সোনালি আঁশে ফিরছে সুদিন

রাজশাহীতে পাটের আবাদ বেড়েছে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাড়ছে পাটের ব্যবহার দামও তুলনামূলক ভালো একসময় দেশের কৃষকের জীবিকার অবলম্বন ছিল পাট। ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত এই ফসলের গৌরবময় অতীত থাকলেও সিনথেটিক তন্তুর বিস্তার, ন্যায্যমূল্যের সংকট, পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘদিন ধরে পাট চাষে আগ্রহ হারিয়েছিলেন কৃষকরা। তবে সময়ের পরিবর্তনে আবারও বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বাজারে তুলনামূলক ভালো দামের কারণে রাজশাহীর কৃষকদের মধ্যে আবারও পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে। ‘চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গতবছর এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে এক হাজার ৯৪ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও বেড়েছে। এবছর ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি’ চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। মাঠজুড়ে সবুজ পাটগাছের সারি

সোনালি আঁশে ফিরছে সুদিন
  • রাজশাহীতে পাটের আবাদ বেড়েছে
  • প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাড়ছে পাটের ব্যবহার
  • দামও তুলনামূলক ভালো

একসময় দেশের কৃষকের জীবিকার অবলম্বন ছিল পাট। ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত এই ফসলের গৌরবময় অতীত থাকলেও সিনথেটিক তন্তুর বিস্তার, ন্যায্যমূল্যের সংকট, পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘদিন ধরে পাট চাষে আগ্রহ হারিয়েছিলেন কৃষকরা। তবে সময়ের পরিবর্তনে আবারও বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র।

পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বাজারে তুলনামূলক ভালো দামের কারণে রাজশাহীর কৃষকদের মধ্যে আবারও পাট চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

‘চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গতবছর এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে এক হাজার ৯৪ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও বেড়েছে। এবছর ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি’

সোনালি আঁশে ফিরছে সুদিন

চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। মাঠজুড়ে সবুজ পাটগাছের সারি এখন কৃষকের নতুন স্বপ্নের প্রতীক। কোথাও কোথাও আগাম জাতের পাট কাটার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আর দুই সপ্তাহের মধ্যেই পুরোদমে শুরু হবে পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার কাজ।

কৃষি বিভাগ বলছে, অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষকদের বাড়তি আগ্রহের কারণে এবার উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।

সোনালি আঁশে ফিরছে সুদিন

পবার নওহাটা পাট বাজার ঘুরে দেখা যায়, নতুন পাটের আগমন শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ পাট চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে দাম সন্তোষজনক থাকায় আগাম পাট চাষিরা আশাবাদী। অনেক কৃষক মনে করছেন, দাম এভাবেই স্থিতিশীল থাকলে পাট আবারও লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গতবছর এ সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে এক হাজার ৯৪ হেক্টর। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও বেড়েছে। এবছর ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের উৎপাদনের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি।

‘বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া, শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের ক্রমাগত বৃদ্ধি। অনেক এলাকায় খাল-বিল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পাট জাগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক কৃষক বিকল্প উপায়ে জাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে’

কৃষি বিভাগ জানায়, সাধারণত চৈত্র ও বৈশাখ মাসে পাটের বীজ বপন করা হয়। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে আগাম জাতের পাট কাটা শুরু হয়। শ্রাবণ-ভাদ্রজুড়ে চলে পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজ।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবছর সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় ছিল। ফলে গাছের বৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে ভালো হয়েছে। রোগবালাইও তুলনামূলক কম দেখা গেছে।

সোনালি আঁশে ফিরছে সুদিন

এবার চার বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন পবা উপজেলার কৃষক রবিউল ইসলাম। ভালো দাম পাওয়ার আশা ব্যক্ত করে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। এবার ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি। বাজারে যদি বর্তমান দাম বজায় থাকে, তাহলে খরচ বাদ দিয়েও ভালো লাভ করা সম্ভব হবে।’

এবছর শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির সংকট এখনো বড় সমস্যা বলে জানান এই কৃষক।

‘চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উন্নত জাতের বীজ, কৃষকদের আগ্রহ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাট শুধু অর্থকরী ফসল নয়, এটি পরিবেশবান্ধব কৃষি অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ’

বাগমারা উপজেলার কৃষক সাইদুর রহমান পাঁচ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। তার ভাষ্য, ‘গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার জমির অবস্থা অনেক ভালো। তবে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ সহজ করতে হবে। সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে কৃষকরা আরও বেশি উৎসাহিত হবেন।’

গত বছরের তুলনায় এবার পাটের বৃদ্ধি অনেক ভালো বলে জানান চারঘাট উপজেলার কৃষক হৃদয়। তিনি বলেন, কৃষক যদি ন্যায্যমূল্য পান, তাহলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পাট চাষ হবে।

কৃষকদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি পাওয়া, শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয়ের ক্রমাগত বৃদ্ধি। অনেক এলাকায় খাল-বিল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পাট জাগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক কৃষক বিকল্প উপায়ে জাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সোনালি আঁশে ফিরছে সুদিন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ যত বাড়ছে, ততই পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব ব্যাগ, জিও-টেক্সটাইল, কম্পোজিট বোর্ড, হোম ডেকোর, ফ্যাশন সামগ্রীসহ নানান ধরনের পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত মানের বীজ, কৃষক প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পাটভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উন্নত জাতের বীজ, কৃষকদের আগ্রহ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার উৎপাদন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাট শুধু অর্থকরী ফসল নয়, এটি পরিবেশবান্ধব কৃষি অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার জানান, চলতি বছর জেলায় তিন লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। গতবছর উৎপাদন হয়েছিল তিন লাখ ৬০ হাজার ৪৯৪ কুইন্টাল। অর্থাৎ এবার ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পাট চার হাজার ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে।

সোনালি আঁশে ফিরছে সুদিন

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে পাটকে কেন্দ্র করে নতুন শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এতে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এই খাত।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘একসময় পাট ছিল দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস। সময়ের পরিবর্তনে এর গুরুত্ব কিছুটা কমে গেলেও বর্তমানে বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। ফলে পাট আবারও সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হয়েছে। রাজশাহীতে পাটের আবাদ বৃদ্ধি সেই ইতিবাচক পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, উন্নত জাতের বীজ সহজলভ্য করা এবং পাটভিত্তিক শিল্প সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, পাটজাত শিল্প সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে পাটখাত দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

এসআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow