সময়ের মুখোমুখি এক সংবেদনশীল কবি

সমকালীন বাংলা কবিতায় শামীমা নাইস এক স্বতন্ত্র উচ্চারণ। তার কবিতায় যেমন আছে সময়সচেতনতা, তেমনি আছে অন্তর্জগতের গভীর স্পন্দন। যেমন আছে সামাজিক বেদনা, তেমনি আছে ভালোবাসার সূক্ষ্ম আলো। যেমন আছে প্রতিবাদের নীরব শক্তি, তেমনি আছে আত্মমগ্ন অনুভবের স্নিগ্ধ বিস্তার। এই কারণেই শামীমা নাইসকে জীবনবোধের কবি বললে তা কোনো অলংকারমাত্র হয় না, তার কাব্যসত্তার প্রকৃত পরিচয়ই হয়ে ওঠে। শামীমা নাইসের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি কঠিন সত্যকে সহজ ভাষায় বলতে পারেন। তার শব্দচয়ন কোমল, কিন্তু ভাবনায় আছে দৃঢ়তা। তিনি জীবনকে কেবল রোমান্টিক রঙে দেখেন না, আবার নিছক অন্ধকারও আঁকেন না। মানুষের ভাঙাচোরা দিন, সমাজের নীরব সংকট, নারীর আত্মমর্যাদা, শিকড়ের শক্তি, প্রেমের পূর্ণতা, শূন্যতার অভিমান, সব মিলিয়ে তার কবিতায় এক বিস্তৃত মানবিক ভুবন গড়ে ওঠে। ‘নীরবতার ফুটনোট’ কবিতাটি পড়লে প্রথমেই বোঝা যায়, কবি সময়কে খুব তীক্ষ্ণভাবে দেখেন। এখানে দ্রব্যমূল্য, নগরায়ণ, পরিবেশ ধ্বংস, ডিজিটাল কোলাহল, সামাজিক অসাড়তা এবং নীরবতার রাজনৈতিক অর্থ, সবকিছুই অত্যন্ত সংযত অথচ কাব্যিক ভাষায় উঠে এসেছে। ‘সবকিছু মাপে, মানুষ বাদে’ এই বোধ কেবল একটি পঙ্‌ক

সময়ের মুখোমুখি এক সংবেদনশীল কবি
সমকালীন বাংলা কবিতায় শামীমা নাইস এক স্বতন্ত্র উচ্চারণ। তার কবিতায় যেমন আছে সময়সচেতনতা, তেমনি আছে অন্তর্জগতের গভীর স্পন্দন। যেমন আছে সামাজিক বেদনা, তেমনি আছে ভালোবাসার সূক্ষ্ম আলো। যেমন আছে প্রতিবাদের নীরব শক্তি, তেমনি আছে আত্মমগ্ন অনুভবের স্নিগ্ধ বিস্তার। এই কারণেই শামীমা নাইসকে জীবনবোধের কবি বললে তা কোনো অলংকারমাত্র হয় না, তার কাব্যসত্তার প্রকৃত পরিচয়ই হয়ে ওঠে। শামীমা নাইসের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি কঠিন সত্যকে সহজ ভাষায় বলতে পারেন। তার শব্দচয়ন কোমল, কিন্তু ভাবনায় আছে দৃঢ়তা। তিনি জীবনকে কেবল রোমান্টিক রঙে দেখেন না, আবার নিছক অন্ধকারও আঁকেন না। মানুষের ভাঙাচোরা দিন, সমাজের নীরব সংকট, নারীর আত্মমর্যাদা, শিকড়ের শক্তি, প্রেমের পূর্ণতা, শূন্যতার অভিমান, সব মিলিয়ে তার কবিতায় এক বিস্তৃত মানবিক ভুবন গড়ে ওঠে। ‘নীরবতার ফুটনোট’ কবিতাটি পড়লে প্রথমেই বোঝা যায়, কবি সময়কে খুব তীক্ষ্ণভাবে দেখেন। এখানে দ্রব্যমূল্য, নগরায়ণ, পরিবেশ ধ্বংস, ডিজিটাল কোলাহল, সামাজিক অসাড়তা এবং নীরবতার রাজনৈতিক অর্থ, সবকিছুই অত্যন্ত সংযত অথচ কাব্যিক ভাষায় উঠে এসেছে। ‘সবকিছু মাপে, মানুষ বাদে’ এই বোধ কেবল একটি পঙ্‌ক্তি নয়, আমাদের সময়ের নির্মম সারসংক্ষেপ। কবিতাটি স্লোগান নয়, কিন্তু সজাগ বিবেকের মতো পাঠকের সামনে দাঁড়ায়। এ কবিতায় কবির সামাজিক দায়বদ্ধতা যেমন স্পষ্ট, তেমনি স্পষ্ট তার শিল্পীসুলভ সংযম। ‘সাহসী আদিবাসী নারী’ কবিতায় শামীমা নাইস মানবসমাজের এক অবহেলিত অথচ মহিমান্বিত শক্তিকে তুলে ধরেছেন। এখানে আদিবাসী নারী কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি মাটি, বন, নদী, ইতিহাস এবং প্রতিরোধের প্রতীক। কবি তাকে করুণা বা দূরবর্তী বিস্ময়ের চোখে দেখেননি। তিনি তাকে দেখেছেন শক্তির, মর্যাদার এবং টিকে থাকার দীপ্ত প্রতিমা হিসেবে। এই কবিতার ভাষা সরল, কিন্তু তার ভেতরে আছে গভীর সম্মানবোধ। বিশেষ করে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান এবং অন্যায়ের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যে চিত্র এখানে নির্মিত হয়েছে, তা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী রেখাপাত করে। ‘শব্দের নাভি ছিঁড়ে’ কবিতাটি শামীমা নাইসের কাব্যসত্তার এক অন্তরঙ্গ আত্মপ্রকাশ। এখানে কবিতা তার আশ্রয়, পরিচয়, নিরাময় এবং পুনর্জন্মের স্থান। ‘কবিতায় আমার আজন্ম বসবাস’ উচ্চারণটি তার সৃষ্টিশীল অস্তিত্বের মর্মকথা। শব্দ, উপমা, নীরবতা, রূপক, স্বপ্ন, দুঃখ, সহনশীলতা, সবকিছু মিলিয়ে তিনি এমন এক কাব্যজগৎ নির্মাণ করেছেন, যেখানে ব্যক্তিগত বেদনা শিল্পে রূপান্তরিত হয়। এ কবিতায় আত্মজৈবনিক সুর আছে, কিন্তু তা ব্যক্তিসীমা ছাড়িয়ে সব সৃজনশীল মানুষের অন্তর্লোকের ভাষা হয়ে উঠেছে। ‘নামহীন নৈবেদ্য’ কবিতাটি বিষণ্নতা, অপূর্ণতা ও স্মৃতির এক অপূর্ব কাব্যরূপ। এখানে প্রেম আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি আছে হারানোর গোপন ব্যথা। না পাঠানো চিঠি, অব্যক্ত কান্না, অসমাপ্ত প্রার্থনা, নাম না জানা হাসি, সবকিছু মিলে কবিতাটি হয়ে উঠেছে আবেগের এক মৃদু অথচ গভীর অনুরণন। এই কবিতার বড় অর্জন হলো, এটি উচ্চকণ্ঠ নয়, তবু হৃদয়ে প্রবল অভিঘাত সৃষ্টি করে। যে শূন্যতার কথা এখানে এসেছে, তা নিছক অভাব নয়, এক গভীর অস্তিত্বজিজ্ঞাসা। অন্যদিকে ‘সম্পূর্ণা’ কবিতায় আমরা দেখি ভালোবাসার এক উজ্জ্বল, স্নেহময় ও স্বীকৃতিমূলক রূপ। এই কবিতায় নারী নিজেকে আবিষ্কার করে প্রিয়জনের মুগ্ধ দৃষ্টিতে, কিন্তু তা নির্ভরতার ভাষা নয়, পূর্ণতার ভাষা। এখানে ভালোবাসা মানে করুণা নয়, সত্যিকার স্বীকৃতি। ‘এই তো, সম্পূর্ণা নারী’ এই বোধ নারীর আত্মমর্যাদা ও স্বাতন্ত্র্যকে নতুন আলোর ভেতর প্রতিষ্ঠা করে। কবিতাটি স্নিগ্ধ, সুরেলা এবং আবেগময়। এর ভেতরে এক ধরনের নির্মল উৎসব আছে, যা পাঠকের মনকে আলোকিত করে। শামীমা নাইসের কবিতার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি জটিলতাকে দুর্বোধ্য করেন না। তার ভাষা সহজ, কিন্তু একেবারেই সরলরৈখিক নয়। চিত্রকল্পে আছে সৌন্দর্য, অনুভবে আছে গভীরতা, আর ভাবনায় আছে এক ধরনের নৈতিক স্বচ্ছতা। তিনি জানেন কোথায় নীরব হতে হয়, কোথায় উচ্চারণকে সংক্ষিপ্ত রাখতে হয়, কোথায় একটি মাত্র বাক্য দিয়েই পাঠকের ঘুম ভাঙিয়ে দিতে হয়।  শামীমা নাইসের সাহিত্যিক পথচলাও ইতোমধ্যেই  সমৃদ্ধ। এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ। ‘নিমগ্ন প্রার্থনায় তুমি’, ‘শূন্যতার প্রতিবিম্বে অতল জোছনা’, ‘নিঃসঙ্গ অরণ্যে নীল ঘাসফুল’, ‘বৈরী বসন্তে অনায়ত্ত অন্তর্লোক’ এবং এ বছর প্রকাশিত ‘শরতের মাঝপথে সোনালি রোদ্দুর’ তার কবিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই গ্রন্থগুলোর নামেই তার কাব্যস্বভাবের পরিচয় মেলে। সেখানে আছে প্রার্থনা, শূন্যতা, জোছনা, নিঃসঙ্গতা, অরণ্য, অন্তর্লোক, শরৎ, রোদ্দুর। অর্থাৎ প্রকৃতি, মনন, বেদনা, আলো এবং আত্মজিজ্ঞাসা তার কবিতার স্থায়ী অনুষঙ্গ। শুধু কাব্যগ্রন্থেই নয়, লিটল ম্যাগাজিন, দৈনিক পত্রিকা এবং বেতার বাংলায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে তার কবিতা। এই ধারাবাহিক উপস্থিতি প্রমাণ করে, তিনি কেবল একটি ক্ষণিক উজ্জ্বল নাম নন, তিনি নিরলস সৃষ্টিশীলতায় বিশ্বাসী একজন নিবেদিত কবি। পাঠকের সঙ্গে তার এই স্থায়ী সংযোগই একজন প্রকৃত সাহিত্যস্রষ্টার বড় পরিচয়। সৃজনশীল সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য শামীমা নাইস একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ভাষা ও সাহিত্য কল্যাণ পরিষদ থেকে অক্ষরজ্যোতি শিল্পিত গুণীজন সম্মাননা, রাজশাহী ছড়া সংসদ থেকে কবিতায় সম্মাননা, জননী গ্রন্থাগার ও সাংস্কৃতিক সংস্থা থেকে কথাসাহিত্যে সম্মাননা, শেরপুর সংস্কৃতি পরিষদ থেকে কবিতায় সম্মাননা, জ্ঞানসঙ্গী প্রকাশনা থেকে কথাসাহিত্যে সম্মাননা এবং Asia Human Rights Foundation থেকে Immense Contributions in Literature সম্মাননা তার সাহিত্যকর্মের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার সাক্ষ্য বহন করে। এছাড়াও আরও বিভিন্ন সংগঠনের স্বীকৃতি তার সৃষ্টিশীল অর্জনকে সমৃদ্ধ করেছে। এই সম্মাননাগুলো কেবল পুরস্কার নয়, তার সাহিত্যপ্রতিভার প্রতি সমাজের আস্থার বহিঃপ্রকাশ। সব মিলিয়ে শামীমা নাইস এমন এক কবি, যিনি জীবনের দিকে তাকান সংবেদনশীল চোখে, সমাজকে দেখেন জাগ্রত বিবেকে, প্রেমকে অনুভব করেন গভীর মানবিকতায়, আর শব্দকে ব্যবহার করেন আলোকিত আত্মময়তায়। তার কবিতায় রয়েছে সময়ের স্পন্দন, হৃদয়ের নীরবতা, প্রতিবাদের সৌন্দর্য, নারীর মর্যাদা এবং মানুষের প্রতি অবিচল মমতা। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, কবিতা কেবল ভাষার অলংকার নয়, এটি বেঁচে থাকার শক্তি, সত্য বলার ভরসা এবং আত্মাকে জাগিয়ে রাখার শিল্প। শামীমা নাইসের কবিতা তাই শুধু পড়ার বিষয় নয়, অনুভবের বিষয়। তার কবিতা আমাদের থামতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, দেখতে শেখায়, আর ভেতরে ভেতরে মানুষ হয়ে উঠতে শেখায়। এই দীপ্ত জীবনবোধ, এই মানবিক গভীরতা এবং এই শিল্পিত সংযমই তাকে সমকালীন বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় কণ্ঠে পরিণত করেছে। ‘নীরবতার ফুটনোট’ এই সময়টা  বড় হিসেবি— সবকিছু মাপে, মানুষ বাদে। এক পাশে দ্রব্যমূল্যের গ্রাফ, উঠতে উঠতে আকাশ ছোঁয়— নিচে পড়ে থাকে মানুষের মুখ, যাদের হাসি এখন বিলাসিতা। বাজারে ঢুকলেই বোঝা যায়, দাম শুধু পণ্যের বাড়ে না, কমে যায় সহ্যশক্তি। চালের বস্তায় ঝুঁকে থাকে দুপুর, তেলের বোতলে বন্দি উৎসব। শহরটা প্রতিদিন একটু উঁচু হয়— কাঁচের মুখ, লোহার হাড়। গাছেরা হারিয়ে যায় পরিকল্পনার ভাঁজে, নদীটা আজ শুধু একটি রেখা— জল নেই, স্মৃতি আছে; যেন নীরবে মরে যাওয়ার দীর্ঘ অনুশীলন। ডিজিটাল আলোয় ঝলসে ওঠে রাত। সবাই কথা বলে, শোনার সময় নেই কারো। প্রতিবাদ ফিল্টার হয়ে যায় ট্রেন্ডে, ক্ষোভ সাজানো থাকে এমনভাবে যাতে অস্বস্তি না লাগে। ভয়টা এখানেই— যখন চুপ থাকাকে বলা হয় পরিপক্বতা, আর প্রশ্ন করাটাই অসংযম। যখন ভুলের পাশে দাঁড়িয়ে নির্ভার কণ্ঠে বলা হয়— “এটাই তো নিয়ম।” তবু কিছু মানুষ নিয়ম মানে না। একটি সোজা বাক্যে তারা ঘুম ভাঙায়। এই লেখা কোনো শ্লোগান নয়, এটা একটি চিহ্ন— মুছতে গেলে, আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘সাহসী আদিবাসী নারী’ সে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, নাম না জানলেও সবাই তাকে চেনে। তার পায়ে মাটির স্মৃতি, চুলে জড়িয়ে থাকে বাতাসের ইতিহাস। আগুন তার মননে,চেতনায় ভয় আর অভাবের মাঝেও সে জ্বালিয়ে রাখে বেঁচে থাকার আলো। সে বই থেকে না শিখেও জানে কীভাবে বনকে মা বলতে হয়, কীভাবে নদীর কাছে মাথা নত করতে হয় আর অন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে হয় শিরদাঁড়া শক্ত করে! সভ্যতার চোখ রাঙানি তাকে নত করেনি। সে জানে— শক্তি মানে উচ্চস্বরে চিৎকার নয় শক্তি মানে টিকে থাকা, রক্ষা করা, এগিয়ে যাওয়া। সে আদিবাসী নারী— শিকড় তার গভীরে, মুখ তার আলোয়। সে শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, আজও দাঁড়িয়ে আছে— সাহসের চোখে চোখ রেখে। শব্দের নাভি ছিঁড়ে  কবিতায় আমার আজন্ম বসবাস— আমি এখানে জন্মাই প্রতিদিন, শব্দের নাভি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে আলো, শব্দই আমার ঠিকানা, উপমার জানালায় ঝুলে থাকে রোদ–বৃষ্টি, নিঃশ্বাসের গায়ে লেগে থাকে চাঁদের ধুলো। আমার ঘরের দেয়াল গড়া অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাসে, ছাদ থেকে টুপটাপ ঝরে পড়ে অধরা স্বপ্নের বৃষ্টি। যখন পৃথিবী আমাকে বুঝতে পারে না, আমি কবিতার বুকে মাথা রাখি— সে আমার কপালে এঁকে দেয় নীরবতার টিপ, আর বুকের ভেতর জ্বালিয়ে রাখে সহনশীল এক সূর্য। দুঃখ এখানে নদী হয়ে আসে, আমি তাকে ছন্দে বাঁধি, যন্ত্রণা এলে উপমার আঁচলে ঢেকে দিই তার মুখ। সবচেয়ে গভীর রাতে, যখন নিজের নামটুকুও ভারী লাগে, কবিতা আমাকে ডাক দেয়— “এসো, তোমার আবছায়া আলোটা এখানে রাখো।” কবিতায় আমার আজন্ম বসবাস, কারণ আমি হারিয়ে গেলে শব্দেরা আমাকে খুঁজে পায়, আর ভেঙে পড়লে রূপকগুলোই হয় আমার মেরুদণ্ড। নামহীন নৈবেদ্য   তোমার করতলে আজ তুলে দিলাম ক্ষয়ে যাওয়া বসন্তের সব কোলাহল— যে বসন্ত ফুল ফোটায় না,পাখিরা গান ধরে না, শুধু স্মৃতির গন্ধ ছড়ায়। তোমার কাছে না পাঠানো সেই চিঠিগুলো যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় ঘুমিয়ে আছে অব্যক্ত কান্নার মৌন ব্যাকরণ; অজানা দ্বিধায়,সুখ নষ্ট হয়ে যাবার ভয়ে অসমাপ্ত প্রার্থনা হয়ে রয়ে গেছে বুকের গভীরে।  একদিন বিকেল জুড়ে নাম না জানা হাসি  বসে থাকতো আমাদের পাশে, রোদে–রোদে প্রেম শিখেছিল আমাদের বিশ্বাস আর সন্ধ্যা মানেই ছিল আশ্বাস; সবটুকু সুখ, সব স্বপ্নের সৃজনশীল আলো, সব ‘হতে পারত’ ভবিষ্যৎ। আমার জন্য রেখে দাও শুধু সেই শূন্যতা— যেখানে শব্দ থেমে যায়, আলো মাথা নোয়ায়, আর আমি আজ রাতে নিজের বিশ্বাসের সামনে নতজানু হব। কারণ কিছু মানুষ ভালোবাসা দেয় পূর্ণ হাতে, আর নিজে বাঁচে শূন্যতার মাঝে! সম্পূর্ণা তুমি ছাড়া— আমাকে বেলকুঁড়ির গাজরায় সাজানোর এই মায়াবী সাধ আর কারো হয়নি কোনোদিন। ফুলের দোকানের কোলাহল পেরিয়ে সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে কোমল বুকেটটি হাতে তুলে দিয়ে কেউ বলেনি— তোমার সৃষ্টিশীলতার জন্য অভিনন্দন; শুধু তোমার চোখই জানিয়েছিল কথাহীন এক স্বীকৃতি। আমি কারো করুণা চাইনি, চাইনি আধখানা মুগ্ধতার ছায়া— চেয়েছি একজোড়া চোখ, যেখানে নিজেকে দেখে বলতে পারি— এই তো, সম্পূর্ণা নারী! তোমার দৃষ্টিতে আমি হয়ে উঠেছি অখণ্ড পৃথিবী, তোমার বজ্র-মুগ্ধতায় আমি সৌদামিনী— আলো হয়ে নামা এক মুহূর্ত। খোঁপায় বেলকুঁড়ি গুঁজে দিয়ে যেদিন তুমি বলেছিলে— আমি নাকি তোমার প্রিয় ফুল, আমি বিশ্বাস করেছি মাটির মতো, জলের মতো মনেপ্রাণে। তোমার যত্নে আমার দিনগুলো ভিজে উঠেছে ভালোবাসার জলে। তুমি পাশে থাকলে আমার সাধারণ দিনগুলো উৎসবের ঘুঙুর পরে, সময়ও তখন আনন্দধারায় হেঁটে যায়। তোমার মুগ্ধ দৃষ্টিতেই ধীরে ধীরে নিজেকে পূর্ণ করি, নিজের ভেতরেই আবিষ্কার করি এক অনন্য সত্তা— হয়ে উঠি সম্পূর্ণা, অদ্বিতীয়া।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow