স্পোর্টসম্যানশিপের যে লড়াইয়ে আমরা হেরে যাচ্ছি

গতকাল রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতলো স্পেন। মেসি রানার্সআপ পদক গলায় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়লেন, সম্ভবত নিজের শেষ বিশ্বকাপে। ফাইনাল শেষে ফুটবলবিশ্ব একটা গল্প নিয়ে ঘুমাতে গেছে, স্পেনের শিরোপা, মেসির বিদায়ী কান্না। কিন্তু কুষ্টিয়ার কোনো এক পরিবার, কুমিল্লার কোনো এক মায়ের কাছে এই বিশ্বকাপের স্মৃতি অন্যরকম। বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে খেলেইনি, অথচ আসরটি শেষ হওয়ার আগেই অন্তত ১০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, যার মধ্যে তিনজন খুন হয়েছেন ছুরিকাঘাতে, আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, এগুলো আমাদের সমর্থনের সংস্কৃতি নিয়ে একটা কঠিন প্রশ্ন তোলে, খেলা কি তবে ক্রমেই তার নিজের চরিত্র হারাচ্ছে? নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা-স্পেন বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হোন। ছবি: এএফপি খোদ ফাইনালের মাঠেও অবশ্য স্পোর্টসম্যানশিপের ঘাটতি চোখ এড়ায়নি। নির্ধারিত সময়ে পাউ কুবারসির ওপর বেপরোয়া ট্যাকলের জন্য লাল কার্ড দেখেন এনসো ফের্নান্দেস, আর্জেন্টিনাকে দশজনে নামিয়ে দিয়ে। কিন্তু আসল

স্পোর্টসম্যানশিপের যে লড়াইয়ে আমরা হেরে যাচ্ছি

গতকাল রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতলো স্পেন। মেসি রানার্সআপ পদক গলায় নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়লেন, সম্ভবত নিজের শেষ বিশ্বকাপে। ফাইনাল শেষে ফুটবলবিশ্ব একটা গল্প নিয়ে ঘুমাতে গেছে, স্পেনের শিরোপা, মেসির বিদায়ী কান্না।

কিন্তু কুষ্টিয়ার কোনো এক পরিবার, কুমিল্লার কোনো এক মায়ের কাছে এই বিশ্বকাপের স্মৃতি অন্যরকম। বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে খেলেইনি, অথচ আসরটি শেষ হওয়ার আগেই অন্তত ১০ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, যার মধ্যে তিনজন খুন হয়েছেন ছুরিকাঘাতে, আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, এগুলো আমাদের সমর্থনের সংস্কৃতি নিয়ে একটা কঠিন প্রশ্ন তোলে, খেলা কি তবে ক্রমেই তার নিজের চরিত্র হারাচ্ছে?

jagoনিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা-স্পেন বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হোন। ছবি: এএফপি

খোদ ফাইনালের মাঠেও অবশ্য স্পোর্টসম্যানশিপের ঘাটতি চোখ এড়ায়নি। নির্ধারিত সময়ে পাউ কুবারসির ওপর বেপরোয়া ট্যাকলের জন্য লাল কার্ড দেখেন এনসো ফের্নান্দেস, আর্জেন্টিনাকে দশজনে নামিয়ে দিয়ে। কিন্তু আসল বিশৃঙ্খলা শুরু হয় শেষ বাঁশি বাজার পরেই। জয়োল্লাসে ছুটে আসা স্পেন খেলোয়াড়দের দিকে আর্জেন্টিনার নাহুয়েল মোলিনা রদ্রিকে ধাক্কা দিলে এরিক গার্সিয়া প্রতিবাদ জানাতে এগিয়ে আসেন, আর তখনই ছুটে আসেন লেয়ান্দ্রো পারেদেস।

টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, পারেদেস গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন, এরপর তরুণ মিডফিল্ডার গাভিকে মাটিতে ফেলে মুখের কাছে চেপে ধরেন, কোচ লিওনেল স্কালোনি নিজে মাঠে নেমে থামানোর চেষ্টা করেও শুরুতে ব্যর্থ হন। রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান পারেদেসকে। হারের হতাশা থেকে এমন প্রতিক্রিয়া হয়তো মানবিকভাবে বোঝা যায়, কিন্তু বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে, লাখো দর্শকের সামনে, একজন শীর্ষ তারকার এই আচরণ মনে করিয়ে দেয়, স্পোর্টসম্যানশিপের সংকট শুধু গ্যালারি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, খোদ মাঠেও, সবচেয়ে বড় মঞ্চেও এর ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে।

স্পোর্টসম্যানশিপ আসলে কী?

স্পোর্টসম্যানশিপের কোনো একক সংজ্ঞা নেই, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কলেজিয়েট অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশন (এনসিএএ) একে সংজ্ঞায়িত করেছে খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি, সংগঠক ও দর্শক, সবার আচরণে সম্মান, ন্যায্যতা, ভদ্রতা, সততা ও দায়িত্বশীলতার সমষ্টি হিসেবে। এই ধারণার শিকড় প্রাচীন, কিন্তু আধুনিক যুগে এর সবচেয়ে আলোচিত দৃষ্টান্ত সম্ভবত ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক। নাৎসি জার্মানির প্রচারযন্ত্র যখন আর্য শ্রেষ্ঠত্বের গল্প ফাঁদছিল, তখন জার্মান লং জাম্পার লুৎস লং প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন অ্যাথলেট জেসি ওয়েনসকে কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।

ওয়েনস সোনা জেতেন, আর দুজন হাত ধরাধরি করে মাঠ ছাড়েন, রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে। প্রায় নব্বই বছর পরের এই বিশ্বকাপেও অবশ্য এমন দৃষ্টান্ত অনুপস্থিত ছিল না, শেষ ষোলোর এক ম্যাচে গোল মিস করা কলম্বিয়ান ফরোয়ার্ড জামিন্টন কাম্পাসের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন অনেক প্রতিপক্ষ সমর্থকও।

jagonewsটেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, পারেদেস গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন। ছবি: এএফপি

চলতি বছরের এপ্রিলে বোস্টন ম্যারাথনে একটি দৃশ্য ভাইরাল হয়েছিল। ফিনিশ লাইনের কাছে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া এক দৌড়বিদকে দেখে ব্রাজিলের দৌড়বিদ পেদ্রো আরিয়েতা নিজের দৌড় থামিয়ে তাকে ধরে তুলেছিলেন, নিজের সময় নষ্ট করেই। এই একটি মুহূর্ত মনে করিয়ে দেয়, খেলাধুলার আসল সৌন্দর্য কোথায়। কিন্তু ব্যতিক্রম এই গল্পগুলোই বলে দেয়, স্পোর্টসম্যানশিপ এখন নিয়ম নয়, বরং ব্যতিক্রম হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

কেন এই সংকট

খেলাধুলার বাণিজ্যিকীকরণ, তারকা-নির্ভর অর্থনীতি এবং জেতাকেই একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলার সংস্কৃতি স্পোর্টসম্যানশিপকে ক্রমাগত পেছনে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, অ্যাচিভমেন্ট গোল থিওরি ও সেলফ-ডিটারমিনেশন থিওরির আলোকে দেখা যায়, খেলোয়াড়ের অনুপ্রেরণা যখন শুধু ফলাফল-কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে, তখন নৈতিক আচরণ শিথিল হয়ে পড়ে। একই যুক্তি প্রযোজ্য দর্শক-সমর্থকদের ক্ষেত্রেও।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও উসকে দিয়েছে, কারণ সেখানে প্রতিটি গোল বা হার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সুযোগ তৈরি করে, আর সেই প্রতিক্রিয়া প্রায়ই মজা থেকে ব্যক্তিগত আক্রমণে গড়িয়ে যায়।

পোল্যান্ডের পোজনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২২ সালের এক গবেষণায় ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সী প্রায় ১ হাজার ২৫৭ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, রেফারির সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার প্রশ্নে পেশাদার ক্রীড়াবিদদের মনোভাব প্রায়ই কর্তৃত্বকে খাটো করে দেখার দিকে ঝুঁকে থাকে এবং এই প্রবণতা প্রায় সব বয়সী প্রতিযোগীর মধ্যেই দেখা যায়। অর্থাৎ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ যত তীব্র হয়, নিয়ম ও কর্তৃত্ব মেনে চলার সংস্কৃতি ততই দুর্বল হয়ে পড়ে, মাঠে এবং মাঠের বাইরে দুই জায়গাতেই।

গবেষণা ও পরিসংখ্যান কী বলছে

এই প্রবণতা বিচ্ছিন্ন নয়, বৈশ্বিক পরিসংখ্যানও একই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্ব অ্যাথলেটিক্সের ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিক নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে ক্রীড়াবিদদের প্রতি অপমানজনক বার্তার সংখ্যা প্রতিটি বড় আসরের সঙ্গে বাড়ছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খেলোয়াড়দের মানসিক স্বাস্থ্য ও পারফরম্যান্সে। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রীড়াবিদদের উদ্দেশে করা পোস্টের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেই নেতিবাচক বা আক্রমণাত্মক বিষয়বস্তু থাকে, আর ফিয়া ও ইউনাইটেড এগেইনস্ট অনলাইন অ্যাবিউজের যৌথ জরিপে প্রায় ৯০ শতাংশ ক্রীড়া সংস্থা মনে করে অনলাইন হয়রানির কারণে খেলোয়াড়রা খেলা ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

jagoফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতলো স্পেন। ছবি: এএফপি

তরুণ ক্রীড়াবিদদের নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইন হয়রানির শিকার হওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে ঘুম, মনোযোগ ও আত্মমর্যাদাবোধে স্পষ্ট নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের যুব ক্রীড়া নিয়ে করা আরেকটি গবেষণা বলছে, বাজে স্পোর্টসম্যানশিপের অভিজ্ঞতা শিশুদের খেলাধুলা থেকেই দূরে সরিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার ঝুঁকি বাড়ায়। ডোপিংয়ের পরিসংখ্যানও একই সংকটের আরেকটি চিত্র।

বিশ্ব ডোপিংবিরোধী সংস্থার ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের জাতীয় ডোপিংবিরোধী সংস্থা সেবার প্রায় ৭ হাজার ১১৩টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৬০টি ইতিবাচক ফল পেয়েছে, টানা তৃতীয় বছরের মতো বিশ্বে শীর্ষে থেকে, যেখানে চীন ২৪ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করেও মাত্র ৪৩টি ইতিবাচক ফল পেয়েছে। অর্থাৎ শুধু নিয়ম থাকলেই হয় না, তার বাস্তবায়ন ও নৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তিও সমান জরুরি, মাঠে যেমন, তেমনি গ্যালারি ও স্ক্রিনেও।

বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি, তবু সমর্থনের নামে যে মাত্রার সহিংসতা দেখা গেছে তা উদ্বেগজনক। গত ৮ জুলাই কুমিল্লায় আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচ চলাকালে গোল নিয়ে উল্লাস আর পাল্টা কটাক্ষ থেকে শুরু হওয়া বাগবিতণ্ডা সংঘর্ষে রূপ নিলে প্রাণ হারান একজন। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে আরেকটি ঘটনায়, ব্রাজিলের এক হারের পর প্রতিপক্ষের ট্রল সহ্য করতে না পেরে বিশ বছর বয়সী এক তরুণ সমর্থক জীবন শেষ করে দেন বলে পরিবার ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে।

পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছিল যে গত ৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট দাখিল করেন, বিশ্বকাপকেন্দ্রিক প্রাণঘাতী সহিংসতা ও রাতভর আতশবাজি-উচ্চশব্দের বিরুদ্ধে সরকারি পদক্ষেপ চেয়ে। রিটে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী তখন পর্যন্তই অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যার মধ্যে তিনটি হত্যাকাণ্ড।

এই সংকটের শিকড় নতুন নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটেও আচরণবিধি ভঙ্গের নজির পুরনো, সাকিব আল হাসান, তানজিম হাসান সাকিব বা নাহিদ রানার মতো ক্রিকেটাররা মাঠের আচরণের জন্য আইসিসির শাস্তি পেয়েছেন। একটি সাম্প্রতিক মতামত-লেখায় উঠে আসা একটি পর্যবেক্ষণও প্রাসঙ্গিক, বিদেশি ক্লাব ফুটবলের খেলোয়াড়েরা মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ম্যাচ শেষে জার্সি বদল করেন, কোলাকুলি করেন, অথচ হাজার মাইল দূরে থাকা কিছু সমর্থক সেই একই দলকে ঘিরে একে অপরের সঙ্গে সহিংস আচরণ করেন। মাঠের সেই শাস্তিযোগ্য অসদাচরণ, সমর্থকদের অনলাইন ট্রলিং আর গ্যালারির সংঘাত, সব কটির উৎস আসলে একই, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ব্যক্তিগত জয়-পরাজয়ের লড়াই বানিয়ে ফেলা।

আশার কথাও অবশ্য আছে, বাংলাদেশের নারী ফুটবল, বিশেষ করে ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রাম থেকে উঠে আসা মেয়েদের গল্প, দেখিয়েছে খেলাধুলা কীভাবে সামাজিক বাধা ভেঙে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে।

jagoবিশ্বকাপে নরওয়ের প্রত্যাবর্তনের পর এই ভাইকিং রো উদযাপন বর্তমান বিশ্বকাপে অন্যতম ভাইরাল ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে। ছবি: এএফপি

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও সম্ভাবনা

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তিনটি বিপদ সামনে আসছে। প্রথমত, সামাজিক মাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে প্রতিটি বড় আসরের সঙ্গে ট্রলিং আরও তীব্র হবে, বিশেষ করে আগামী ২০৩০ বিশ্বকাপ যখন আরও বড় পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয়ত, পারিবারিক ও বন্ধুত্বের সম্পর্কে বিভাজন গভীর হবে, কারণ খেলার সমর্থন এখন অনেকের কাছে পরিচয়ের লড়াই হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত, তরুণ প্রজন্ম সংগঠিত খেলাধুলা ও তার সংস্কৃতি থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে, যা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, আর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে সম্ভাবনাও কম নয়। হাইকোর্টে দায়ের হওয়া রিট দেখাচ্ছে সমাজের একটা অংশ বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হচ্ছে, সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোও ধীরে ধীরে সুরক্ষামূলক প্রযুক্তি নিচ্ছে, আর খেলাধুলাকে সচেতনভাবে চরিত্র গঠনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা গেলে তা সামাজিক সংহতি ও নেতৃত্ব বিকাশের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, যেমনটা দেখা গেছে নারী ফুটবলের ক্ষেত্রে।

করণীয়

প্রথমত, স্কুল পর্যায়ের শারীরিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে স্পোর্টসম্যানশিপকে সুনির্দিষ্ট বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি, শুধু খেলা শেখানো নয়, নিয়ম মানা ও প্রতিপক্ষকে সম্মান করার চর্চাও শেখাতে হবে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে খেলাকেন্দ্রিক ঘৃণাবাচক ও হুমকিমূলক বার্তা শনাক্ত করার প্রযুক্তি স্থানীয় ভাষাতেও কার্যকর করতে হবে।

তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে খেলাকেন্দ্রিক সহিংসতার ঘটনা আলাদা ক্যাটাগরিতে নথিভুক্ত করে দ্রুত হস্তক্ষেপের ব্যবস্থা রাখতে হবে, আর ক্রীড়া সংগঠনগুলোকেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তির কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, গণমাধ্যমকে খেলার ফলাফল প্রচারের ভাষায় সতর্ক হতে হবে, উত্তেজক বা বিভাজনমূলক শিরোনাম এড়িয়ে চলতে হবে। সবশেষে, বড় খেলার আসরের সময় মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্রগুলোর তথ্য বেশি করে প্রচার করা দরকার, যাতে হতাশাগ্রস্ত কেউ সাহায্য চাইতে দ্বিধা না করে।

jagoএই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কেপ ভার্দে। ছবি: এএফপি

একটা বিশ্বকাপ শেষ হলো, একটা দল ট্রফি নিয়ে ঘরে ফিরল। কিন্তু যে পরিবারগুলো এই এক মাসে প্রিয়জন হারিয়েছে, তাদের কাছে খেলার ফলাফল কখনোই আর অর্থবহ হবে না। বোস্টনের সেই দৌড়বিদ কিংবা বার্লিনের সেই লং জাম্পার আমাদের মনে করিয়ে দেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও মানবিকতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। স্পোর্টসম্যানশিপ শুধু মাঠের খেলোয়াড়দের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম নয়, এটা আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটা পরীক্ষা, যখন প্রিয় দল হারে, তখন আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাই। মোবাইল স্ক্রিনের ওপাশে থাকা মানুষটাও রক্তমাংসের, তার আনন্দ-বেদনাও সত্যি। এই সহজ সত্যটা মনে রাখতে পারলেই আগামী বিশ্বকাপ হয়তো আমাদের জন্য কম রক্তাক্ত হবে।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow