সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় ২শ বছরের পুরোনো মেলায় উৎসবের আমেজ
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় প্রতিবছরের মতো এবারও ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা শুরু হয়েছে। দুইশত বছরের পুরোনো এই মেলাটি এ জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মেলা উপলক্ষে পুরো এলাকায় এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেলা শুরু হয় এবং তা সাত দিনব্যাপী চলে। গত বুধবার (২০ মে) সকাল থেকে মেলা প্রাঙ্গণের দোকানপাটে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা মেলা শুরুর কয়েক দিন আগেই এখানে পসরা সাজিয়ে বসেছেন। এবার মেলায় নাগরদোলাসহ শিশুদের বিনোদনের নানা উপকরণের আধিক্য দেখা গেছে। মেলা প্রাঙ্গণে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক দোকানদারকে আশপাশের ফসলি জমিতে বসতে দেখা গেছে। এমনকি সত্যজিৎ রায়ের মূল বাড়িটির চারপাশ ঘেঁষে ফুচকাসহ নানা ধরনের ভাসমান দোকান বসেছে। এতে দর্শনার্থীদের মূল বাড়িতে প্রবেশ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। ঐতিহাসিক এই বাড়িটির সৌন্দর্য রক্ষায় ভবিষ্যতে সামনের কিছু জায়গা খালি রাখার দাবি জানিয়েছেন মেলায় আসা দর্শনার্থীরা। এ বছর উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মেলার সর্
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় প্রতিবছরের মতো এবারও ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা শুরু হয়েছে। দুইশত বছরের পুরোনো এই মেলাটি এ জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মেলা উপলক্ষে পুরো এলাকায় এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেলা শুরু হয় এবং তা সাত দিনব্যাপী চলে। গত বুধবার (২০ মে) সকাল থেকে মেলা প্রাঙ্গণের দোকানপাটে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা মেলা শুরুর কয়েক দিন আগেই এখানে পসরা সাজিয়ে বসেছেন। এবার মেলায় নাগরদোলাসহ শিশুদের বিনোদনের নানা উপকরণের আধিক্য দেখা গেছে। মেলা প্রাঙ্গণে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক দোকানদারকে আশপাশের ফসলি জমিতে বসতে দেখা গেছে। এমনকি সত্যজিৎ রায়ের মূল বাড়িটির চারপাশ ঘেঁষে ফুচকাসহ নানা ধরনের ভাসমান দোকান বসেছে। এতে দর্শনার্থীদের মূল বাড়িতে প্রবেশ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। ঐতিহাসিক এই বাড়িটির সৌন্দর্য রক্ষায় ভবিষ্যতে সামনের কিছু জায়গা খালি রাখার দাবি জানিয়েছেন মেলায় আসা দর্শনার্থীরা।
এ বছর উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মেলার সর্বোচ্চ ডাক (নিলাম) উঠেছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, যা গত বছর ছিল মাত্র ৭১ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ গতবারের তুলনায় এবার ইজারা মূল্য বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৯ গুণেরও বেশি।
তবে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ- ইজারাদার নিলামের মোটা অঙ্কের টাকা তুলতে গিয়ে দোকান থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করছেন, যার ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, বৈশাখী মেলার এই প্রচলন শুরু হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ তথা তৎকালীন জমিদার হরি কিশোর রায় চৌধুরীর আমলে। শ্রী শ্রী কাল ভৈরব পূজা উপলক্ষে তিনি এই মেলার সূচনা করেছিলেন। স্থানীয়ভাবে এই স্থানটি ‘রায় বাড়ি’ নামে পরিচিত। বাড়ির সামনের বিশাল খোলা মাঠ ও পুকুরপাড় জুড়েই বসে এই মেলা। মেলায় মাটির পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল, খেলনা, তৈজসপত্র, প্রসাধন সামগ্রী ও কাঠের আসবাবপত্রসহ হরেক রকমের স্টলে মুখরিত হয়ে ওঠে রায় বাড়ির প্রাঙ্গণ। মেলা চলাকালীন দূর-দূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ কেনাকাটা ও বিনোদনের জন্য এখানে ছুটে আসেন।
উল্লেখ্য, এই বাড়িতেই ১৮৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ, প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। আর ১৮৮৭ সালে জন্ম নেন সত্যজিৎ রায়ের পিতা, বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি ছড়াকার সুকুমার রায়। দেশভাগের পূর্বে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী সপরিবারে কলকাতা চলে যান। বর্তমানে উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ না থাকায় বাড়িটি সরকারের রাজস্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে বাড়ির ধ্বংসপ্রায় একটি প্রাচীন স্থাপনা ও পুকুরঘাট সংস্কার করায় এর সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বাড়িটি দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় মেলা ছাড়াও সারা বছর পর্যটকরা রায় বাড়ি পরিদর্শনে আসেন। দূরবর্তী দর্শনার্থীদের জন্য এখানে একটি আধুনিক রেস্টহাউসও নির্মাণ করা হয়েছে, যা উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন মেলাপ্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেছেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চন, সহ-সভাপতি শফিকুল ইসলাম, মিজানুর রহমান স্বপন, শেখ জসিম উদ্দিন মেনু, মসূয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস রতন, সিনিয়র সহ-সভাপতি মো. গোলাপ মিয়া, জাসাসের উপজেলা সভাপতি ও নজরুল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফ খোকন প্রমুখ।
শুক্রবার সন্ধ্যায় দেশের প্রথম নারী এভারেস্টজয়ী নিশাত মজুমদারের সঙ্গে ‘সন্দীপন সাহিত্য আড্ডা, কিশোরগঞ্জ’-এর সদস্যদের একটি বিশেষ সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত হবে। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কবি-সাহিত্যিকরা কবিতা পাঠ, আবৃত্তি ও সাহিত্য আলোচনায় অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
মেলা আয়োজন কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা বিল্লাল হোসেন বলেন, এবারের মেলা জমজমাট রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। যেহেতু এটি জেলার অন্যতম একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা, তাই একটি শক্তিশালী কমিটির মাধ্যমে এটি সুন্দর ও শৃঙ্খলভাবে পরিচালনার চেষ্টা করছি।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, মেলার যাবতীয় প্রস্তুতি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর মেলা থেকে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা সরকারি রাজস্ব আদায় হয়েছে। মেলা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনার জন্য দরদাতাকে একটি সুনির্দিষ্ট কমিটির মাধ্যমে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বিক সহযোগিতা করছে এবং মেলায় আসা সবার জন্য কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন মেলা পরিদর্শনের সময় বলেন, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার ও সত্যজিৎ রায় চৌধুরীর মতো গুণীজনদের সম্পর্কে আমাদের নতুন প্রজন্মকে বিস্তারিত জানাতে হবে। তাদের কালজয়ী সৃষ্টিকর্ম নতুনদের সামনে তুলে ধরলে তারা শিল্প, সাহিত্য ও সুস্থ সংস্কৃতির প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
What's Your Reaction?