হবিগঞ্জে গ্যাসের অভাবে টানা তিন দিন কারখানা বন্ধ, বাড়ছে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শঙ্কা  

হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে টানা তৃতীয় দিনের মতো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানার প্রায় সবকটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন, আবার কোথাও তাদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ছাঁটাই আতঙ্ক। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হচ্ছে শিল্পমালিকদের। এতে প্রতিদিনই বাড়ছে লোকসান। উদ্যোক্তাদের দাবি, গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার উৎপাদন ও রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হতে শুরু করেছে। স্কয়ার ডেনিম লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাজেদ হোসেন বলেন, শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি শূন্য ছিল। তিনি বলেন, ‘মেশিন, বিদ্যুৎ—সবকিছু বন্ধ। বেশি সময় এভাবে বন্ধ থাকলে মেশিনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি জানান, কারখানার একটি লাইনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৭ ঘনমিটার এবং অপর লাইনে ৮৬ হাজার ২৮ ঘনমিটার। অথচ প্রায় তিন দিন ধরে কোন

হবিগঞ্জে গ্যাসের অভাবে টানা তিন দিন কারখানা বন্ধ, বাড়ছে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের শঙ্কা  

হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে টানা তৃতীয় দিনের মতো গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানার প্রায় সবকটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন, আবার কোথাও তাদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ছাঁটাই আতঙ্ক।

গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খরচ বহন করতে হচ্ছে শিল্পমালিকদের। এতে প্রতিদিনই বাড়ছে লোকসান। উদ্যোক্তাদের দাবি, গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার উৎপাদন ও রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাতিল হতে শুরু করেছে।

স্কয়ার ডেনিম লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাজেদ হোসেন বলেন, শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি শূন্য ছিল। তিনি বলেন, ‘মেশিন, বিদ্যুৎ—সবকিছু বন্ধ। বেশি সময় এভাবে বন্ধ থাকলে মেশিনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তিনি জানান, কারখানার একটি লাইনে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৭ ঘনমিটার এবং অপর লাইনে ৮৬ হাজার ২৮ ঘনমিটার। অথচ প্রায় তিন দিন ধরে কোনো গ্যাসই পাওয়া যাচ্ছে না।

এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার বলেন, প্রতি মাসে তাদের প্রায় ১০ লাখ ৩৫ হাজার ঘনমিটার গ্যাস প্রয়োজন। সে হিসাবে দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ৩৪ হাজার ৫০০ ঘনমিটার।

তিনি বলেন, ‘শুক্রবার সকালে ৬০ শতাংশ গ্যাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুপুর ১২টায় হঠাৎ সরবরাহ ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এ অবস্থায় মেশিন চালানো অত্যন্ত কঠিন। বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করলে মেশিনও বিকল হয়ে যেতে পারে।’

আবুল বাশার আরও বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। মালিকপক্ষ কতদিন লোকসান গুনবে? এভাবে চলতে থাকলে একসময় মানুষ চাকরি হারাবে।’

তিনি জানান, ইতোমধ্যে তাদের রপ্তানি ১৩ শতাংশ কমে গেছে। বিভিন্ন কোম্পানির অর্ডার বাতিল হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। সুতা থেকে কাপড় তৈরি এবং সেই কাপড় রপ্তানি না হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, গ্যাস না থাকায় অনেক কারখানার ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ইটিপি বন্ধ থাকলে এর ভেতরের প্রয়োজনীয় ব্যাকটেরিয়া মারা যেতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। তাই অন্তত ইটিপি চালু রাখার মতো গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

গ্যাস সংকটে উদ্বিগ্ন শ্রমিকরাও। স্থানীয় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ফরাস দেবনাথ বলেন, কয়েকদিন ধরেই গ্যাসের চাপ কম থাকায় ঠিকমতো উৎপাদন করা যাচ্ছিল না। এখন পুরোপুরি গ্যাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানার কাজও বন্ধ।

তিনি বলেন, ‘কারখানা বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন। এভাবে দীর্ঘদিন চললে আমাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে। সংসার চালানো কঠিন হবে। চাকরি থাকবে কি না, সেটাও নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি।’

শ্রমিক রুজিনা বেগম বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন কাজ করে সংসার চালাই। কারখানা বন্ধ থাকলে আমাদের কাজ নেই, আয়ও নেই। কতদিন এভাবে চলবে, সেটাও জানি না। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আমাদের মতো শ্রমিকদের পরিবার সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে।’

গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু শিল্পকারখানা ও শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মাধবপুরের আবাসিক এলাকা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাধবপুর শিল্পাঞ্চল ঘিরে গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকাগুলোর অনেক বাড়িওয়ালার প্রধান আয়ের উৎস শ্রমিকদের কাছ থেকে পাওয়া বাড়িভাড়া। আবার অনেকেই ব্যাংকঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। ফলে শিল্পকারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের বেতন বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বাড়িভাড়া আদায়েও সংকট তৈরি হতে পারে।

বাড়ির মালিক মো. হোসাইন আহমেদ বলেন, ‘মাধবপুরে অনেক মানুষ ব্যাংক থেকে হাউজ লোন নিয়ে বাড়ি করেছেন। এসব বাড়িতে শিল্পকারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা ভাড়া থাকেন। কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে শ্রমিকরা বেতন পাবেন না। বেতন না পেলে অনেকেই সময়মতো বাড়িভাড়া দিতে পারবেন না। তখন বাড়ির মালিকরাও বিপদে পড়বেন। কারণ আমাদেরও ব্যাংকের কিস্তি দিতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘একটা কারখানা বন্ধ মানে শুধু শ্রমিকের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে বাড়িওয়ালা, দোকানদার, পরিবহন শ্রমিকসহ অনেক মানুষের আয়-রোজগার জড়িত। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা দরকার।’

সিলেট জোন শিল্প পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিল্লুল রায় জানান, হবিগঞ্জ জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে শিল্প পুলিশ কাজ করছে।

তবে কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মকর্তাদের দাবি, গ্যাস সংকটের এই সময়ে তারা এখনো শিল্প পুলিশের কার্যকর উপস্থিতি দেখতে পাননি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার এসব শিল্পকারখানায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেড় লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ২০ দিন ধরে হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট চলছে। প্রথমদিকে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

গ্যাসের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও সংকট তৈরি হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সারাদেশের যে অবস্থা, আমাদেরও একই অবস্থা। কোনো উন্নতি নেই, আগের মতোই আছে। গতরাতে (বৃহস্পতিবার) কিছুটা গ্যাস পেয়েছিলাম। কিন্তু কিছু সময় পরই আবার আগের মতো বন্ধ হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা শুনেছিলাম ১৫ আগস্ট থেকে পরিস্থিতি ঠিক হবে। কিন্তু অফিসিয়ালি আমাদের কিছু জানানো হয়নি। আমরা শুধু বিতরণ করি। গ্যাসের নিয়ন্ত্রণ করে পেট্রোবাংলা।’

এর আগে গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন ক্ষতির পাশাপাশি রপ্তানি বাজারেও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একের পর এক অর্ডার বাতিল হলে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।

অন্যদিকে, কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের আয় কমবে, বাড়িভাড়া আদায়ে সংকট তৈরি হবে এবং ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধেও চাপ বাড়বে। ফলে হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের গ্যাস সংকট এখন শুধু কারখানার উৎপাদন বন্ধের সমস্যা নয়; এটি শ্রমিক, বাড়িওয়ালা, ব্যবসায়ী ও ঋণগ্রহীতাসহ স্থানীয় অর্থনীতির বড় একটি অংশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

শিল্প উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল করা হোক।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow