সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, ধ্বংসই একমাত্র সমাধান

আমিনুল ইসলাম ভাইরাল ভিডিওটা মাত্রই চোখে পড়েছে। রাস্তার মাঝখানে ডিউটিরত অবস্থায় দুই পুলিশ সদস্য মারামারি করেছে। মানে রীতিমত একজন আরেকজনকে মেরে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে! ঢাকার রাজপথে আজকে এই ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও একবার লিখেছি। আপনারা যারা নিয়মিত বাংলাদেশে থাকেন; তারা হয়তো ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে পারেন না। কিন্তু আমরা যারা কয়েক যুগ ধরে বিদেশে থাকছি। দেশে গেলেই বুঝতে পারি, মানুষগুলো যেন কেমন অস্থির। কেউ হাসে না। সবাই কেমন বিরক্ত হয়ে আছে। সকল শ্রেণির মাঝে একই অবস্থা। আপনি ব্যাংকে যান, অফিস-আদালতে যান; দেখবেন সবাই কেমন বিরক্ত। রাস্তা দিয়ে হাঁটেন; দেখবেন সবাই কেমন অস্থির। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে অফিসের বড় কর্তা; সবাই যেন কেমন অসুস্থ। আমার ধারণা, বাংলাদেশ নামক জনপদ চিকিৎসার ঊর্ধ্বে গেছে। চিকিৎসা দিয়েও আপনি এই সমাজকে আর ঠিক করতে পারবেন না। দুইজন পুলিশ সদস্য, যাদের কাজ মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া। তারা নিজেরাই আইন ভঙ্গ করছে প্রকাশ্য-দিবালোকে। আর আশপাশের সবাই মোটামুটি তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে। কেউ একজন আবার বলেছে, ‌‘ওরা-ওরাই মারামারি করছে।’ আজ সকালে রামিসাকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছি। সেখানে আমার স্কুলবন্ধু ইকবা

সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, ধ্বংসই একমাত্র সমাধান

আমিনুল ইসলাম

ভাইরাল ভিডিওটা মাত্রই চোখে পড়েছে। রাস্তার মাঝখানে ডিউটিরত অবস্থায় দুই পুলিশ সদস্য মারামারি করেছে। মানে রীতিমত একজন আরেকজনকে মেরে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে! ঢাকার রাজপথে আজকে এই ঘটনা ঘটেছে।

এর আগেও একবার লিখেছি। আপনারা যারা নিয়মিত বাংলাদেশে থাকেন; তারা হয়তো ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে পারেন না। কিন্তু আমরা যারা কয়েক যুগ ধরে বিদেশে থাকছি। দেশে গেলেই বুঝতে পারি, মানুষগুলো যেন কেমন অস্থির। কেউ হাসে না। সবাই কেমন বিরক্ত হয়ে আছে। সকল শ্রেণির মাঝে একই অবস্থা।

আপনি ব্যাংকে যান, অফিস-আদালতে যান; দেখবেন সবাই কেমন বিরক্ত। রাস্তা দিয়ে হাঁটেন; দেখবেন সবাই কেমন অস্থির। রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে অফিসের বড় কর্তা; সবাই যেন কেমন অসুস্থ।

আমার ধারণা, বাংলাদেশ নামক জনপদ চিকিৎসার ঊর্ধ্বে গেছে। চিকিৎসা দিয়েও আপনি এই সমাজকে আর ঠিক করতে পারবেন না। দুইজন পুলিশ সদস্য, যাদের কাজ মানুষের নিরাপত্তা দেওয়া। তারা নিজেরাই আইন ভঙ্গ করছে প্রকাশ্য-দিবালোকে। আর আশপাশের সবাই মোটামুটি তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে। কেউ একজন আবার বলেছে, ‌‘ওরা-ওরাই মারামারি করছে।’

আজ সকালে রামিসাকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছি। সেখানে আমার স্কুলবন্ধু ইকবাল এসে মন্তব্য করেছে, ‘দম বন্ধ হওয়া একটা পরিবেশ তৈরি হইছে এই দেশে, প্রতিটা মানুষ নিজেকে অনিরাপদ মনে করছে। কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আর মাদক বন্ধ না হলে এর লাগাম টানা সম্ভব না।’

সমাজ এবং রাজনীতি নিয়েই তো আমার পড়াশোনা। ভাবছিলাম, এর প্রতিকার কী? এরপর আমার মনে হয়েছে, এর কোনো প্রতিকার নেই। কারণ যারা আমাদের সমাজটাকে ঠিক করবেন। মানে সেই রাজনীতিবিদরা (সে যে দলেরই হোক), তারা নিজেরাও অসুস্থ। এই জনপদে সবাই দাসত্ব করছে।

বাংলাদেশের কোনো সেক্টরে সঠিক মানুষটা সঠিক জায়গায় বসে নেই। এটি অসম্ভব। কারণ এখানে যোগ্যতা কোনো মাপকাঠি নয়। দাসত্বই মূল বিষয়। তাহলে এই সমাজ বদলাবে কীভাবে? যারা সমাজের চিকিৎসা করবে; তারা নিজেরাও তো অসুস্থ।

সমাজকে যদি আপনি হিউম্যান বডির (মানে মানুষের শরীরের) সাথে তুলনা করেন। আপনার শরীরের একটা অর্গ্যান যদি ঠিকমতো কাজ না করে। তখন আপনার কেমন লাগে?

ধরুন আপনার চোখটা কাজ করছে না। অথবা আপনার কিডনি ঠিকভাবে ফাংশন করছে না। কিংবা ধরুন আপনার পেটে সমস্যা। তাহলে আপনি কেমন অনুভব করবেন?

অবশ্যই আপনার মনে হবে, আমার শরীর ঠিকভাবে কাজ করছে না কিংবা আপনি অসুস্থ। এবার ঠিক বিষয়টা সমাজের ক্ষেত্রে দেখেন। সমাজের অনেকগুলো অর্গ্যান আছে- পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিরাপত্তা, গণমাধ্যম ইত্যাদি। আরও অনেক কিছু আছে। আমি স্রেফ এই কয়টার উদাহরণ দিলাম।

পরিবার আপনাকে শেখাচ্ছে- যেভাবেই হোক সফল হতে হবে। দরকার হয় অন্য কাউকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়ে হলেও ওপরে উঠতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপনাকে শেখাচ্ছে- আমরাই ‘সেরা’! আপনি যে প্রতিষ্ঠানেই যান; দেখবেন এরা সবাই সবাইকে সেরা মনে করছে। স্কুলশিক্ষকরা নকল করে শিক্ষক হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তো রাজনীতি ছাড়া আর তেমন কিছু করেই না।

সরকার শেখাচ্ছে- আমার দাস হও। এই জনপদে আসলে সরকার বলে কিছু নেই। আছে ক্ষমতা আর ক্ষমতার প্রয়োগ। ক্ষমতা পাবার সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের চাকরি দেওয়া হয় নিজের আশপাশ শক্ত করার জন্য। এরপর চলে ভাই-ব্রাদার সংস্কৃতি। বাংলাদেশে আসলে কোনো দিন সরকার ছিল না। ছিল ক্ষমতাবান কিছু মানুষ। যাদের অন্যরা স্যার স্যার করছে!

স্বাস্থ্যব্যবস্থা- প্রায় সব খাবারেই ভেজাল! আর চিকিৎসা? টাকা থাকলে বিদেশ যান; নইলে বেঘোরে মরাই ভাগ্য। কারিনার ব্যাপারটা চিন্তা করুন। বেশি দূর যেতে হবে না।

নিরাপত্তা বলে কি আছে? আমরা তো নিজ বাড়ি-ঘরেও নিরাপদ না। রামিসা তো নিজ বাসাতেই ছিল। তবুও তাকে মরতে হয়েছে।

গণমাধ্যমের চাইতে জঘন্য আর কিছু হতেই পারে না। আমার ধারণা বাংলাদেশে কোনো সাংবাদিক নাই। এদের কোনো স্ট্যান্ডার্ড নাই। সেটা তবুও মেনে নেওয়া যায়। আমাদের কারোই কোনো স্ট্যান্ডার্ড নাই। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে যখন যে সরকারে আসে; তাদের দাসত্ব করতে হবে কেন? ওই যে পদ-পদবি বাগিয়ে নিতে হবে।

তাহলে বুঝতে পারছেন তো? শরীরের একটা অর্গ্যান যদি ঠিকভাবে কাজ না করে। আপনার কিন্তু অস্থির লাগবে। আর আমাদের সমাজের যতগুলো অর্গ্যান আছে; কোনোটাই কাজ করছে না। তাহলে বোঝেন- এই সমাজের অবস্থা কতটা খারাপ।

এই জন্যই দেশে গেলে আমার আশপাশের মানুষদের এখন আর মানুষ মনে হয় না। কেমন যেন সাব-হিউম্যান মনে হয়। কেউ আবার খারাপ ভাবে নেবেন না। আমার যা মনে হয়, সেটাই বলছি। ওটা তো আমারও মাতৃভূমি। ভালোবাসি বলেই তো লিখছি। তাই আমার বন্ধুকে ফিরতি কমেন্টে বললাম, ‘দোস্ত তুই ঠিক সময়ে দেশ না ছেড়ে ভুল করেছিস। ছেলে দুটোকে অন্তত দেশে রাখিস না।’

আমার এই স্কুলবন্ধু অনেক দিন সিঙ্গাপুরে ছিল। এরপর নিজ থেকে দেশে ফিরে গেছে। সে সামর্থ্যবান পরিবারে মানুষ। আপনি তাকে ধনী বলতে পারেন। সে না হয় তার পুত্রদের বিদেশে পাঠিয়ে দেবে একটা সময়। জানি না পাঠাবে কি না। অন্তত সেই সুযোগ তার আছে। কিন্তু বাংলাদেশের কয়জন মানুষের সেই সুযোগ আছে?

৯০ ভাগ মানুষের এই সুযোগ নাই। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন? এদের বেশিরভাগই কোনো কিছুতেই প্রতিবাদ করে না। স্রেফ ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে কিংবা দাসত্ব করছে কারো না কারো। তাহলে সমাজের ভবিষ্যৎ কী?

আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নাই। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগে আমরা যখন পত্র-পত্রিকায় কলাম লিখেছি- এখনই এই সিস্টেম বদলাতে হবে। নইলে সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক; মানে যাদের আমরা স্যার জানি- তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের দাসত্ব করছিল।

ভবিষ্যতে সমাজব্যবস্থা কী হতে পারে; সেটা বাতলে না দিয়ে এরা কোনো না কোনো দলের দাসত্ব করে গেছে। এর ফল আমরা এখন পাচ্ছি। সমাজ এবং রাজনীতির একজন শিক্ষক হিসেবে বলছি, Bangladesh is on its way to collapse. এই যে দুইজন পুলিশ আজকে এভাবে একজন আরেকজনকে মেরে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। এটাই প্রমাণ করে- আমরা ধ্বংসের পথে আছি। আস্তে আস্তে এইসব বাড়বে। একটা সময় আমরা এটাকেও স্বাভাবিক মনে করবো!

বাংলাদেশ চিকিৎসার ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। ধ্বংসই এখন একমাত্র সমাধান। কেন আপনারা বুঝতে পারছেন না- আমাদের সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। সামর্থ্যবানরা কেউ দেশে থাকে না। দেশটাকে তারা স্রেফ টাকা বানানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করছে। আর আমরা হচ্ছি ওই বুর্জোয়া শ্রেণির টাকা বানানোর হাতিয়ার।

লেখক: বিশ্লেষক এবং জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, এস্তোনিয়ান এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ইউনিভার্সিটি।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow