সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

স্বল্প বেতনের সরকারি চাকরি হলেও জীবনযাপন বিলাসিতার চূড়ায়— এমন বৈপরীত্য ঘিরে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে উঠেছে বিস্ফোরক সব দুর্নীতির অভিযোগ। অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা এই কর্মকর্তাকে ঘিরে স্থানীয় মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাসিক প্রায় ৪৫ হাজার টাকার বেতনের বিপরীতে জাকির হোসেন গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। দুর্নীতি, জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। সরেজমিনে জানা যায়, মির্জাপুরের তেলিনা এলাকায় ৫৪ শতাংশ জায়গা রয়েছে। সরকারি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে যার মূল্য দলিলে দেখানো হয়েছে ৩০ লক্ষ ৫৫ লাখ টাকা, অথচ সেই জমির ন্যায্য মূল্য কয়েক কোটি টাকারও বেশি। তেলিনা এলাকায় একটি মার্কেট সহ ১১ শতাংশ আরও একটি জমি কিনেছেন যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। এছাড়াও তেলিনা এলাকায় আরও  সাড়ে ৮ শতাংশ জায়গা কিনেছেন যার মূল্য দলিলে ৩ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হলেও বর্তমান মূল্য রয়েছে কয়েক কোটি টাকারও বেশি। এছাড়াও তার নামে রয়েছে বিলাসবহুল একটি গাড়ি। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা এবং দুর্নীতি দমন কমি

সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

স্বল্প বেতনের সরকারি চাকরি হলেও জীবনযাপন বিলাসিতার চূড়ায়— এমন বৈপরীত্য ঘিরে সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে উঠেছে বিস্ফোরক সব দুর্নীতির অভিযোগ। অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা এই কর্মকর্তাকে ঘিরে স্থানীয় মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাসিক প্রায় ৪৫ হাজার টাকার বেতনের বিপরীতে জাকির হোসেন গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। দুর্নীতি, জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এসব সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সরেজমিনে জানা যায়, মির্জাপুরের তেলিনা এলাকায় ৫৪ শতাংশ জায়গা রয়েছে। সরকারি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে যার মূল্য দলিলে দেখানো হয়েছে ৩০ লক্ষ ৫৫ লাখ টাকা, অথচ সেই জমির ন্যায্য মূল্য কয়েক কোটি টাকারও বেশি। তেলিনা এলাকায় একটি মার্কেট সহ ১১ শতাংশ আরও একটি জমি কিনেছেন যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। এছাড়াও তেলিনা এলাকায় আরও  সাড়ে ৮ শতাংশ জায়গা কিনেছেন যার মূল্য দলিলে ৩ লক্ষ ৬১ হাজার টাকা দেখানো হলেও বর্তমান মূল্য রয়েছে কয়েক কোটি টাকারও বেশি। এছাড়াও তার নামে রয়েছে বিলাসবহুল একটি গাড়ি।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে দেওয়া অভিযোগ সূত্র থেকে জানা যায়, দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গেই নিজেকে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হতে লুকানোর মাধ্যমে সিন্ডিকেটের সাথে আঁতাত করে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের মাধ্যমে ঢাকা জেলার সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি নিয়ে কর্মরত আছেন। 

তিনি সাব রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করার পর হতে ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা নিয়ে অঢেল অর্থ ও সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। সে ছাত্রজীবনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার নাম ভাঙ্গিয়ে টেন্ডার বাজিসহ নানা অপকর্ম করতেন। চাকুরিতে প্রবেশের শুরু হতেই অর্জন করেছেন কোটি কোটি টাকা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গেই নিজেকে বিএনপির লোক বলে দাবি করছেন। 

চাকুরি শুরু হতেই প্রতিটি অফিসেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রেজিস্ট্রি, ভুয়া দাতা সাজিয়ে জাল দলিল করেছেন, সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে, পে-অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে নিজে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অঙ্কের টাকা। চাকুরি জীবনের দুই বছরের মাথায় নিজ জেলা টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে করেছেন ছয়তলা আলিশান বাড়ি এবং কিনেছেন গাড়ি। মির্জাপুর উপজেলার বাওয়ার কুমারজানি মৌজার পৌর মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় কিনেছেন ১ বিঘা জমি ৫ কোটি টাকা দিয়ে। তিনি তার শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ৩ একর জমিতে করেছেন মাছের ঘের। স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়িের নামে কিনেছেন কয়েক একর জমি। তার স্ত্রীর নামে কিনেছেন শত ভরি স্বর্ণালংকার। স্ত্রীর মাসিক হাত খরচ ২ লক্ষ টাকা যা তিনি বিভিন্ন আত্মীয়ের নিকট বলে থাকেন।

