স্মরণীয় মুসলিম মনীষী
ইসলামের ইতিহাসে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তারে মুসলিম নারীদের অবদান চিরস্মরণীয়। তাদের মধ্যে অন্যতম এক দীপ্তিময় নাম ‘ফাতিমা আল-ফিহরি’। তিনি কেবল একজন মহীয়সী নারীই ছিলেন না, বরং বর্তমান বিশ্বের প্রাচীনতম এবং প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান—মরক্কোর ফেজ শহরে অবস্থিত ‘আল-কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়’-এর প্রতিষ্ঠাতা। তার দূরদর্শিতা ও বদান্যতা মানবসভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষা বিস্তারে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে। ফাতিমা আল-ফিহরির পুরো নাম ফাতিমা বিনতে মুহম্মদ আল-ফিহরিয়া আল-কুরাইশিয়া। ঐতিহাসিকদের মতে, পারিবারিক নামের ‘কুরাইশিয়া’ অংশটি থেকে ধারণা করা হয় যে, তিনি ইসলামের পবিত্র নবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) বংশধর কুরাইশ গোত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। নবম শতকের শুরুতে ওই শহরটি ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। ফাতিমার শৈশব ও কৈশোর কাটে তিউনিসিয়াতেই। তবে নবম শতকের শুরুতে তাদের পরিবারসহ কাইরাওয়ানের অনেক অসচ্ছল ও সাধারণ পরিবার ভাগ্য অন্বেষণে মরক্কোর ঐতিহাসিক ফেজ শহরে হিজরত করে। ফে
ইসলামের ইতিহাসে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিস্তারে মুসলিম নারীদের অবদান চিরস্মরণীয়। তাদের মধ্যে অন্যতম এক দীপ্তিময় নাম ‘ফাতিমা আল-ফিহরি’। তিনি কেবল একজন মহীয়সী নারীই ছিলেন না, বরং বর্তমান বিশ্বের প্রাচীনতম এবং প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান—মরক্কোর ফেজ শহরে অবস্থিত ‘আল-কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়’-এর প্রতিষ্ঠাতা। তার দূরদর্শিতা ও বদান্যতা মানবসভ্যতার ইতিহাসে শিক্ষা বিস্তারে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে।
ফাতিমা আল-ফিহরির পুরো নাম ফাতিমা বিনতে মুহম্মদ আল-ফিহরিয়া আল-কুরাইশিয়া। ঐতিহাসিকদের মতে, পারিবারিক নামের ‘কুরাইশিয়া’ অংশটি থেকে ধারণা করা হয় যে, তিনি ইসলামের পবিত্র নবী হজরত মুহাম্মদের (সা.) বংশধর কুরাইশ গোত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। নবম শতকের শুরুতে ওই শহরটি ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল।
ফাতিমার শৈশব ও কৈশোর কাটে তিউনিসিয়াতেই। তবে নবম শতকের শুরুতে তাদের পরিবারসহ কাইরাওয়ানের অনেক অসচ্ছল ও সাধারণ পরিবার ভাগ্য অন্বেষণে মরক্কোর ঐতিহাসিক ফেজ শহরে হিজরত করে। ফেজের তৎকালীন শাসক সুলতান দ্বিতীয় ইদ্রিস এই অভিবাসীদের ফেজ নদীর তীরে বসবাসের সুযোগ করে দেন। ফেজে এসে ফাতিমার বাবা মুহাম্মদ আল-ফিহরির ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। কঠোর পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হন। ধনী হওয়ার পর ও তিনি তার সন্তানদের সুশিক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখাশোনা করতেন। ফলস্বরূপ, ফাতিমা এবং তার বোন মরিয়ম ক্ল্যাসিক্যাল আরবি ভাষা, ইসলামিক ফিকাহ এবং হাদিস শাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান।
ফেজ শহরেই ফাতিমার বিয়ে হয়। কিন্তু জীবনের এই সুখের সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বিয়ের মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তার জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। স্বল্পকালের মধ্যে তিনি তার বাবা, ভাই এবং স্বামী—পরিবারের আপনজনদের একের পর এক হারাতে থাকেন। একে একে প্রিয়জনদের হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেও দুই বোন অর্থাৎ ফাতিমা ও মরিয়ম তাদের বাবার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী হন। প্রিয়জন হারানোর গভীর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে ফাতিমা মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। ফেজের মানুষেরা তার এ উদারতা ও মহানুভবতার কারণে ভালোবেসে তাকে ‘উম্মে আল বানিয়ান’ বা ‘শিশুদের মা’ নামে ডাকতে শুরু করেন।
তৎকালীন সময়ে ফেজ শহরে দেশ-বিদেশ থেকে আসা মুসলিম অভিবাসীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু শহরের প্রধান মসজিদে ক্রমবর্ধমান মুসল্লিদের জায়গা হচ্ছিল না। এ সংকট নিরসনে ফাতিমা ও তার বোন মরিয়ম দুটি ঐতিহাসিক মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। বোন মরিয়ম আন্দালুস মসজিদ নির্মাণ করেন এবং ফাতিমা নিজেই উপস্থিত থেকে তদারকি করে কারাওইন মসজিদ নির্মাণ শুরু করেন। ২৫৪ হিজরির রমজান মাসে (অর্থাৎ ৬৫৮ বা ৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, মসজিদ নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দিন তিনি রোজা রেখেছিলেন এবং আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ছিলেন। পরবর্তী সময়ে মসজিদটির পরিসর আরও বৃদ্ধি করা হয় এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয় একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা পরবর্তী সময়ে ‘আল-কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করে।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ব্যাকরণ, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, রসায়ন ও ভূগোলের মতো আধুনিক ও প্রায়োগিক বিষয়গুলো পড়ানো শুরু হয়। ইউনেসকো এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস এটিকে বিশ্বের প্রথম এবং প্রাচীনতম একটানা সচল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লাইব্রেরি, যেখানে নবম শতকের পবিত্র কোরআন শরিফের পাণ্ডুলিপিসহ হাজার হাজার দুর্লভ বই ও দলিল সংরক্ষিত রয়েছে। পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টারসহ মধ্যযুগের বহু বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত ও গবেষক এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছিলেন।
৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে এই মহীয়সী নারী ইন্তেকাল করেন। ফাতিমা আল-ফিহরি ব্যক্তিগত জীবনে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েও তা নিজের ভোগ-বিলাসে ব্যয় না করে মানবতার কল্যাণে এবং জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কাজে উৎসর্গ করে গেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সদিচ্ছা থাকলে একজন নারী কীভাবে পুরো মানবজাতির ইতিহাস বদলে দিতে পারেন। তার গড়া এই বিদ্যাপীঠ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সারা বিশ্বে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে এবং আজও তার কীর্তিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
What's Your Reaction?