বিষয়!

কেন হারিয়ে যাচ্ছে জাতীয় পাখি দোয়েল
বাংলা কবিতা ও গানের জগতেও ডাহুকের ডাক গ্রামবাংলার সন্ধ্যা বা রাতের নিসর্গচিত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে। বাংলার প্রকৃতিকেন্দ্রিক কবিতায়, বিশেষত রূপসী বাংলার নিসর্গ বর্ণনায়, রাতজাগা পাখির ডাক প্রায়ই ব্যবহৃত হয়েছে নির্জনতা আর গ্রামীণ জীবনের ছন্দ বোঝাতে, নিসর্গের প্রতীক বোঝাতে। কিন্তু কলকারখানার ধোঁয়ায় ভরা শহরের এ জলাশয়েই ডাহুক দম্পত্তির আবাস হলো! ভাবছি আর ভাবছি! ওরা আমার মেহমান!
লেখক: শিক্ষার্থী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।
এসইউ
What's Your Reaction?