এছাড়া নিকট আত্মীয়দের নামে ও বেনামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে করেছেন কোটি কোটি টাকার এফডিআর। স্ত্রী ও সন্তানের নামে ঢাকায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। ঢাকার মোহাম্মদপুরে স্ত্রীর নামে ২৫০০ বর্গফুটের আলিশান ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। তিনি ঢাকার মিরপুরে ৫ কাঠা জমি কিনে নির্মাণ করছেন ৭ তলা বাড়ি যা তিনতলা পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। নিজের পরিবারের জন্য ব্যবহার করেন একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। ছেলেকে পড়াচ্ছেন দেশের নামি দামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যার মাসিক বেতন ৩০,০০০ টাকা। তিনি তার বর্তমান কর্মস্থল সাভার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে যাতায়াতে তিনি তার ক্রয়কৃত গাড়ী ব্যবহার না করে ব্যবহার করেন ভাড়া গাড়ী যার মাসিক ভাড়া দিতে হয় ৭০,০০০ টাকা যা বেতনের সাথে অসংগতিপূর্ণ। 

তিনি সম্প্রতি সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি নিয়ে দলিল লেখকদের বলেন, আমি উপর মহলে ৫ কোটি টাকা দিয়ে বদলি নিয়ে এসেছি সাভার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে। আমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। 

তিনি বলেন, চাহিদা মত টাকা না দিলে দলিল হবে না। কোন দলিল লেখক আমার চাহিদা মত টাকা না দিলে আমি তার লাইসেল খেয়ে ফেলবো বলে হুমকি প্রদান করেন। তিনি অসাধু দলিল লেককদের সাথে সিন্ডিকেট করে জমির শ্রেণি পরিবর্তন সহ নানা, জাল দাতার মাধ্যমে জাল দলিল করা, সরকারি রাজস্ব ফাকি, ভূমি অপরাধ আইন অমান্য করা সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। 

শুধু স্থাবর সম্পত্তিই নয়, জাকির ও তার স্ত্রী মনিরা সুলতানার ব্যাংক হিসাব ঘেঁটে প্রায় ১২ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। নিজ জেলা টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তার পরিবারের নামে কেনা হয়েছে অঢেল সম্পত্তি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মির্জাপুরের বিভিন্ন মৌজায় একাধিক জমি ক্রয়ের পাশাপাশি বন বিভাগের জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে মার্কেট ও বাংলো বাড়ি। এমনকি কোটি টাকা ব্যয়ে পোলট্রি খামার ও গরুর খামার স্থাপনের প্রস্তুতির কথাও জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দলিল সম্পাদনের। সাভারের বিলামালিয়া ও বড়বরদেশী মৌজায় জমি রেজিস্ট্রেশন ও মিউটেশনের ওপর উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জাকির হোসেন তা অমান্য করে গোপনে দলিল সম্পাদন করছেন। বিনিময়ে জমির মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের ঘুষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন অফিস শেষে তিনি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে বাসায় ফেরেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এছাড়াও অফিস চলাকালীন সময়েই মাদক সেবন করে সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন জাকির। বিষয়টি প্রমাণে তার ডোপ টেস্টের দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর ও আইন মন্ত্রণালয়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও, এখন পর্যন্ত তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে তদন্ত থমকে আছে, ফলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এই কর্মকর্তা।

নিবন্ধন পরিদর্শক জেনারেলের (আইজিআর) ড্রাইভারের আপন ছোট ভাইয়ের প্রভাবে সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সিন্ডিকেট বাণিজ্যে দিশেহারা ভুক্তভোগীরা। এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের ও ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে।

অভিযোগ রয়েছে, ভালুকা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বদলি হয়ে দেড় মাস আগে সাভারে যোগদান করার পর থেকেই আপেল নামের ওই ব্যক্তি প্রভাব খাটিয়ে অফিসের কার্যক্রম নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। সাব-রেজিস্টার মো. জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগসাজশে দলিল নিবন্ধনের নামে চলছে অনিয়ম ও অর্থ বাণিজ্য।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিটি পাওয়ার দলিলের ক্ষেত্রে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাংক ড্রাফট ছাড়াই আদায় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। কেউ প্রতিবাদ করলে দলিল রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। প্রকাশ্যেই চলছে অবৈধ লেনদেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, গত দেড় মাসে আমরা আপেলের দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। অফিসের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন তার হাতে। তার নির্দেশ ছাড়া সাব-রেজিস্টার কোনো দলিলে স্বাক্ষর করেন না। আগে এই অফিসে এমন পরিস্থিতি ছিল না।

সাধারণ সেবা নিতে আসা মানুষজনও প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ করছে, তবে রহস্যজনক কারণে কোনো প্রতিকার মিলছে না।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow