সিসিকের বর্জ্য থেকে সম্পদ, নাকি দূষণের নতুন ফাঁদ
৫০০ টন বর্জ্যের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে ১৫০ টন স্তূপ করা হচ্ছে বিশাল পরিমাণ বর্জ্য প্ল্যান্ট থেকে নির্গত বিষাক্ত পানি জলাশয়ে পরিবেশ রক্ষায় চারপাশে যখন টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার বার্তা, তখন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশের প্রথম ‘ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি’ (এমআরএফ) প্লান্টে প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হলেও পরিবেশগত সুফলের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ। প্রতিদিন ৫০০ টন বর্জ্যের শহর প্রায় ১০ লাখ মানুষের নগরী সিলেটে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নেওয়া হয়। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ’র যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় অত্যাধুনিক এমআরএফ প্লান্ট। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন হওয়া এই প্লান্টে বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য পৃথকীকরণ করা হচ্ছে। এখান থেকে প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরও পড়ুন- ‘নির্মল বাতাস
- ৫০০ টন বর্জ্যের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে ১৫০ টন
- স্তূপ করা হচ্ছে বিশাল পরিমাণ বর্জ্য
- প্ল্যান্ট থেকে নির্গত বিষাক্ত পানি জলাশয়ে
পরিবেশ রক্ষায় চারপাশে যখন টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার বার্তা, তখন সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দেশের প্রথম ‘ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি’ (এমআরএফ) প্লান্টে প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত হলেও পরিবেশগত সুফলের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ।
প্রতিদিন ৫০০ টন বর্জ্যের শহর
প্রায় ১০ লাখ মানুষের নগরী সিলেটে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে নেওয়া হয়। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ’র যৌথ উদ্যোগে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয় অত্যাধুনিক এমআরএফ প্লান্ট।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উদ্বোধন হওয়া এই প্লান্টে বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য পৃথকীকরণ করা হচ্ছে। এখান থেকে প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করে পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন-
‘নির্মল বাতাসের শহর’ রাজশাহী এখন শুধু অতীত কথা
উন্নত যোগাযোগে বিপন্ন পরিবেশ
সিটি করপোরেশন বলছে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে। আগামীতে আরও অনেক প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে। এই প্রকল্পে কারিগরি সহযোগিতা দেওয়ায় প্রতিদিনের প্লাস্টিক ও পলিথিন লাফার্জকে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো আলাদা করে বিট বানিয়ে বিক্রি করার মতো জায়গা বা জনবল বর্তমানে আমাদের নেই। পর্যাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল হ্যান্ড নিয়োগ করতে সময় লাগবে।
এমআরএফ প্লান্ট
পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে সিলেট সিটি করপোরেশন ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ যৌথভাবে ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটির প্রক্ল্পটি চালু করেছে। প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ প্লান্ট বসানো হয় দক্ষিণ সুরমা লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে। ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এটি উদ্বোধন করা হলেও মূলত কাজ শুরু হয়েছে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে নগরীর বর্জ্যকে পৃথক করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান উদ্ধার, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং ডাম্পিং স্টেশনের ওপর চাপ হ্রাসের কথা ছিল। তবে উদ্বোধনের প্রায় দেড় বছর পর বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
প্ল্যান্টে পৃথক করা বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের বড় অংশ এখনো ডাম্পিং স্টেশনে জমা হচ্ছে। অন্যদিকে প্ল্যান্ট থেকে নির্গত কালো বিষাক্ত পানি এবং ডাম্পিং স্টেশনের বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে মিশে আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
লাফার্জে যাচ্ছে প্লাস্টিক, জমছে বর্জ্যের পাহাড়
সিসিকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৭০ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন আলাদা করে ছাতকের লাফার্জ সিমেন্ট কারখানায় পাঠানো হচ্ছে। এসব বর্জ্য সেখানে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে সমস্যা তৈরি হচ্ছে অবশিষ্ট বর্জ্য নিয়ে। পৃথকীকরণের পরও বিপুল পরিমাণ প্রক্রিয়াজাত বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনেই স্তূপাকারে জমা রাখা হচ্ছে। একই স্থানে অপ্রক্রিয়াজাত বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে। ফলে বর্জ্যের পাহাড় দিন দিন আরও বড় হচ্ছে। পরিবেশবিদদের মতে, শুধু প্লাস্টিক আলাদা করলেই বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার লক্ষ্য পূরণ হয় না; অবশিষ্ট অংশেরও টেকসই ব্যবস্থাপনা জরুরি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, সিলেটে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপাদন হয়। তারমধ্যে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য বাসা-বাড়ি ও গৃহস্থালি থেকে উৎপাদন হয়। এসব বর্জ্য সিসিকের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়া হয়। অবশিষ্ট ১৫০ টন বর্জ্য ড্রেন-ছড়া, ভাঙারি ব্যবসায়ী ও মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। ড্রেন ও ছড়ার প্লাস্টিক বর্জ্যও আবার একটি প্রক্রিয়ায় ডাম্পিং স্টেশনেও যায়।
আরও পড়ুন-
শহরের প্রবেশমুখে ৩০ বছরের বিষাক্ত ভাগাড়
বিষ-প্লাস্টিক-বর্জ্যে বিপন্ন সুন্দরবন
খুলনার রাজবাঁধ যেন ময়লার পাহাড়
সিসিক আরও জানায়, অত্যাধুনিক প্ল্যান্টের মাধ্যমে বাসাবাড়ি ও রেস্টুরেন্টের অন্তত ১৫০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। সেখান থেকে গড়ে ৫০ টন পলিথিন-প্লাস্টিক বের হয়। যা লাফার্জ সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে চলে যায়। তারা এগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। বাকি বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনের স্তূপ আকারে রাখা হচ্ছে।
দুর্গন্ধ, কালো তরল মিশছে পরিবেশে
সরেজমিনে দেখা গেছে, ডাম্পিং স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে খোলা আকাশের নিচে বিশাল বর্জ্যের স্তূপ পড়ে আছে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র দুর্গন্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বৃষ্টির সময় বর্জ্য থেকে নির্গত কালো তরল পাশের কৃষিজমি, খাল ও বিলের পানির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
পারাইরচক এলাকার বাসিন্দা জামাল মিয়ার ভাষ্য, ‘ডাম্পিং স্টেশন থেকে বের হওয়া পানি ধানের জমিতে প্রবেশ করে ফসলের ক্ষতি করছে। আগের তুলনায় মাছের উৎপাদনও কমে গেছে।’
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলতে থাকলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্লান্ট ঘিরে বিরাট কর্মযজ্ঞ
প্লান্ট ঘুরে জানা গেছে, প্রতিদিন তিন শিফটে কাজ করেন শ্রমিকরা। অন্তত ৩০০ টন বর্জ্য প্লান্টের মাধ্যমে পৃথকীকরণ করা হয়। এরপর অন্তত চারটি ট্রাকে করে পলিথিন ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য লাফার্জ সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে পাঠানো হয়। প্রতিটি ট্রাকে অন্তত ১৬ টন বর্জ্য ধারণ হয়। পৃথকীকরণের পর অবশিষ্ট বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা না থাকায় সেগুলো ডাম্পিং স্টেশনের ভেতরেই স্তূপাকারে জমা করা হচ্ছে।
প্লান্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্জ্য পৃথকীকরণ প্লান্টে ৯ জন ড্রাইভার, ৪ জন সুপারভাইজার এবং ২০-২৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। তেল, বিদ্যুৎ ও বেতনসহ প্রতি মাসে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা খরচ হয়।
পরিবেশ সুরক্ষায় ঘাটতির অভিযোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘লিচেট ম্যানেজমেন্ট’ বা বর্জ্য থেকে নির্গত তরল বর্জ্যের নিরাপদ নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সিলেটের ডাম্পিং স্টেশনে এ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যদিও সিটি করপোরেশন বলছে, নিয়মিতভাবে বিষাক্ত তরল বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অতিবৃষ্টি বা বন্যার সময় কিছু পানি বাইরে চলে গেলেও তা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সিসিকের ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবেদীন বলেন, ‘দেড় বছর আগের এক স্টাডি অনুযায়ী এটি ছিল ২০০ টন, যা আমাদের কালেকশন চেইনে আসতো ২৪৫ টন। বর্তমানে পুরো শহরে প্রতিদিন বর্জ্য উৎপাদন হয় ৪৭৫ টন। এর মধ্যে আমরা বর্তমানে প্রতিদিন ৩০০ টনের বেশি বর্জ্য পরিবহন করছি।’
তিনি জানান, ‘বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ টনের বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে এবং প্রায় ৫০ টন প্লাস্টিক আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে। লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ প্লান্টের কারিগরি সহায়তা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে।’
প্রক্রিয়াজাত ও অপ্রক্রিয়াজাত সকল বর্জ্য একসঙ্গে ডাম্পিংয়ে রেখে সম্পদে পরিণত করা যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে একলিম আবেদীন বলেন, ‘একদিনে সব সম্ভব নয়। আমরা পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও একটি চাইনিজ কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেছি, কীভাবে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এগুলো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এছাড়া ‘বায়োমাইনিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে ২০-৩০ বছরের পুরোনো ময়লাও প্রসেস করা সম্ভব, তবে এতে অনেক অর্থ ও শ্রমের প্রয়োজন।’
এফএ/এএসএম
What's Your Reaction?