সাগরপাড়ে যেদিন রক্তই হলো উপহার

বেলা তখন বারোটা। কক্সবাজারের ক্যাপ্টেন কক্স হলরুমে সারি বেঁধে বসে আছেন হোটেলের কর্মীরা। কেউ নিরাপত্তাকর্মী, কেউ রান্নাঘরের মানুষ, কেউ হাউসকিপিং থেকে আসা। বাইরে ঝলমলে রোদ, সাগরের ঢেউয়ের শব্দ। আর ভেতরে- হাতের শিরায় সুই গেঁথে দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। রক্ত বেরিয়ে আসছে। লাল, উজ্জ্বল। এই রক্ত কারো শরীরে নয়, যাবে অন্য কোনো মানুষের শরীরে। হয়তো কোনো থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর। হয়তো কোনো প্রসূতির। হয়তো দুর্ঘটনায় পড়া কোনো পর্যটকের। মঙ্গলবার কক্সবাজারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসে এভাবেই হলো একটি ভিন্ন উৎসব- রক্তদান কর্মসূচি। কক্সবাজার জেলায় বছরে চল্লিশ হাজার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন পড়ে। শুধু সদর হাসপাতালেই লাগে পঁচিশ হাজার ব্যাগ। আর শহরে ছয়শোরও বেশি থ্যালাসেমিয়া রোগী আছেন, যাদের নিয়মিত রক্ত না পেলে বাঁচা দায়। ২৫০ শয্যার কক্সবাজার সদর হাসপাতালের নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের সমন্বয়ক আবু তাহের টিপু বললেন, 'পর্যটন সেবার পাশাপাশি তারকা হোটেলের কর্মীরা সারা বছরই রক্ত দিচ্ছেন। এবার ওশান থেকে সংগ্রহ করা রক্ত সরাসরি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের কাছে পৌঁছাবে।' হোটেলের নিরাপত্তাকর্মী এমদাদুল এক

সাগরপাড়ে যেদিন রক্তই হলো উপহার

বেলা তখন বারোটা। কক্সবাজারের ক্যাপ্টেন কক্স হলরুমে সারি বেঁধে বসে আছেন হোটেলের কর্মীরা। কেউ নিরাপত্তাকর্মী, কেউ রান্নাঘরের মানুষ, কেউ হাউসকিপিং থেকে আসা। বাইরে ঝলমলে রোদ, সাগরের ঢেউয়ের শব্দ। আর ভেতরে- হাতের শিরায় সুই গেঁথে দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। রক্ত বেরিয়ে আসছে। লাল, উজ্জ্বল। এই রক্ত কারো শরীরে নয়, যাবে অন্য কোনো মানুষের শরীরে। হয়তো কোনো থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর। হয়তো কোনো প্রসূতির। হয়তো দুর্ঘটনায় পড়া কোনো পর্যটকের।

মঙ্গলবার কক্সবাজারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসে এভাবেই হলো একটি ভিন্ন উৎসব- রক্তদান কর্মসূচি।

কক্সবাজার জেলায় বছরে চল্লিশ হাজার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন পড়ে। শুধু সদর হাসপাতালেই লাগে পঁচিশ হাজার ব্যাগ। আর শহরে ছয়শোরও বেশি থ্যালাসেমিয়া রোগী আছেন, যাদের নিয়মিত রক্ত না পেলে বাঁচা দায়।

২৫০ শয্যার কক্সবাজার সদর হাসপাতালের নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের সমন্বয়ক আবু তাহের টিপু বললেন, 'পর্যটন সেবার পাশাপাশি তারকা হোটেলের কর্মীরা সারা বছরই রক্ত দিচ্ছেন। এবার ওশান থেকে সংগ্রহ করা রক্ত সরাসরি থ্যালাসেমিয়া রোগীদের কাছে পৌঁছাবে।'

হোটেলের নিরাপত্তাকর্মী এমদাদুল একটু আগেই রক্ত দিয়েছেন। হাতে তুলো চেপে বসে আছেন। জিজ্ঞেস করতেই মুখে হাসি ফুটল। তিনি বলেন, 'আমরা পর্যটকদের সেবা করি। কিন্তু আজ মনে হলো একটু বড় কিছু করলাম।'

পাশে এফঅ্যান্ডবি বিভাগের দিদারুল ইসলাম। তিনিও রক্ত দিয়েছেন। বললেন, 'হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাদের সুযোগ দিল- শুধু সেবা নয়, জীবন বাঁচানোর অংশ হওয়ার।'

মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক মাহবুবুল ইসলাম জানালেন, শুধু আজকের জন্য নয়, এই উদ্যোগ চলবে। যাদের রক্ত আজ সংগ্রহ হয়নি, তাদের তালিকা রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগে জমা থাকবে। হাসপাতাল থেকে ফোন এলেই ছুটে যাবেন সেই কর্মী- রক্ত দিয়ে আসবেন।

হোটেলের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু উদ্বোধনী বক্তৃতায় বললেন এমন কথা, যা সহজে ভোলার নয়- 'জগতের সকল সৃষ্টির মাঝে মানুষ আশরাফুল মাখলুখাত। আর সেই সেরা সৃষ্টির সবচেয়ে মহৎ কর্ম- স্বেচ্ছায় রক্তদান। খোদা মানুষকে দিয়েছেন তার লাল ভালোবাসা। সেই ভালোবাসায় অন্যের জীবন বাঁচানোর সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। দানে রক্ত কমে না, বরং পরিশুদ্ধ হয়।'

পর্যটন শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে একযুগ আগে সাগরপাড়ে যাত্রা শুরু করেছিল ওশান প্যারাডাইস। সেই থেকে জাতীয়-আন্তর্জাতিক দিবস পালন, নববর্ষ উদযাপনের পাশাপাশি হোটেলটি সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা ভুলে যায়নি। কোভিডের পর থেকে প্রতি বছর লটারির মাধ্যমে কর্মীদের মধ্য থেকে দুজনকে পাঠানো হচ্ছে ওমরাহ হজে, একজনকে কোরবানির হজে।

হলরুমে সেদিন শতাধিক কর্মীর রক্তের গ্রুপ নির্ণয় হলো। বারোজনের রক্ত সংগ্রহ হলো। আর তৈরি হলো একটি তালিকা- যে তালিকায় লেখা আছে এমন সব মানুষের নাম, যারা প্রয়োজনে অচেনা কারো জীবন বাঁচাতে ছুটে যেতে রাজি। সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল তীরে। বলরুমের ভেতর থেকে সেই শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। কিন্তু অন্য এক শব্দ ছিল- রক্তের প্রবাহের শব্দ, যা শুধু কানে নয়, বুকে অনুভব হয়।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow