ড. একে এম আব্দুল মোমেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের দাপুটে আরেক নেতা, সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ছোটভাই একেএম আব্দুল মোমেন। দুই ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল শেখ পরিবারের সঙ্গে। এমনকি খোদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই সহোদরকে সমীহ করতেন।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পুরোটা সময় দেশেই ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ড. একে আব্দুল মোমেন। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের মতো তিনিও আত্মগোপনে চলে যান। এরপর দেশের ভেতরেই আত্মগোপনে থাকেন টানা ৮ মাস।
জানা গেছে, ড. একেএম আব্দুল মোমেন জনসমাগম এড়িয়ে ধরা পড়ার ভয়ে একাধিকবার বাসা বদল করে পালিয়ে থেকেছেন। লোকেশন ট্র্যাকিংয়ের ভয়ে মোবাইল ফোনের সিম পরিবর্তন করেছেন সর্বমোট ৬ বার। চেহারায়ও এনেছেন আমূল পরিবর্তন। রেখেছেন দাঁড়িও। সম্প্রতি মিডিয়ার সামনে হাজির হয়ে জানালেন তার বর্তমান অবস্থান, তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন।
ড.একেএম আব্দুল মোমেন সম্প্রতি নিজেই মিডিয়ার সামনে হাজির হয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই জানিয়েছেন দেশে পালিয়ে থাকার পুরো ঘটনা। তবে কীভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র্রে পৌঁছালেন সেটি বলেননি। নিজেই জানিয়েছেন বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র- এখনো সে ঘটনা বলার সময় আসেনি জানিয়ে যারপরনাই এ নিয়ে রহস্যও জিইয়ে রাখলেন তিনি।
জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র্রে থাকা এক বাংলাদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে তিনি ভার্চ্যুয়াল মিডিয়ায় কথা বলেন। ওই ইন্টারভিউতে ড. মোমেন বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়ে তিনি আমেরিকাতেই ছিলেন। সেখান থেকে কয়েক দিন আগে দেশে ফেরেন। আর তিনি আসার পরপরই গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। ফলে তাকেও আওয়ামী লীগের অন্য এমপি-মন্ত্রীদের মতো আত্মগোপনে যেতে হয়েছে।
ভার্চুয়াল মিডিয়ায় ওই সাংবাদিক মোমেনকে প্রশ্ন করেছিলেন, কীভাবে তিনি দেশ ছেড়েছেন। সে প্রশ্নের উত্তর তিনি দেননি। তার আগে দেশের ভেতরে পালিয়ে থাকার কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেন। বলেন, ‘এটা একটা সিনেমা হতে পারে। সুন্দর মুভি হবে। আই ওয়াজ দ্য লাস্টম্যান টু লিভ দ্য কান্ট্রি। আমি কোনো অন্যায় করিনি। কাউকে কোনোদিন জেলে পাঠাইনি। কোনো চুরি-চামারি করিনি। সো আই ওয়াজ কনফিডেন্ট। আমি কেন পালাবো? কিন্তু যখন কর্নেল সাব আমাকে ফোন করে বললেন; স্যার উই উইল প্রটেক্ট ইউ। তখন আমার সবাই বললো- স্যার আপনার মোবাইল নাম্বার পেয়ে গেছে। এখান থেকে পালান।’
ড. একে মোমেন বলেন, ‘আমি কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাইনি। আমার সব আত্মীয়-স্বজন পাবলিকলি নোউন। আমি অন্যান্য লোকের যেমন রেন্ট হাউসের বাড়িতে ছিলাম। এইটা আমার খুব কাজে দিয়েছে। এক বাসার মালিকের সাথে দেখা হয়েছিলো। সেই মালিককে আমি জিজ্ঞেস করলাম; আপনার বাসাটা তো সুন্দর। উনাকে আমি আগে চিনতাম। উনি এসে বললেন; আমরা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। হোটেলে আমাদের বায়ারকে রাখি না। বাসায় রাখি। এজন্য বাসা সুন্দর করে রাখি। এখন যেহেতু দেশে কোনো বায়ার আসতেছে না, কেউ আসলে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংকক পর্যন্ত আসে। ঢাকায় ভয় পায় আসে না। সেজন্য সব খালি। তার জন্য আপনি ভাড়া পাচ্ছেন।’
পালিয়ে থাকার বিবরণ তুলে ধরে ড. মোমেন বলেন, ‘আমি পালিয়ে পালিয়ে ছিলাম। যাতে বাইরে কেউ না চিনতে পারে, একসাথে মবের শিকার হবার আশঙ্কায় চেহারা-টেহারা সব পরিবর্তন করে ফেলেছি। এক বাসায় গেলাম সার্টেন টাইমে। ওই বাসায় এক নাপিত এলো। সেটি আমার বাসা না। আরেকজনের বাড়িতে। যাতে ওই নাপিত কাউকে বলতে পারে না কোথায় আমার সাথে দেখা হয়েছে। এটা লং স্টোরি। বহুত কষ্ট করে বের হয়েছি। আমার বউয়ের প্রেসারে ও উনার বুদ্ধিতে বের হয়েছি। এই যে বের হইছি কিছু জানি না। কারণ আমি তো ফোনে কথা বলতে পারি না। সি মেক দিস এরেঞ্জমেন্ট। দেশে অনেক ফড়িয়া আছে আপনাকে বিদেশ পাঠানোর জন্য। ওগুলো সবগুলোই মানি মেকিং। শুধু টাকা নেয়। আমি জীবিত আছি। আর মানুষের দোয়া। বহু লোক আমার জন্য দোয়া করেছে। ওমরাহ্ হজ করেছে। আমি তো অনেককেই চিনি না। বাট ডিড ইট।’
প্রশ্ন করা হয়েছিলো বাই এয়ারে সরাসরি শাহ্জালাল থেকে এসেছেন না অন্য কোনো বিমানবন্দর থেকে? জবাবে ড. মোমেন জানান, ‘না না বিমানবন্দর তো আপনি যেতেই পারবেন না। ধারে কাছেও না। এটা পালাইয়া আসছি। কীভাবে? বিভিন্নভাবে পালিয়ে আসছি। বলা যাবে কোনো এক সময়। এখনো বলতে চাচ্ছি না। কারণ, সরকারি লোকরাই আমাকে সাহায্য করেছে।’
কথা শেষে ড. মোমেন জানান, ‘আমরা সাদাসিধে মানুষ। দেশটাকে বাঁচাতে হবে। দেশটাকে জঙ্গি দেশ বানাতে চাই না। এ ব্যাপারে সবার উদ্যোগ নেয়া দরকার।’
উল্লেখ্য, চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হামলার ঘটনায় সিলেটের বিভিন্ন থানায় দায়েরকৃত হত্যা, হামলা-ভাংচুর ও বিস্ফোরক আইনে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ড. একেএম আব্দুল মোমেন।