সমস্যা স্বীকার করা ইতিবাচক, বড় ঘাটতি সংস্কারে

বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে দেশের কর্মসংস্থান অনেকটা থমকে আছে। বিনিয়োগ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই কর্মসংস্থান বাড়বে। অন্যদিকে, জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে, যা বিনিয়োগের পথে অন্তরায়। বিএনপি সরকারের ছয় মাসপূর্তি উপলক্ষে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এসব সমস্যার আশু সমাধান প্রত্যাশা করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি। বর্তমান সরকার ছয় মাস পূর্ণ করছে। এ সরকারের কর্মকাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন তারা উত্তরাধিকারসূত্রে বেশ কিছু কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ পেয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, ব্যাংকিং খাতের সংকট, জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার সংকট- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সহজ ছিল না। আমার কাছে সরকারের প্রথম ইতিবাচক দিক হলো, তারা শুরু থেকেই সমস্যাগুলো খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছে ও চিহ্নিত করেছে। যে কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলার প্রথম ধাপই হলো সমস্যাকে স্বীকার করা। অতীতে আমরা দেখেছি, অনেক

সমস্যা স্বীকার করা ইতিবাচক, বড় ঘাটতি সংস্কারে

বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে দেশের কর্মসংস্থান অনেকটা থমকে আছে। বিনিয়োগ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই কর্মসংস্থান বাড়বে। অন্যদিকে, জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে, যা বিনিয়োগের পথে অন্তরায়।

বিএনপি সরকারের ছয় মাসপূর্তি উপলক্ষে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এসব সমস্যার আশু সমাধান প্রত্যাশা করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি

বর্তমান সরকার ছয় মাস পূর্ণ করছে। এ সরকারের কর্মকাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব নেয়, তখন তারা উত্তরাধিকারসূত্রে বেশ কিছু কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ পেয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, ব্যাংকিং খাতের সংকট, জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থার সংকট- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সহজ ছিল না।

আমার কাছে সরকারের প্রথম ইতিবাচক দিক হলো, তারা শুরু থেকেই সমস্যাগুলো খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছে ও চিহ্নিত করেছে। যে কোনো অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলার প্রথম ধাপই হলো সমস্যাকে স্বীকার করা। অতীতে আমরা দেখেছি, অনেক সরকার বিভিন্ন সমস্যা স্বীকার করতে চাইতো না। ফলে সেগুলোর সমাধান আরও কঠিন হয়ে যেত।

ক্ষমতায় আসার প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন মাসের মধ্যেই তাদের বাজেট দিতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর এমন একটি বাজেট দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে, যেখানে জনগণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর চাপ কমানো এবং বিভিন্ন কার্যক্রম সহজ করার চেষ্টা ছিল। এটিও সরকারের একটি ইতিবাচক দিক

দ্বিতীয়ত, এসব সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সরকার তাদের অভিপ্রায় বা ইন্টেন্ট বেশ পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করেছে। তৃতীয়ত, সংস্কার ও ডিরেগুলেশনের বিষয়েও তারা কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।

সরকারের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক কাজ ছিল বাজেট প্রণয়ন। ক্ষমতায় আসার প্রায় আড়াই থেকে সাড়ে তিন মাসের মধ্যেই তাদের বাজেট দিতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর এমন একটি বাজেট দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে, যেখানে জনগণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর চাপ কমানো এবং বিভিন্ন কার্যক্রম সহজ করার চেষ্টা ছিল। এটিও সরকারের একটি ইতিবাচক দিক।

ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগকে কীভাবে দেখছেন?

এটি সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য বলে আমি মনে করি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক স্টেকহোল্ডার, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ অনেক কমে গিয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।

গত এক দশকের মধ্যে সরকারপ্রধান হিসেবে বেসরকারি খাতকে সবচেয়ে বেশি সময় দেওয়া ও তাদের কথা শোনার একটি প্রবণতা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। এই এনগেজমেন্ট ও ডায়ালগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন নীতি-নির্ধারক বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। বেসরকারি খাতই অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই তাদের কথা শোনা, মতামত নেওয়া ও সেই অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমার মনে হয়, গত এক দশকের মধ্যে সরকারপ্রধান হিসেবে বেসরকারি খাতকে সবচেয়ে বেশি সময় দেওয়া ও তাদের কথা শোনার একটি প্রবণতা আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। এই এনগেজমেন্ট ও ডায়ালগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কেমন দেখছেন?

আন্তর্জাতিক স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গেও সরকারের ভালো সম্পৃক্ততা রয়েছে। আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জাপানের সঙ্গে ইপিএ বাস্তবায়ন, টার্মিনাল-সংক্রান্ত আলোচনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষরের উদ্যোগ রয়েছে। একইভাবে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ার বিষয়টিও ইতিবাচক।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সরকারের সম্পৃক্ততাকে আমি ইতিবাচক হিসেবে দেখছি।

সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে কতটা আন্তরিক মনে হচ্ছে?

এটিও সরকারের একটি ভালো দিক। নির্বাচনের পর অনেক সময় সরকারগুলো তাদের ইশতেহারের দিকে আর তেমন নজর দেয় না। কিন্তু বর্তমান সরকার তাদের ইশতেহারে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি অনুসরণ করার চেষ্টা করছে।

দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক ও কৃষিখাতের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ- এসব বিষয়ে তারা কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালু করার জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার স্টিমুলাস উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে। এসব উদ্যোগকে আমি ইশতেহার বাস্তবায়নের ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখি।

সরকারের কর্মকাণ্ডে কোথায় ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন?

সবচেয়ে বড় ঘাটতি দেখছি সংস্কারের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে সার্বিক অর্থনৈতিক সংস্কারে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

ইরান যুদ্ধের আগেই আমরা জ্বালানি সংকটে ছিলাম। আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চমূল্য ও মূল্যঝুঁকির মধ্যেও ছিলাম। তাই এই সংকট মোকাবিলায় আরও দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাওয়ার ও এনার্জি খাত। গত এক মাসে জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে সামনে এসেছে। তবে এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। গত দুই-তিন বছরে বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের কারণে ধীরে ধীরে এই সংকট তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এর সঙ্গে গ্যাস অবকাঠামোর বিভিন্ন সমস্যাও যুক্ত হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের আগেই আমরা জ্বালানি সংকটে ছিলাম। আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চমূল্য ও মূল্যঝুঁকির মধ্যেও ছিলাম। তাই এই সংকট মোকাবিলায় আরও দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল।

জ্বালানি সংকট সমাধানে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?

স্থানীয় ও অনশোর-অফশোর গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দ্রুত যেতে হবে। যেসব গ্যাস ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি বা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে, সেগুলো দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।

বেসরকারি খাত যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়, সেগুলো দ্রুত যাচাই-বাছাই করে প্রকল্পের পাইপলাইনে নিতে হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগোতে হবে।

এলএনজির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নিয়ে কাজ করতে হবে। কাতারসহ অন্য দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ সহজ করতে হবে।

এসব ক্ষেত্রে আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এখানে আমরা কিছুটা ধীরগতি দেখতে পাচ্ছি।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

ব্যাংকিং খাতেও দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আর্থিক খাতের কিছু আইনি সংস্কার হওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, মানি লোন কোর্ট, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের মতো বিষয় নিয়ে কাজ হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। এসব আইনের খসড়াও তৈরি হয়েছিল।

এ ছাড়া যে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক নিয়ে কাজ চলছে, সেটিও আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া দরকার। একইভাবে অন্য দুর্বল ব্যাংককে যৌক্তিক একীভূতকরণ বা অবসায়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা দিয়ে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই

কিন্তু সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত না হওয়াটা হতাশাজনক। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম, খুব দ্রুত এসব আইন সংস্কার বা নতুন আইন প্রণয়ন করে আর্থিক খাতের ভিত্তি শক্ত করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে জায়গায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।

এ ছাড়া যে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক নিয়ে কাজ চলছে, সেটিও আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া দরকার। একইভাবে অন্য দুর্বল ব্যাংককে যৌক্তিক একীভূতকরণ বা অবসায়নের দিকে নিয়ে যেতে হবে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা দিয়ে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

আগামী দিনে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত?

আমার মতে, প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত পাওয়ার ও এনার্জি খাত। দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত দুর্বল ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত সংস্কারের আওতায় আনতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান টেকসই নয়, সেগুলোকে সরকারি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে দ্রুত একীভূতকরণ, অধিগ্রহণ বা যৌক্তিক অবসানের দিকে নিতে হবে।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য একটি সার্বিক সংস্কার কর্মসূচি নিতে হবে। শুধু একাডেমিক আলোচনা বা বিচ্ছিন্ন ছোটখাটো উদ্যোগ নিলে হবে না। বিনিয়োগ পরিবেশ কীভাবে উন্নত করা হবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন কৌশল থাকতে হবে।

একই সঙ্গে বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দরকার। শুধু আলোচনা নয়, কীভাবে বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানো হবে, সেটি নির্ধারণ করে দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

আইএইচও/এএসএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow